মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভারত থেকে কী পরিমাণ চোরাই গরু ঢুকছে?

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ০৯:৩৭ পিএম

এবার ঈদুল আজহা ঘিরে বাংলাদেশে চোরাই পথে বিপুল সংখ্যক গরু ঢুকছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে খামারিদের মধ্যে। এছাড়াও দেশি গবাদিপশুর মধ্যে নানারকম রোগ ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, গত এক মাসে দেড় লাখের মতো গরু দেশে ঢুকেছে। জানা গেছে, আগে এই চোরাচালানে পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত ব্যবহৃত হলেও এখন পূর্বদিকের সীমান্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। অবশ্য ঈদুল আজহার জন্য চাহিদার তুলনায় বেশি পশু প্রস্তুত আছে বলে দাবি প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর।

আব্দুর রহমান এমপি জানিয়েছেন, এক কোটি ৩০ লাখ গরু প্রস্তুত আছে। সারাদেশে চাহিদা এক কোটি সাত লাখ। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৩ লাখ গরু উদ্বৃত্ত আছে। এরপরেও থেমে নেই চোরাই পথে গরু আসা। যদিও স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষে এ ধরনের তথ্যের ভিত্তি নেই বলে জানানো হচ্ছে।

কী পরিমাণ গরু আসছে?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসছে বাংলাদেশে। যে কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে গরু আসছে বলে জানা যাচ্ছে, তার অন্যতম বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি। সেখানকার বাসিন্দা মাইনুদ্দিন খালেদ জানান, মিয়ানমার থেকে ৭০ কিলোমিটার সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার গরু আসছে। রাতে এগুলো সীমানা পার করা হয়।

এই কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জড়িত থাকার অভিযোগ খালেদের। তবে নাইক্ষ্যংছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল আবসারের দাবি, কোনো এলাকায় এমন কর্মকাণ্ড চললে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এর কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই।

তিনি জানান, গরু আনার পর সেগুলো স্থানীয় বাজারে তোলা হয়। তারপর নেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। অবশ্য চোরাই পথে আনা পশুর সংখ্যাটা দুই-তিনশোর বেশি নয়।

একই অবস্থা কুমিল্লা সীমান্তেও। সেখানে সীমান্তের কালভার্টের ভেতর দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু ঢুকছে বলে জানান স্থানীয় সাংবাদিক রুবেল মজুমদার। তিনি বলেন, সীমান্তের আশপাশের খামারগুলোয় গরুগুলো নিয়ে যাওয়া হয়। দেশি গরুর সঙ্গে মিশিয়ে তা বাজারজাত হয়। তিনি একটি চক্রের কথাও জানান। বলেন, এক ব্যবসায়ী একদিনেই ৫০০-৬০০ গরু নিয়ে আসছেন।

যেভাবে কমল ভারতের গরু আসা

বাংলাদেশে যত পশু কোরবানি হয় একটা সময় তার বড় অংশ আসত ভারত থেকে। কিন্তু ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধে সীমান্তে কড়াকড়ি করা হয়। ২০২২ সালে বিএসএফ এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, আগের তিন বছরে বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ৩৭ হাজার গরু তারা উদ্ধার করেছে।

ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, আগে ৬৫ শতাংশ কোরবানির গরুই ভারত থেকে আসত। কিন্তু কড়াকড়ির পর দেশে খামারের সংখ্যা ও উৎপাদন বাড়তে থাকে। এর ফলে ভারত থেকে পশু আনার সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শূন্যের কাছাকাছি চলে আসে।

যদিও গত কিছুদিন ধরে পাচার বেড়ে যাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করে ইমরান হোসেন বলেন, দেড় লাখ গরু ইতিমধ্যে দেশের বাজারে ঢুকেছে। সামনের কয়েক দিনে এই সংখ্যা আরো বাড়বে। তার দাবি, স্বার্থান্বেষী মহলের লাভের জন্যই পাচার বন্ধ হচ্ছে না। তবে চুয়াডাঙ্গা, যশোরের মতো রুটগুলো দিয়ে আগের মতো গরু পাচার হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

প্রান্তিক চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন

গবাদি পশুর জন্য মারাত্মক দুটি রোগ লাম্প স্কিন ডিজিজ এবং ক্ষুরা রোগ। পাচার বন্ধ থাকায় এতদিন এই রোগদুটির প্রাদুর্ভাব কম ছিল বলে জানান ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। তবে এখন আবার এসব রোগের বিস্তার ঘটছে বলে দাবি তার।

কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙা অঞ্চলের খামারিদের উদ্ধৃত করে ইমরান হোসেন জানান, অন্য বছর নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ইত্যাদি এলাকা থেকে বেপারিরা যেতেন গরু আনতে। তাদের চাহিদার জন্য ভালো দাম পেতেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এবার চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের বেপারিদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে।

বড় খামারিদের ওপর পাচার হয়ে আসা গরুর প্রভাব তেমন পড়বে না দাবি করে ইমরান হোসেন বলেন, বড় খামারিরা শৌখিন গরু প্রস্তুত করে। তাদের ক্রেতা আলাদা। ছোট খামারিরা মাঝারি আকার ও দামের গরু নিয়ে আসেন, ভারত-মিয়ানমার থেকে কম দামের গরু ঢুকলে তারা ক্রেতা হারাবেন।

ক্রেতারা পাচার করে আনা গরু কীভাবে চিনবেন? এমন প্রশ্নে ইমরান হোসেন বলেন, সেসব গরু সাধারণত জীর্ণশীর্ণ হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আনা হয় বলে এসব পশু দুর্বল হয়ে পড়ে।

যা বলছে সরকার

মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার সীমান্ত রয়েছে। রাখাইন রাজ্য থেকে এই দুই জেলার কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে গরু পাচারের কথা জানান স্থানীয়রা। তবে বান্দরবানের পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন বলছেন, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের অপর পাশে মিয়ানমারে এখন যুদ্ধ চলছে। এই পরিস্থিতিতে চোরাচালানের সুযোগ নেই। স্বাভাবিক সময়েও চোরাচালান প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকে বিধায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে না।

তবে গরু পারাপারের বিষয়ে সীমান্তগুলোয় বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শিথিল মনোভাবের অভিযোগ রয়েছে। প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, এদেশে চোরাই পথে অনেক কিছুই আসে। সীমান্তরক্ষীদের চোখের আড়ালে হয়তো কিছু আসতে পারে। কিন্তু আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী যাতে আরো তৎপর হয়।

গরু আমদানি না করার ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে তার দাবি, চোরাচালানের কারণে খামারিরা পথে বসে যাবার কোনো কারণ নেই।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত