শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পি কে হালদার চক্রে নিঃস্ব উদ্যোক্তা

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ০৬:১৭ এএম

ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যক্তির এবং দেশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে অর্থাৎ সমৃদ্ধি ঘটে। এ কারণেই প্রবচনে বলা হয়েছে বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মীর। লক্ষ্মীর আরেক নাম শ্রী। দোকানপাট, কারখানার সঙ্গে বিনিময়ের সম্পর্ক খুব নিবিড় আর বিনিময়ের সঙ্গে, বিশেষ করে উৎপাদন বা পণ্য বিনিময়ের সঙ্গে, বাণিজ্যের সম্পর্ক নিবিড়। কিন্তু শ্রী বি-শ্রী হয়ে গেলেই সমস্যা। প্রায়ই ব্যবসা-বাণিজ্য শ্রীহীন তৎপরতা লক্ষ করা যায়। সাম্প্রতিককালের শ্রীহীন তৎপরতার নজির বেঙ্গল ফাইন সিরামিকস লিমিটেড।

সিরামিক খাতের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল সিরামিকস। কোম্পানিটি ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বমন্দায় ২০০৮ সালে এটি রুগ্ণ হয়ে পড়ে। ব্যাংক ঋণ ও চলতি মূলধন সংকটে বন্ধ হয়ে যায় এর উৎপাদন। ব্যাংক ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেতে উদ্যোক্তা শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নেন কোম্পানিটির উদ্যোক্তারা। তারা সমঝোতা চুক্তি করেন বিশ্বজিৎ কুমার রায়ের সঙ্গে, যিনি অর্থ কেলেঙ্কারির নায়ক পি কে হালদারের সহযোগী ও পিপলস লিজিংয়ের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। এ চুক্তিই বেঙ্গল সিরামিকসের উদ্যোক্তাদের সর্বনাশ ডেকে আনে।

বেঙ্গল ফাইন সিরামিকসের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন রাশেদ মওদুদ খান ও তার দুই ভাই রাশেদ মাকসুদ খান ও রাশেদ মাশরুর খান। রাশেদ মওদুদ খানের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হন রাশেদ মাকসুদ খান, যিনি একজন প্রকৌশলী। রাশেদ মাকসুদ খান ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির দুবারের সভাপতি এবং বাংলাদেশ-থাই চেম্বারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সিরামিক খাতের একজন পাইওনিয়ার ছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটকালে একজন অসৎ ব্যবসায়ীর পাল্লায় পড়ে। এ কারণে রাশেদ মাকসুদ খানের জীবনের শেষবেলা অশেষ যন্ত্রণায় কেটেছে। অসৎ ব্যক্তির পাল্লায় পড়ে সর্বস্ব হারান তিনি। শতকোটি টাকার জমি হারিয়েছেন। ৮২ বছর বয়সে জেল খেটেছেন। মামলা করেও নিজেদের কোম্পানি ফেরত পাননি। অবশ্য মৃত্যুর কিছুদিন আগে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মধ্যস্থতায় আরেক কোম্পানির উদ্যোক্তার উদ্যোগে ঋণমুক্তির ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। রাশেদ মাকসুদ খানের মেয়ে ও বেঙ্গল সিরামিকসের উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার ফারজানা রুবাইয়েত খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অসৎ লোকের পাল্লায় পড়ে আমাদের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশ্বজিৎ কুমার সমঝোতার পর কৌশলে পুরো কোম্পানি দখল করে নেয়। গ্যাস-বিদ্যুতের বকেয়া পরিশোধ করে কারখানা চালু করতে জমি বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলাম। বিশ্বজিৎ কুমার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়ে আমাদের কারখানায় ঢুকতে দেননি। তিনি ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংক মামলা করে, সে মামলায় ৮২ বছর বয়সে আমার বাবাকে জেলে যেতে হয়েছে। দায় পরিশোধের শর্তে এসইসির অনুমোদন সাপেক্ষে অন্য গ্রুপের কাছে আমাদের উদ্যোক্তা শেয়ার বিক্রি করেছি। বিশ্বজিৎ ও তার ছেলে অভিজিৎ আমাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে, হুমকি দিচ্ছে। বাবার মৃত্যুর পর কুলখানির দিনও পুলিশ পাঠিয়ে হয়রানির চেষ্টা করেছে তারা। আমরা বিপন্ন বোধ করছি।’

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (পিএলএফএস) লুণ্ঠনের সহযোগী। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির ১১ পরিচালকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর ১১ পরিচালকের একজন বিশ্বজিৎ কুমার রায়, যিনি পিএলএফএসের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বহাল ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করার সব রসদ জুগিয়েছেন পি কে হালদার। বিশ্বজিৎ কুমার রায় তার প্রধান সহযোগী ছিলেন। পি কে হালদারের সহযোগী হিসেবেই তিনি বেঙ্গল সিরামিকস দখলের পাঁয়তারা করেছিলেন।

বেঙ্গল সিরামিকসের উদ্যোক্তারা জানান, ২০০৭ ও ’০৮ সালে তাদের কোম্পানি যখন অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছিল, তখন এর কয়েকজন উদ্যোক্তা মারা যান। ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় কোম্পানিটি আরও দুর্বল হতে থাকে। তখন উদ্যোক্তা শেয়ারের ক্রেতার খোঁজ করতে শুরু করেন রাশেদ মাকসুদ খান। তিনি অগ্রণী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে শেয়ার বিক্রির বিষয়ে আলোচনা করেন। ওই কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার রায়কে ক্রেতা হিসেবে মাকসুদ খানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এ পরিচয়-পর্বই তার দুর্ভাগ্য ডেকে আনে।

বেঙ্গল সিরামিকসের সব দায় পরিশোধের শর্তে ২০১২ সালে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে বিশ্বজিৎ কুমার রায়ের সঙ্গে উদ্যোক্তা পরিচালকদের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। শর্ত ছিল বিশ্বজিৎ কুমাররা অগ্রণী ব্যাংকের দায় শোধ করবেন। বিনিময়ে উদ্যোক্তারা তাদের শেয়ার বিশ্বজিৎ কুমার রায়, তার স্ত্রী শিল্পী রানী রায় ও ছেলে অভিজিৎ রায়ের নামে হস্তান্তর করবেন। সমঝোতায় আগ্রহ দেখাতে অগ্রণী ব্যাংককে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পুনর্গঠনের আলোচনা শুরু হচ্ছে এটাও দেখান বিশ্বজিৎ।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মালিকানা হস্তান্তরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) অনুমোদন লাগে। শর্ত অনুযায়ী দায় শোধ না হওয়ায় উদ্যোক্তা পরিচালকরা বিশ্বজিতের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের আবেদন করেননি। তবে যোগাযোগ ও কোম্পানি অধিগ্রহণের সুবিধার কথা বলে বিশ্বজিৎ নিজেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক করার অনুরোধ করলে মূল উদ্যোক্তারা তাতে সম্মত হন।

২০১২ সালে কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) উদ্যোক্তারা বিশ্বজিৎ কুমার রায়কে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঘোষণা করেন এবং অংশীজনদের (ব্যাংক, আইসিবি, এসইসি, ডিএসই, সিএসই) অবহিত করেন। কারখানার গ্যাস-বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য রাশেদ মাকসুদ খান তার আশুলিয়ার জমি ৬ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্বজিৎ গং কারখানাটি দখলে নেন।

বিশ্বজিৎ কুমার দায় পরিশোধ করার জন্য উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি দায় এককালীন শর্তে পরিশোধ না করে অগ্রণী ব্যাংকে সামান্য টাকা জমা করেন এবং আইসিবিসহ অন্যান্য অংশীজনের দায় পরিশোধ না করে কারখানা দখলে রেখে প্রায় ১২ বছর উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যান এবং উদ্যোক্তাদের না জানিয়ে অন্য ব্যাংকে হিসাব কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

কারখানায় উৎপাদন চললেও তারা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কিংবা স্টক এক্সচেঞ্জকে এ সংক্রান্ত কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য জানায়নি। ১২ বছরে বোর্ড সভাও হয়নি।

বিশ্বজিৎ ও তার ছেলে অভিজিৎ মূল উদ্যোক্তা পরিচালকদের কোম্পানি থেকে বিতাড়িত করে সব কুক্ষিগত করেছিলেন। তারা ব্যাংকের দায় পরিশোধও করেননি। বর্তমানে কোম্পানির মোট দায় ৯৫ কোটি টাকারও বেশি।

উদ্যোক্তাদের শেয়ার না কিনেই স্টক এক্সচেঞ্জে নিয়মিতভাবে শেয়ার ধারণের তথ্য পাঠান বিশ্বজিৎ কুমার, যেখানে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০১৪ সালে ৩১ অক্টোবরে বিশ্বজিৎ কুমার ও তার স্ত্রী শিল্পী রানী রায়ের নামে মোট শেয়ার দেখানো হয় ১ লাখ ৫৬ হাজার ১৬৭টি, যা কোম্পানির মোট শেয়ারের ২৪ শতাংশ। সমঝোতা চুক্তির আগে তাদের ৭ শতাংশ শেয়ার ছিল।

চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে সমঝোতা বাতিল চেয়ে নিম্ন আদালতে মামলা করেছিলেন রাশেদ মাকসুদ খান। তাদের পক্ষে রায় হলেও বিশ্বজিতের আবেদনে উচ্চ আদালত তা স্থগিত করে।

প্রতিকার চেয়ে এসইসিতে আবেদন : কারখানার দখল ফেরত না পেয়ে এবং চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে এসইসিতে আবেদন করেন রাশেদ মাকসুদ খান ও তার মেয়ে ফারজানা রুবাইয়েত খান। এসইসি অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। পুনর্গঠিত বোর্ডের স্বতন্ত্র পরিচালকরা বিশ্বজিৎ গংকে দায় পরিশোধ করার জন্য তিন মাস সময় বেঁধে দেন এবং উদ্যোক্তা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিশ্বজিৎ গং বেঁধে দেওয়া সময়ও দায় পরিশোধ করেনি। উপরন্তু এসইসির উদ্যোগে অসহযোগিতা করেছে এবং উদ্যোক্তা পরিচালকদের ভয় দেখিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বতন্ত্র পরিচালকদের বোর্ডও পদত্যাগ করে।

আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে এসইসির সব উদ্যোগ ব্যর্থ হলে নতুন ক্রেতা খোঁজা শুরু হয়। এসইসিও ক্রেতা খুঁজতে সহযোগিতা করে। সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের উদ্যোক্তারা দায় পরিশোধের শর্তে কোম্পানিটি অধিগ্রহণে রাজি হলে এসইসিতে শেয়ার হস্তান্তরের আবেদন করেন বেঙ্গল সিরামিকসের উদ্যোক্তারা। এসইসি তাদের আবেদন মঞ্জুর করে।

এসইসির কমিশনার অধ্যাপক শেখ সামসুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকৃত উদ্যোক্তারা নতুন ক্রেতা পেয়ে আমাদের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের আবেদন জানায়। আমরা তাদের আবেদনে সম্মতি দিয়েছি।’

গত ডিসেম্বরে এসইসি শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন দিলেও কারখানা দখলে নিতে পারেনি সি পার্লের মালিকরা। তারা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় বিশ্বজিৎ কুমারের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করলেও সমঝোতা হয়নি। গত মে মাসে কারখানাটির দখল নিয়েছে সি পার্লের মালিকরা।

কারখানার দখল হারানোর পর বেঙ্গল ফাইন সিরামিকসের নির্বাহী পরিচালক দাবিদার অভিজিৎ রায় অব্যাহতভাবে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন ফারজানা রুবাইয়েত খান। এ কথা অস্বীকার করেছেন অভিজিৎ রায়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কারখানা দখল হয়ে গেছে। আমি কি হুমকি দেওয়ার মতো অবস্থায় আছি?’ তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের কাছ থেকে ১৫০ টাকা দরে প্রতিটি শেয়ার কিনে নিয়েছি। স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার ধারণের তথ্যে তা রয়েছে।’

এসইসির অনুমোদন ছাড়া শেয়ার কীভাবে কিনলেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এসব শেয়ার কেনার জন্য এসইসির অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।’

কারখানা হাতছাড়া হওয়ায় সম্প্রতি এসইসি, বেঙ্গল ফাইন সিরামিকের উদ্যোক্তা এবং অধিগ্রহণকারী কোম্পানি ‘সি পার্ল বিচ রিসোর্টস অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের’ মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিশ্বজিৎ কুমার রায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত