শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

লাগামহীন ছাত্রলীগে অসহায় প্রশাসন

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ০২:২২ এএম

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) কোনোভাবেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের লাগাম টানা যাচ্ছে না। কমিটি গঠনের ২২ মাসে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন যবিপ্রবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতনের হাত থেকে সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, চাকরিপ্রার্থী কেউই রেহাই পাননি। এ ধরনের প্রায় দেড় ডজন ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হলেও বিচার করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এমনকি এ বিষয়ে স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কথায় বিভিন্ন সময় অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে এ বেপরোয়া ছাত্রলীগের লাগাম টানবেন কে?

গত বছর ১৪ অক্টোবর যবিপ্রবিতে সংগঠনের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় সংগঠনবিরোধী, শৃঙ্খলাপরিপন্থী ও সংগঠনের সুনাম ক্ষুন্নের অভিযোগে যবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগের সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এর প্রায় এক মাস পর ভবিষ্যতে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও মর্যাদাপরিপন্থী কার্যকলাপে সম্পৃক্ত হবে না এ শর্তে যবিপ্রবি শাখার কমিটির ওপর আরোপিত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় কমিটি। এরপরও সংগঠনবিরোধী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকেননি যবিপ্রবি শাখার নেতাকর্মীরা।

আবাসিক হলে শাহরীন রহমান প্রলয় নামে এক শিক্ষার্থীকে রুমে ডেকে নিয়ে রাতভর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে যবিপ্রবি ছাত্রলীগের সভাপতি সোহেল রানা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। শহীদ মসিয়ূর রহমান হলের ৩০৬ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই শিক্ষার্থীকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এ ঘটনায় সোহেল রানাসহ ছাত্রলীগের আট নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই শিক্ষার্থী।

সালাম না দেওয়ায় ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে সভাপতি সোহেল রানার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী যশোর কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি এবং হলের প্রভোস্ট ও প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

গত বছর ৭ ডিসেম্বর লিফট অপারেটর পদে নিয়োগ পরীক্ষা দিতে আসা ১৭ চাকরি প্রার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ ছাড়া অপহরণ হওয়া একজন ভুক্তভোগী যশোর কোতোয়ালি থানায় ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীর নামে মামলা করেন। এ ঘটনায় অপহরণের সত্যতাও পায় তদন্ত কমিটি। কিন্তু অদৃশ্য কোনো কারণে ওই ঘটনায় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

শুধু তাই নয়, লিফট অপারেটর পদে নিয়োগ পরীক্ষায় ১৭ চাকরি প্রার্থী অপহরণের ঘটনার প্রমাণ লোপাট করতে ৭ ডিসেম্বর শহীদ মসিয়ূর রহমান হলের সিসিটিভি ফুটেজের হার্ডডিস্ক ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টার দিকে ছাত্রলীগের মিছিল চলাকালে এফএমবি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সুব্রত মন্ডলের প্রাইভেট কার ভাঙচুর অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তিনি প্রক্টর বরাবর মৌখিক অভিযোগ দেন। পরে এফএমবি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভাঙচুরের প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধন করতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ছাত্রী লাঞ্ছনার অভিযোগ ওঠে।

নিজেদের দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গত বছর ১৭ অক্টোবর দৈনিক আমাদের সময়-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি শিহাব উদ্দিন সরকারকে বেধড়ক মারধর করেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তার মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া গত বছর ২০ মার্চ দেশ রূপান্তরের যবিপ্রবি প্রতিনিধিকে হলে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করেন ছাত্রলীগ সভাপতি। গত বছর ২২ মে মানবজমিনের প্রতিনিধিকে কোনো কারণ ছাড়াই গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করেন দুই ছাত্রলীগ নেতা। এ ঘটনায় উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করলেও আলোর মুখ দেখেনি প্রতিবেদন।

শ. ম. র হলের ইসমাইল হোসেন নামের এক ছাত্রকে চাঁদার দাবিতে চার ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় যশোর কোতোয়ালি থানায় মামলাও করা হয়।

যবিপ্রবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি আল মামুন সিমনের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে বের হওয়া মৌলবাদবিরোধী মিছিলে হামলায় চালান ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের অনুসারীরা। এ ঘটনায় চারজন আহত হন। পরে সিমন প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন আটজনকে বহিষ্কার করে।

গত ৩১ আগস্ট রুম পরিবর্তন না করায় শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের সহসভাপতি নাজমুস সাকিব এবং শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আসিফ আল মাহমুদের বিরুদ্ধে।

গত বছর ১৬ জুলাই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বহনকারী বাসের চাবি কেড়ে নেওয়া এবং অফিসকক্ষের এসি ও লিফট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষক সমিতি ২২ দিন ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণ বন্ধ রাখার কর্মসূচি পালন করে।

অপরাধমূলক এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। কয়েকটি ঘটনায় কয়েকজনকে বহিষ্কার করলেও তারা সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থান করে পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। কোনো এক অদৃশ্য কারণে বড় ঘটনাগুলোতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের লাগাম টানা যাচ্ছে না কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে যবিপ্রবি উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা শিক্ষকরা লাগাম টানতে পারব না। সেটা সম্ভবও নয়। কারণ, এটা রাজনৈতিক বিষয়। রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করতে হবে। ছাত্ররাজনীতি ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে দিচ্ছে, এটা রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগ আর এই মারামারি, টেন্ডারবাজি করা ছাত্রলীগ এক নয়। সংগঠনের সুনাম ক্ষুন্নকারীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’

২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার আমবটতলা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় যবিপ্রবি। ‘স্টুডেন্ট কোড অব কন্ডাক্ট’ অনুযায়ী ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের মে মাসে ছাত্রলীগ সেই নিয়ম ভেঙে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুপক্ষের রাজনৈতিক সহিংসতার প্রথম বলি হন শিক্ষার্থী নাঈমুল ইসলাম রিয়াদ। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়। এখনো সেই মামলার বিচার হয়নি। সেই ধারাবাহিকতায় রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সহিংসতার ঘটনা ঘটেই চলেছে।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অপরাধে জড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন বলেন, ‘রাজনৈতিক পদ ব্যবহার করে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো সুযোগ বাংলাদেশ ছাত্রলীগে নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য বিব্রতকর। আমরা প্রতিটি বিষয় সামনে রেখেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব, হতে পারে সেটা নতুন কমিটি গঠন বা সাংগঠনিক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত