মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিএনপির বাজেট প্রতিক্রিয়া

বিদেশি ঋণের গভীর ফাঁদে আটকা পড়বে দেশ

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ০১:৫৭ এএম

আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি বলেছে, আওয়ামী লীগ নিজেদের চুরি হালাল করার জন্য এই বাজেট প্রস্তাব করেছে। শূন্যের ওপর দাঁড়ানো এই বাজেট কল্পনার ফানুস। কর ও ঋণনির্ভর এই বাজেট লুটেরাবান্ধব।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির আনুষ্ঠানিক বাজেট প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বাজেটের এক- তৃতীয়াংশ ঘাটতি মেটানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ঋণ নিয়ে। সরকার কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণের দিকে আরও ঝুঁকবে। দেশ আটকা পড়বে আরও গভীর ঋণের ফাঁদে। যার বোঝা চাপবে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। বর্তমানে দেশের প্রতিটি নবজাতক শিশুকে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্ম নিতে হয়। ফলে দেশ দেউলিয়াত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।’

গতকাল রবিবার বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো স্বস্তি নেই। বর্তমান লুটেরা সরকারের এ বাজেট শুধু গুটিকয় অলিগার্কের জন্য। যারা শুধু চুরিই করছে, তারাই আবার ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, আবার তারাই নীতি প্রণয়ন ও দেশ চালাচ্ছে। বাজেটকে গণমানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থার সঙ্গে নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছুই না।’

তিনি বলেন, ‘অসহনীয় মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার কোনো পথনির্দেশনা নেই। সরকারি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিছু সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। তাদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, বাজেটে সে আলোচনা নেই।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ায় সৎ ও বৈধ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন এবং এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। দুর্নীতি করার এই লাইসেন্স দেওয়া অবৈধ, অনৈতিক ও অসাংবিধানিক। সরকারের আনুকূল্যে বেড়ে ওঠা আজিজ-বেনজীরদের মতো দুর্নীতিবাজদের ঢালাও সুযোগ সৃষ্টির জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উন্নয়ন দেখানোর চেষ্টা করলেও সেই উন্নয়নের বেলুন ফুটো হয়ে গেছে। এ বাজেট শুধু গণবিরোধী না, বাংলাদেশবিরোধী। অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প বন্ধ রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষির মতো জনকল্যাণমুখী খাতে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু সেটা করলে দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে, তাই পুরো বাজেট করা হয়েছে মেগা চুরি ও দুর্নীতির জন্য।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যারা কর ফাঁকি দেয়, তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের পরিকল্পনা না করে, যারা নিয়মিত কর দেয়, তাদের কাছ থেকে বাড়তি আদায়ে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। এই বাজেট আওয়ামী লীগ ও তাদের মাফিয়া গুরুদের মধ্যে ভাগাভাগির একটি ইজারাপত্র মাত্র।’

সরকার বাজেটে জনগণের পকেট কাটার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত কম। অথচ করোনাকালে আবার প্রমাণিত হয়েছে আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। সরকার কৃষিকে সহায়তা না করে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লাখো কোটি টাকা ভর্তুকির অর্থ তুলে দিয়েছে বিদ্যুৎ সেক্টরের অলিগার্কদের হাতে, অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ না কিনেই।’

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার নিজেই ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি সেক্টরে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ কমেছে। ডিএফআই (ডাইরেক্ট ফরেন ইনভেস্টমেন্ট)ও শূন্যের কোঠায়। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং আদায় না হওয়া, অর্থ পাচার, ধনী-দরিদ্র বৈষম্য রোধে সরকারের চেষ্টা দেখা যায়নি। রিজার্ভ ও ডলার-সংকট বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সংকট। এই সংকট কাটিয়ে ওঠার কোনো রূপরেখা, কর্মসংস্থান তৈরির কোনো দিকনির্দেশনা এই বাজেটে নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ যাবে বেতন-ভাতা, প্রণোদনা, ভর্তুকির মতো অনুৎপাদনশীল খাতে। পুলিশ ও প্রশাসনের একমাত্র কাজ বিরোধী দলকে নির্যাতন করার। তাদের খাতেই বেশি খরচ করা হচ্ছে।’

বিএনপির আমলে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান প্রতিটি বাজেটের আগে ভিক্ষার থালি নিয়ে ঘুরতেন আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন বক্তব্যের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এবারের বাজেট দেখেই বোঝা যায় কারা ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরছে। পুরো বাজেটই ভিক্ষার, তার মধ্যে নিজস্ব কিছুই নেই। ঘাটতি বাজেট মেটানো হবে ঋণ দিয়ে। একদিকে বৈদেশিক ঋণ, আরেকদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ।’

এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে এক আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সমালোচনা করেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ইউট্যাব এই সভার আয়োজন করে।

সভায় জিয়াউর রহমানের ওপর দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি, অধ্যাপক কামরুল আহসান ও অধ্যাপক তৌফিকুল ইসলাম। ইউট্যাবের সভাপতি এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মো. রইছ উদ্দীনের সঞ্চালনায় আলোচনায় সাবেক সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের কাদের গণি চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত