বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মেট্রো গণপরিবহন!

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ১২:২৭ এএম

রাজধানীবাসী ভেবেছিল, দীর্ঘ যানজট ভোগান্তির অবসান হয়েছে। প্রত্যাশা ছিল, মেট্রোরেল যেহেতু সরকারি পরিষেবা, এর সুফল পেতে রাজধানীবাসীকে আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না। মেট্রোরেলের ওপর এখন এনবিআর ভ্যাট আরোপ করেছে। আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর অর্ধেকের বেশি আদায় করতে চায় পণ্য ও সেবা খাতের ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক থেকে। সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে অসংগতির এই বিষয়টি অশনিসংকেত। বেহিসাবি ব্যয়ের খরচ কি জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে? যদি এটিকে আমরা ‘গণপরিবহন’ বলি সেই হিসেবে কোনোভাবেই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। আবার ভাড়া বাড়ানোর পাঁয়তারা! এখানে পরিবহন মালিক সমিতির অদৃশ্য কোনো হাত রয়েছে কি না, আমরা নিশ্চিত নই।

মেট্রোরেল উত্তরা-মতিঝিল অংশের ভাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ করা হয়েছে। ২৫ রুপি বা ৩১ টাকায় কলকাতায় ২০ কিলোমিটার যাতায়াত করা যায়। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত একজন যাত্রীকে ১০০ টাকা বহন করতে হয়। মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা জুলাই থেকে কার্যকর হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এটি জনবান্ধব পরিকল্পনা হতে পারে না। মেট্রোরেল আইন ২০১৫-এর ১৮ (২) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে মেট্রোরেল পরিচালনা ও জনসাধারণের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করা হবে। ২০১৬-এর ২২ (ঘ)-তে বলা হয়েছে, অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা হবে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে।’ অথচ এই আইনের যথাযথ নিয়ম মেনে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারিত হয়নি এবং মেট্রোরেলে নতুন করে যে ১৫% ভ্যাট আরোপের কথা বলা হচ্ছে, সেটিও মেট্রোরেল আইন পুরোপুরি অনুসরণ করে করা হয়নি। মেট্রোরেল নির্মাণে সরকারের ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি যে ব্যয় হয়েছে, সেটি জনগণের ভ্যাট-ট্যাক্সের টাকা থেকে দেওয়া হবে। জনগণ যদি যাতায়াত না করতে পারে, এর ফলে ধীরে ধীরে সরকারি পরিষেবার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। যে কর আরোপের কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাতিল করা হোক। প্রস্তাবিত বাজেটে মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই দাবি জানান। তিনি বলেন, মেট্রো টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে দেশের সাধারণ মানুষ, নিম্ন আয়ের লোকজন মেট্রোরেল ব্যবহারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত বাজেটে মেট্রোরেলের টিকিটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব পাস হলে মেট্রোরেলের টিকিটের মূল্য আরও বেড়ে যাবে। ভ্যাট আরোপের তীব্র বিরোধিতা করেছে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন গবেষণা এবং নীতি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। তারা দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। ধনী-গরিবের গণপরিবহন মেট্রোরেলে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর বসিয়ে রাজস্ব আদায় না করে, ধনীদের আয়করের মতো প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নজর দেওয়া উচিত মনে করে আইপিডি। মেট্রোরেল ভাড়ায় ভ্যাট যুক্ত করার নীতি থেকে সরে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। 

মেট্রোরেলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচিত, বিদ্যমান মূল্য সংযোজন কর মওকুফ সুবিধা অব্যাহত রাখা। ভ্যাট বসাতে এনবিআরের যুক্তি ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুসারে সব ধরনের কর ছাড় কমাতে হবে’ বিষয়টি অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য। 

গণমানুষের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এবং এনবিআরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে মেট্রোরেলের সাশ্রয়ী ভাড়া নিশ্চিত করতে হবে। মেট্রোরেলে ভর্তুকি কমানোর বিকল্প কৌশল অনুসন্ধান না করে, উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপালে প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। মেট্রোকে যদি ‘গণপরিবহন’ বলি, তাহলে ভাড়া বাড়ানো তো দূরের কথা বর্তমান ভাড়াই কমাতে হবে। জনগণের ঘাড়ে করের বাড়তি বোঝা চাপিয়ে, জণগণকে ‘যন্ত্র’ বানিয়ে করের মন্ত্র উচ্চারণ অশুভ ফল আনতে পারে। তীব্র গতির মেট্রো যেন ধীরগতিতে না চলে, মূল্যগতির কারণে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত