মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

খেলাপি ঋণ নতুন বিজনেস মডেল

আপডেট : ১১ জুন ২০২৪, ০২:২৩ এএম

আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটকে ‘যূপকাষ্ঠে বাঁধা বলির পশু’ বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ঘাটতি পূরণ করতে আমরা দেশ এবং বিদেশি উৎস থেকে একের পর এক ঋণ নিয়েই চলেছি। ঋণনির্ভরতা কমাতে সরকারের কোনো পদক্ষেপ আছে নাকি, গা-ছাড়া বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে তা বিবেচনা করা দরকার। ঋণের ওপর নির্ভর করে এভাবে অর্থনীতি চলতে থাকলে একসময় বাজেট দেউলিয়া না হলেও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সব সূচক খারাপ।

গতকাল সোমবার সম্পাদক পরিষদ ও নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নোয়াব) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন নোয়াবের সভাপতি এ. কে. আজাদ। সমাপনী বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম।

ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের স্থবিরতা, পুঁজি পাচার, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা, সর্বব্যাপী দুর্নীতি এবং সরকারি ব্যয়ের অনিয়ম অপচয় এবং জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি, বৈদেশিক ঋণ, সুদ পরিশোধ এ পরিস্থিতি সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটকে এক হিসাবে বলা যায় ‘যূপকাষ্ঠে বাঁধা বলির পশুর মতো। যার হাত-পা বাঁধা, নাড়াচাড়া করার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সেটা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। অর্থনীতির চালিকাশক্তির অন্যতম উপাদান ব্যাংক খাত হলেও সদ্য প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাত ঘুরে দাঁড় করানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এখন খাতটি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে একটি অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে, যার নাম বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ব্যাংকে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হলেই দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু এত টাকা পাচার হচ্ছে এবং অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে, তাহলে কী কাজ করছে এ সংস্থাটি? আমরা আসলে এ সংস্থাকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারিনি।

সময়মতো সঠিক পদক্ষেপের অভাবে মূল্যস্ফীতি আমাদের ওপর গেড়ে বসেছে উল্লেখ করে এ জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বলেন, এটার অন্যতম কারণ বিশ্বাসযোগ্য নীতি এবং নীতি সংস্কারের অভাব। দীর্ঘদিন থেকে ভুল নীতির ওপর চলার কারণে মৌলিক অনেক দুর্বলতা প্রকাশ্যে এসেছে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি, অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, রিজার্ভের অবনমন, রাজস্ব আয় হ্রাস অন্যতম। মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন না আনলে এসব সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সব সূচক খারাপ। যতদিন সুযোগগুলো ভালো ছিল, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল, রেমিট্যান্স ভালো ছিল, রিজার্ভের অবস্থাও ভালো ছিল। যেসব অর্থনৈতিক ত্রুটি ছিল সেগুলো হজম করার শক্তিও ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সেই শক্তি নেই। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামের অবস্থা একই রকম ছিল। এখন তাদের বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের থেকে কয়েকগুণ বেশি। তারা মাথাপিছু আয়েও অনেক এগিয়ে। তিনি বলেন, সিংহভাগ দুর্নীতিবাজ উচ্চবিত্ত যখন সরকারের কর পরিশোধ করে না, তখন কিছু করদাতার ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দিলে তারাও আর সৎ থাকে না। আমরা ক্রমেই নৈতিকতাহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি। আমরা স্মার্ট হতে যাচ্ছি কিন্তু দুর্নীতির কারণে স্মার্ট হতে পারছি না। আমাদের দেশে ঘুষ নেওয়া অপরাধ, কিন্তু দেওয়া অপরাধ নয়।

বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে অর্থনীতির মতো সংবেদনশীল খাতগুলো ছাড় দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করার পরামর্শ দিয়েছেন এ অর্থনীতিবিদ। তা না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণ মডেলই এখন দেশের জন্য একটা বিজনেস মডেল হয়ে গেছে। আপনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, আর ফেরত দেবেন না। এই মডেল চলছে। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আমরা নতুন কিছু পেলাম না। গতানুগতিক বাজেটের আকার বড় করা হয়নি, কিন্তু ব্যয়ও কমানো হয়নি। ধারদেনা করে ঋণ পরিশোধ করা হবে। আমাদের অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প থেকে সরে এলে ঘাটতি বাজেটের চাপ কমে যায়, চাপ কমে ব্যাংকের ওপর থেকে। এডিবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা এক থেকে দেড় লাখ টাকা করা হলে বৈদেশিক ঋণের চাপ থেকে অনেকটাই স্বস্তি আসবে। বাজেট নিয়ে সরকারের উচিত ছিল আরও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়া। এখন ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ পাবে না কারণ ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়। বৈদেশিক ঋণ নিলে পরিশোধ করবেন কীভাবে। আমাদের ব্যাংকে চুরি কমাতে হবে, খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পাবেন না, আবার নতুনরা কোনো ঋণ পাবেন না? এ ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও কঠোর মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই। আমাদের কিছু সংস্থার কাজ নেই, বেতন আছে। ব্যয় কমাতে এসব সংস্থা যাদের কোনো কাজ নেই, তাদের বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক, অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, শুধু রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণে দেশ দেউলিয়া হওয়ার পথে। উচ্চ আয়ের তো পরের কথা, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংক খাত আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। কেন এ অবস্থা হলো তার শ্বেতপত্র প্রকাশ করুন। মূল্যস্ফীতি কমানো বাজেটের বিষয় নয়। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য গত মাসে সুদের হার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক হওয়ার পথে অগ্রসর হয়েছে। বাজেট মুদ্রানীতির জন্য সহায়ক অবস্থান ঘোষণা করেছে, যা ইতিবাচক। সুদের হার আবার বেঁধে না দিলে এবং টাকা-ডলার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলে আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন। তবে মূল্যস্ফীতি কমবে মানে এই নয় যে, মূল্যস্তর কমবে, মূল্যবৃদ্ধির হার কমবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, রিজার্ভের দরপতন এটা নতুন কিছু নয়। অনেক দিন ধরেই এটা হচ্ছে, এ নিয়ে আগে থেকেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। প্রতিযোগী সব দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হয়, আমরা সেখানে ধরে রেখেছিলাম, কিন্তু তার বিরূপ প্রভাব তৈরি হয়েছে। আমরা পদক্ষেপ নেওয়ার সেই সময় পার করে এসেছি, কাজে লাগাতে পারিনি। অনেক পরে এসে সুদহার বাজারভিত্তিক করা হলো, কলিং পেগ চালু করা হলো। এখন মূল্যস্ফীতি কমাতে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল যেগুলো আমরা নিতে পরিনি। ওএমএস খাতসহ এ ধরনের খাতে বরাদ্দ বাড়ানো যেতে পারত।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট হলো গা-ছাড়া একটি বাজেট। বাজেটে আইএমএফের কথা শোনা হয়েছে, অলিগার্কদের কথা শোনা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কথা শোনা হয়নি। বাজেটে কালো টাকার সুযোগ দিয়ে বলা হলো, ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিলেই সাদা হবে অথচ সৎ আয়ের ব্যবসায়ীদের সেখানে কাটা হবে ৩০ শতাংশ। কোন নিয়মে হলো এটা। এখানে আমলাতন্ত্রের কথা শোনা হয়েছে, তাদের সুযোগ-সুবিধার কথা হয়েছে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত