বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পুতিনের দুই কন্যা হঠাৎ কেন প্রকাশ্যে

আপডেট : ১১ জুন ২০২৪, ১২:৫৬ এএম

ভ্লাদিমির পুতিনের দুই কন্যা কেন প্রকাশ্যে এলেন হঠাৎ? এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে লিখেছেন  সালাহ উদ্দিন শুভ্র

রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজের পরিবার বিষয়ে প্রায় কোনো তথ্য শেয়ার করেন না। তার কন্যা বলে পরিচিত দুজনকেও তিনি পরিচিত করান ‘সাধারণ নারী’ হিসেবে। তার দুই কন্যাও বাবার কৌশল মেনে নিয়ে খুব কমই জনসমক্ষে উপস্থিত হন। তবে গত সপ্তাহে অনেকটা হঠাৎ তারা সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামের প্যানেলে অংশ নেন। তাদের এভাবে জনসমক্ষে আসা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ কেউ বলছেন, পুতিনের ক্ষমতার উত্তরাধিকার হওয়ার কাজ শুরু করে দিয়েছেন তার দুই কন্যা। শুধু পুতিন নন, রাশিয়ান ‘অলিগার্কদের’ অনেকের ছেলে বা মেয়েরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। তাদের নাকি এটাই উদ্দেশ্য, বাবার ক্ষমতায় আসীন হবেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় আসার পর পুতিনের শক্তি বাড়াতে তার মেয়েরা প্রকাশ্যে আসছেন। তারা বিভিন্ন বিষয়ে পুতিন সরকারের পক্ষে মন্তব্য দিতে শুরু করেছেন।

পুতিনের বড় মেয়ের নাম মারিয়া ভোরন্তসোভা (৩৬), ছোট মেয়ে ক্যাটারিনা টিখোনোভা (৩৫)। তাদের মা পুতিনের প্রাক্তন স্ত্রী লিউডমিলা। ২০১৩ সালে বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত তারা ৩০ বছর সংসার করেন। নিজেদের বিচ্ছেদ বিষয়ে পুতিন পরে বলেছেন, যৌথ সিদ্ধান্তে তারা বিচ্ছেদে যান। তিনি বলেন, ‘আমরা একে অপরকে খুব কমই দেখি, আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব জীবন আছে।’ তার বক্তব্য তারা দুজনই ‘সম্পূর্ণভাবে কাজে নিমজ্জিত’ ছিলেন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, পুতিন তার বিপুল সম্পদের অনেক অংশ এ দুই মেয়ের নামে রেখেছেন। দুই মেয়েকে এখন তিনি ক্ষমতার ভাগও দিতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা এ দুই কন্যাকে নিজের শক্তি হিসেবে বিরোধীদের সামনে হাজির করতে চান পুতিন। যার অংশ হিসেবে হঠাৎ তিনি দুই মেয়েকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন।

গোপনীয়তা

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, পুতিনের মেয়েদের বিষয়ে ক্রেমলিন কখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ছোটবেলার কিছু ছবি যদিও তাদের পাওয়া যায়। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের কোনো ছবি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্বে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তার এবং পশ্চিমারা দুই মেয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও পুতিন প্রকাশ্যে তাদের বিষয়ে কিছু বলেননি। একবার সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করলে, তিনি কেবল তাদের ‘এই নারীরা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এমনকি রাশিয়ায় পুতিনের পরিবারের সবার নাম সংবলিত বোর্ডেও তাদের নাম নেই।

যদিও পুতিন একবার জানিয়েছিলেন, ‘আমার মেয়েরা রাশিয়ায় থাকে এবং সব সময় রাশিয়ায়ই পড়াশোনা করেছে। আমি তাদের নিয়ে গর্বিত।’ তিনি বলেন, ‘ওরা তিনটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে। আমি আমার পরিবার সম্পর্কে কারও সঙ্গে কথা বলি না। নিজের ভাগ্য গড়ার অধিকার সব ব্যক্তির রয়েছে। তারা তাদের নিজের মতো করে জীবনযাপন করে এবং সেটি করে সম্মানের সঙ্গে’ (সূত্র: বিবিসি)। দুই মেয়েকে নিয়ে পুতিনের এমন গোপনীয়তার কারণ হিসেবে নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে। পশ্চিমারা যে কোনো সময়ে তাদের বিরোধী পক্ষের পরিবারের ওপর হামলা করতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে পুতিন নিজের মেয়েদের পরিচয় করিয়ে দেন না বলে অনুমান। আবার তার এমন চুপ থাকার কারণে, নানা আলোচনাও ডালপালা মেলেছে। যেমন, কেউ কেউ বলেন যে পুতিনের আরও অনেক সন্তান রয়েছে রাশিয়ায়। যাদেরও তিনি গোপন করে রেখেছেন। উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালে গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে থাকাকালে বিয়ে করেছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন এবং তার সাবেক স্ত্রী লুডমিলা।

দুই মেয়ের কেউ বাবার সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটান না। পুতিনের নাতি রয়েছে বলেও জানা যায়। ২০১৭ সালে একবার ফোনালাপে এ ব্যাপারে তাকে কথা বলতে শোনা গেছে। তবে তার কয়জন নাতি রয়েছে বা দুই মেয়ের মধ্যে কে তাদের মা, সে সম্পর্কে কিছু বলেননি তিনি। তিনি বলেন, আমার নাতিদের সম্পর্কে কথা হলো...তাদের একজন ইতিমধ্যে নার্সারি স্কুলে যায়। দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন, আমি চাই না তারা রাজপুত্রের মতো বড় হোক। আমি চাই তারা সাধারণ মানুষের মতো বড় হোক।

রাজকুমারীর উত্থান

দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, ‘রাশিয়ায় পুতিন এবং তার মিত্রদের সন্তানরা ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবসা এবং সরকারে অবস্থান গ্রহণ করছে। পরামর্শ দিচ্ছে যে তাদের বৃদ্ধ মা-বাবার ক্ষমতা এবং প্রভাব সুরক্ষিত করার জন্য তারা কাজ করছে।’ শুধু পুতিন নন, তার মিত্রদের সন্তানরাও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছেন। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, যেমন প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি সের্গেই শোইগুর মেয়ে কেসেনিয়া শোইগু। যিনি রাশিয়ার ট্রায়াথলন ফেডারেশনের ওপর একটি আলোচনার সভাপতিত্ব করেন, যার প্রধানও তিনি। আবার জ্যেষ্ঠ আইস হকি এক্সিকিউটিভ রোমান রোটেনবার্গের বাবা বরিস পুতিনের শৈশবের বন্ধু। অবশ্য এই রোমান হাসির খোরাক হন ‘খেলাধুলায় স্বজনপ্রীতি’র বিরুদ্ধে সমাবেশ করে। রাশিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ ইয়েভজেনি মিনচেঙ্কো এ পরিস্থিতিকে ‘রাজকুমারীর উত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক অভিজাত প্রতিনিধিদের সন্তানরা দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করেছেন’।

নিউ ইয়র্ক পোস্ট জানাচ্ছে, সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে মারিয়া ভোরন্তসোভা এবং ক্যাটারিনা টিখোনোভা বক্তৃতা করার পর বিভিন্ন আলোচনা শুরু হয়। এক সাবেক সিআইএ এজেন্ট রোনাল্ড মার্কস দ্য ডেইলি বিস্টকে বলেন, পুতিনের মেয়েরা এ সপ্তাহে একটি ইভেন্টে অংশ নিয়েছিল, নিজ নিজ পেশায় তাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য নয় বরং তাদের বাবার ভাবমূর্তি বাড়াতে। তিনি বলেন, ‘মনে রাখবেন লোকটি পুতিন এবং আমরা কেবল এতে বাস করি’। এ সিআইএ কর্মকর্তার মতে, ‘এটি তার (পুতিনের) একটি সম্প্রসারণ... রাশিয়ান সাম্রাজ্যকে পুনরায় তৈরি করার ইচ্ছা, নিজেকে রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী লোক হিসেবে দেখানোর ইচ্ছা। অল্পবয়সী কন্যারা তার জীবনীশক্তির প্রতিনিধিত্ব করে’। মার্কস ডেইলি বিস্টকে আরও বলেন, ‘পুতিন তার মৃত্যুর বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছেন। তিনি এখন সেই বয়সে পৌঁছেছেন, যেখানে তিনি তার উত্তরাধিকার খুঁজছেন।’ মার্কস বলেন, যদি তার কন্যারা সামনে আসতে পারেন এবং তাকে প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য হন, আমি মনে করি পুতিন এর সদ্ব্যবহার করবেন।

যদিও পুতিন এর আগে জানিয়েছিলেন, তার মেয়েরা রাজনীতিতে জড়িত নয় এবং সাধারণ জীবনযাপন করে।

দুই কন্যা

বিবিসি জানাচ্ছে, পুতিনের বড় মেয়ে মারিয়া ভোরন্তসোভা পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান এবং মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। তিনি একজন শিক্ষাবিদ এবং কাজ করছেন এন্ডোক্রাইনোলজি বা শরীরের হরমোন ব্যবস্থা নিয়ে। মস্কোর এন্ডোক্রাইনোলজি রিসার্চ সেন্টারের একজন গবেষক তিনি। এ ছাড়া ব্যবসায়ও জড়িত মারিয়া। বড় একটি চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে এমন একটি কোম্পানির মালিকদের একজন তিনি। ডাচ ব্যবসায়ী ইয়োরিত ইয়োস্ত ফাসেনর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ফাসেন এক সময় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রমে কাজ করতেন। যদিও তাদের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এই দম্পতি নেদারল্যান্ডসে তিন দশমিক তিন মিলিয়ন ডলারের অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন বলে জানা গেছে। গত শুক্রবার ওই অনুষ্ঠানের একটি প্যানেলে বায়োটেকনোলজি এবং বায়োপ্রোডাকশনের উদ্ভাবন সম্পর্কে কথা বলেন মারিয়া।

ছোট মেয়ে ক্যাটারিনা তিখোনোভা ‘রক অ্যান্ড রোল’ নৃত্যশিল্পী হতে চেয়েছিলেন। ২০১৩ সালে এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পঞ্চম হন ক্যাটারিনা তিখোনোভা এবং তার দল। একই বছর ভ্লাদিমির পুতিনের বহুদিনের এক বন্ধুর ছেলে কিরিল শামালভকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের বিয়ের আয়োজন হয়েছিল সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি বিলাসবহুল স্কি রিসোর্টে। বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কনে এসেছিলেন ‘স্লেজ’ গাড়িতে চড়ে। রাশিয়ার জ্বালানি খাতে কাজের জন্য ২০১৮ সালে শামালভের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বলছে, বিয়ের পর রাতারাতি তার ভাগ্য খুলে যায়। তবে এ দম্পতির বিচ্ছেদ হয়ে গেছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন পুতিনের দুই মেয়েও। ইউক্রেনে রাশিয়া হামলা শুরু করলে নিষেধাজ্ঞা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। যার আওতায় পড়েন পুতিনের দুই মেয়ে। তাদের নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য, পুতিনের অনেক গোপন সম্পদ আছে। যার অংশ হিসেবে তিনি তার পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ রেখেছেন। পুতিনের সম্পত্তি গোপন রাখতে পরিবারের সদস্যরা সহায়তা করছেন। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের সময় মস্কোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় পুতিনের পরিবারের সদস্যদেরও নিশানা করা হয়। এ ছাড়া সিএনএন জানাচ্ছে, প্রয়াত রাশিয়ান নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশন এ বছরের জানুয়ারিতে বলেছিল, তাদের তদন্ত অনুসারে ভোরন্তসোভা একটি মেডিকেল কোম্পানির কর্মী হিসেবে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি উপার্জন করেছেন।

রাশিয়ার রাজনীতিতে পুতিনপর্ব শেষ হলে কী ঘটবে তা নিয়ে সংশয়ে আছেন বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ মনে করছেন কঠোর সামরিক শাসন আসতে পারে দেশটিতে। কারও মতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। রাশিয়া জুড়ে ভাঙনের আশঙ্কাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই মেয়েকে রাজনীতির ময়দানে নামিয়ে কোনো বার্তা দিতে চান পুতিন। এ দুই কন্যা তার সমৃদ্ধি ও শক্তির প্রতীক এবং ক্ষমতার উত্তরাধিকার হতে পারবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। সে পর্যন্ত দুই কন্যাকে পরীক্ষা দিয়ে যেতে হবে। যে পরীক্ষা রাশিয়ার মতো দেশে খুবই কঠিন। পুতিন তাদের কোন কোন বিদ্যায় দীক্ষিত করতে পেরেছেন, সামনের সময়ে বিশ্ববাসী হয়তো সেসব দেখতে থাকবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত