শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কীটনাশকেও ৫০০০ কোটির সম্ভাবনা

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ০১:৪৯ এএম

ফসলের ক্ষতিকর জীবাণু এবং কীটপতঙ্গ দমনের জন্য দেশে কীটনাশক (পেস্টিসাইড) ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পেস্টিসাইডের বাজার ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। দেশে এক হাজারের বেশি ধরনের পেস্টিসাইড ব্যবহার হয়ে থাকে। ওজনের হিসাবে যার পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার টন। দানাদার পেস্টিসাইড বাদে তরল ও পাউডার পেস্টিসাইডের প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয়।

কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগজীবাণু বাড়ছে, তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেস্টিসাইডের চাহিদাও আরও বাড়বে। দেশে যে পরিমাণ কাঁচামাল উৎপাদন হয়, তাতে কীটনাশক দেশেই তৈরি করে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। তার জন্য প্রয়োজন শুধু যুগোপযোগী কীটনাশক শিল্পনীতি।

তারা আরও বলেন, যে সময়ে ওষুধনীতি প্রণীত হয়েছিল তখন দেশে ৮০ ভাগ ওষুধই আমদানি হতো আর এখন চাহিদার ৯৭ ভাগ ওষুধ দেশেই তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, ১১৩টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানিও হচ্ছে। কীটনাশক শিল্পেও একই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় ফসল উৎপাদনে পেস্টিসাইড ব্যবহার প্রয়োজন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, কীটপতঙ্গের আক্রমণের কারণে শাকসবজিতে ৫৪ শতাংশ, ফলে ৭৮ শতাংশ এবং খাদ্যশস্যে গড় ক্ষতি ৩২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এ কারণে পেস্টিসাইড ব্যবহার করে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে শুধু পোকামাকড়ের কারণে বার্ষিক ফলনের ক্ষতি হচ্ছে ধানের ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশ, গমের ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ, আখে ২০ শতাংশ, সবজিতে ২৫ শতাংশ, পাটে ১৫ শতাংশ এবং ডাল ফসলে ২৫ শতাংশ। আর আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ফসলের ৩৭ শতাংশ ক্ষতি হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইঁদুর গড়ে বছরে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট করছে। দেশে চাষাবাদকৃত ১০০টি ফসলের মোট ৮৩২টিতে ক্ষতিকর পোকামাকড়, ৮৩৩টিতে রোগ সৃষ্টিকারী রোগজীবাণু এবং ১৭০টিতে আগাছা শনাক্ত হয়েছে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলছেন, বালাইয়ের আক্রমণে ফসল ৩০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি ২০২০ অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতির মূলে রয়েছে কৃষি। জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৩.৬ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি খাত থেকে দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান আসে। তাছাড়া প্রতি বছর প্রায় ২.২ মিলিয়ন নতুন মুখের জন্য তিন লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্যের জোগান এ খাত থেকেই মেটাতে হয়। কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামালও কৃষি খাতই সরবরাহ করে থাকে। তবে এ নীতিতে কীটনাশক নিয়ে তেমন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা লক্ষ করা যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসল আবাদের পরিধি ও ধরন বদলে গেছে। বেড়েছে ফসলের জন্য ক্ষতিকর রোগজীবাণু ও কীটপতঙ্গ। এসব দমনে কৃষক বালাইনাশকের ব্যবহারও বাড়িয়েছেন। আর এ সুযোগে কোম্পানিগুলো কাটছে কৃষকের পকেট। কৃষিতে কীটনাশক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে শক্ত নজরদারি দরকার বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে চার হাজার টন বালাইনাশকের ব্যবহার ছিল; ১৯৮০ সালে তা ছিল পাঁচ হাজার টন। ২০০০ সালে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার টনে। প্রায় দুই দশকের ব্যবধানে (২০২২ সালের হিসাব) বালাইনাশকের ব্যবহার অস্বাভাবিক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার টনে। ২০০০ সালে দেশে বালাইনাশক উৎপাদক কোম্পানি ছিল আটটি। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩টিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো কীটনাশক নীতি না থাকায় একচেটিয়া ব্যবসা করে লাভবান হচ্ছে সিনজেনটাসহ বহুজাতিক আটটি কোম্পানি। দেশে বালাইনাশকের ব্যবসায় জড়িত ৭০০টি কোম্পানি। এর মধ্যে মাত্র আটটি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ৫৫ শতাংশ। বাকি ৬৯৩টি দেশীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের হাতে ব্যবসা রয়েছে মাত্র ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে মাত্র ১০০ কোটি টাকা তথা মোট বাজারমূল্যের দুই শতাংশ ব্যবসা করছে দেশীয় উৎপাদক কোম্পানিগুলো। এত বেশি পরনির্ভরশীলতার কারণে আমদানিতে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করলে এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই কীটনাশক আমদানির পরিমাণ শূন্যে নামানো সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএমএ) সভাপতি এবং এগ্রিকেয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘কীটনাশক ও আগাছানাশক, ছত্রাকনাশক এগুলো অত্যাবশ্যকীয়। এগুলো ছাড়া কোনো দেশেই চাষবাস সম্ভব নয়। এ সাধারণ উপকরণগুলো আমরা আমদানি করে নিয়ে আসি। কিন্তু যদি আমরা সঠিক মেশিন বিদেশ থেকে আমদানি করি, কাঁচামাল নিয়ে আসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতা নিয়ে অতি সহজে উৎপাদন করে এমনকি বিদেশেও রপ্তানি করতে পারি। ঠিক যেমনিভাবে আমাদের ওষুধশিল্প পরনির্ভরশীল ছিল, কিন্তু সেই ওষুধে আমরা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষিপ্রধান দেশে কৃষির সাধারণ উপকরণ আমরা বিদেশ থেকে নিয়ে আসছি, স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছি না। আজকেই যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, এ জিনিসগুলো আর আমরা আমদানি করে নিয়ে আসব না, এই শিল্পে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হব এক বছরের মধ্যেই তা সম্ভব।’

দেশে হাজারো ব্র্যান্ডের কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যদি ৭৫ ভাগ বাদ দিয়ে শুধু ২৫ ভাগ আমরা উৎপাদন করি তাহলে আমাদের কৃষকের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বছরে প্রায় ৫-৬ হাজার কোটি টাকার কীটনাশক আমদানি করে আনতে হচ্ছে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে নীতিমালায় নিলে এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই জিরো পার্সেন্ট আমদানিতে নিয়ে আসা সম্ভব, বরং আমরা রপ্তানি করতে পারব। আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী একটি যুগোপযোগী কৃষি শিল্পনীতি গ্রহণ করবেন।’

প্রায় একই ধরনের মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষিশিল্পে কীটনাশক বড় একটি খাত। এ খাতে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ৫-৬ হাজার কোটি টাকার বাজার কেন আমরা পুরোটাই আমদানি করব। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যথেষ্ট তহবিল দিয়ে গবেষণার মাধ্যমে কীভাবে দেশেই এর উৎপাদন করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের মেধা রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতাও রয়েছে। শুধু প্রয়োজন সরকারের উদ্যোগ ও তহবিল। ওষুধশিল্পে যেমন আমাদের সফলতা এসেছে, কীটনাশক শিল্পেও এ সাফল্য আনা সম্ভব। সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার এবং ইন্ডাস্ট্রির সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত