মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘৬ প্রভাবশালী’র দিকে চোখ

আপডেট : ১১ জুন ২০২৪, ০২:২৫ এএম

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকান্ডের মূল ঘাতক এবং হত্যার পরিকল্পনাকারীদের অপরাধ-তথ্যের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে (ক্রাইম প্রোফাইল) জানতে পেরেছে পুলিশ। প্রোফাইল গুছিয়ে আনা হয়েছে। এমনটাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দাবি।

যতই দিন যাচ্ছে ততই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে, চোরাচালান এবং রাজনৈতিক কারণে আনারকে হত্যা করা হয়েছে। কারা এ হত্যাকান্ডে জড়িত সে ব্যাপারেও অনেকটা নিশ্চিত পুলিশ। ঝিনাইদহ ও যশোরের ছয়জন ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তি গোয়েন্দাদের নজরে আছেন। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

রিমান্ডে থাকা ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুর দেওয়া তথ্যে অনেকে ফেঁসে যাচ্ছেন বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে। ঘটনার অন্যতম নায়ক আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়ার আত্মীয় গ্যাস বাবু। তিনি জানিয়েছেন, ঢাকায় কামরুজ্জামানের গুলশানের বাসায় কয়েক দফা বৈঠক হয়েছিল।

আনারকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছে কসাই সিয়াম। তার ভাষ্য শুনে কলকাতা পুলিশ হতবাক। কলকাতা পুলিশও নিশ্চিত হয়েছে, স্যুয়ারেজ লাইন থেকে উদ্ধার হওয়া মাংসখন্ড মানুষেরই। দুয়েক দিনের মধ্যে আনারের মেয়ে ডরিনের ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হবে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ১২ মে আনার কলকাতায় যাওয়ার পরের দিনই তাকে ব্যবসার কথা বলে নিউ টাউন এলাকার একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় হত্যা-পরিকল্পনাকারীরা।

হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী তার বাল্যবন্ধু আখতারুজ্জামান শাহীন। আনার কলকাতায় যাওয়ার সপ্তাহখানেক আগে থেকেই তিনি কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। চিহ্নিত ফ্ল্যাটে প্রবেশের ৩০ মিনিটের মাথায় তাকে হত্যা করা হয়। এর আগে মিনিট দশেক চোরাচালানসহ নানা বিষয়ে হত্যাকারীদের সঙ্গে আনারের তর্কাতর্কি হয়, অশালীন বাক্য বিনিময়ও হয়। খুলনা অঞ্চলের চরমপন্থি ক্যাডার ও হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি আমানুল্লাহ তাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে আরও চারজন আনারের হাত-পা বেঁধে ফেলে তার শরীরে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে বালিশ চাপা দেয়।

নাম প্রকাশ না করে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, “চোরাচালান ও স্থানীয় রাজনৈতিক কারণে আনারকে হত্যা করা হয়েছে। এক বছর ধরে আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এ বিষয়ে ঢাকা, ঝিনাইদহ ও যশোরে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। কারা হত্যা করবে তার তালিকাও তৈরি করে পরিকল্পনাকারীরা। ওইসব বৈঠকে আখতারুজ্জামানসহ ছয়জন ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের নাম জানা গেছে। আওয়ামী লীগ নেতা বাবুর মোবাইলে ফোনে সব তথ্য পাওয়া গেছে। বাবু জিজ্ঞাসাবাদেও তথ্য দিয়ে চলেছেন। তারা মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করেছেন। ‘রাজনৈতিক কাঁটা’ দূর হবে এ আশায় এমপিকে হত্যা করা হয়।”

ওই কর্মকর্তা জানান, ওইসব প্রভাবশালীকে আমাদের জালে আনা হয়েছে। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কলকাতার সঞ্জিভা গার্ডেনসের ফ্ল্যাটে আনারকে হত্যা এবং লাশ গুমের পর ১৫ মে বাংলাদেশে ফেরেন শিমুল ভূঁইয়া। আখতারুজ্জামান শাহীন শিমুলকে জানান, বাবুর কাছ থেকে টাকা নাও। ১৬ মে বাবুর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেন শিমুল। ১৭ মে তারা ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশে গাড়ির ভেতরে সাক্ষাৎ করেন। বাবু বলেন, ২৩ মে টাকা দেবেন। কিন্তু তার আগেই হত্যার কথা চাউর হয়ে গেলে তারা আত্মগোপনে চলে যান।

পুলিশ সূত্র জানায়, যশোরের শার্শা, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, কালীগঞ্জ, শৈলকুপার সীমান্ত এলাকার চোরাচালানসহ সব কারবারের একক নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন যশোরের আলোচিত এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার আধিপত্য বিস্তারে বাধা হয়ে দাঁড়ান এমপি আনার। ফলে তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঢাকার একজন হীরা ব্যবসায়ী ও একজন ডেভেলপারও হত্যাকান্ডে জড়িত বলে ইঙ্গিত মিলেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার নামও জানা গেছে। গ্যাস বাবু বেশ কয়েকজনের নাম বলেছেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তিনি তার দুটি আইফোন ভেঙে ফেলেন। পরে মোবাইলগুলো হারিয়ে গেছে বলে ঝিনাইদহ সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। সন্দেহ দেখা দিলে সদর থানা-পুলিশ ঢাকার ডিবি পুলিশকে জানায়।

সিয়ামের তথ্যে হতবাক কলকাতার পুলিশ : কসাই সিয়ামকে নেপাল থেকে আনার পর কলকাতা পুলিশ ১২ দিনের রিমান্ডে নেয়। তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার তথ্যের ভিত্তিতে একটি খাল থেকে কিছু হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়। সিয়াম পুলিশ কর্মকর্তাদের জানান, হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহীনের অধীনে চাকরি করতেন তিনি। মাসে ৬০ হাজার টাকা বেতন পেতেন। শাহীনের নির্দেশেই তিনি কলকাতায় যান। আরেক কসাই জিহাদের সঙ্গেও চুক্তি করা হয়। তাকে মুম্বাই থেকে কলকাতায় আনা হয়। শাহীন তার জন্য রাজারহাটে ফ্ল্যাট ভাড়া করেছিলেন। আনারকে হত্যার কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র কিনেছিলেন নিউ মার্কেট এলাকা থেকে। অস্ত্রের দাম এক হাজার রুপি। প্লাস্টিক ও ট্রলি ব্যাগসহ আরও কিছু জিনিস কেনা হয় নিউ মার্কেট থেকে। আনারের মাংস কিমা করার জন্য মেশিনও আনা হয়েছিল। কিমার মেশিন কেনার দায়িত্বে ছিলেন ফয়সাল ও মুস্তাফিজ। আনারকে হত্যার পর প্রথমে মাংস ও হাড় আলাদা করা হয়। পরে মাংসগুলো ছোট ছোট টুকরো করে কিমা করা হয়। কিমা করার মেশিনটি এখন কোথায় আছে সেটা ফয়সাল জানেন বলে সিয়াম দাবি করেন। পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির মহাপরিচালক এ কে চতুর্বেদী স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, উদ্ধার হওয়া হাড়গুলো মানুষের, এগুলো পাঁজরের খাঁচা ও বাহুর বলে মনে হচ্ছে। সেগুলোকে ফরেনসিক বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। মাথার খুলি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।’

গ্রেপ্তার হতে পারে অনেকে : আনার হত্যার ঘটনার তদন্ত শেষে অনেকেই গ্রেপ্তার হতে পারেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যের কাছাকাছি এসে গেছি। মরদেহের বিষয়টি নিশ্চিত হলেই আমরা আপনাদের কাছে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারব। যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের জবানবন্দি শুনেছি। মাংসখন্ডগুলো কোথায় তারা রেখেছে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। আমাদের গোয়েন্দারা ভারতে গিয়েছিল। তারা যে খন্ড গুলো পেয়েছেন, সেগুলো উদ্ধার করেছেন। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যাবে না এগুলো আনারের মরদেহের অংশ কি না।’

তিনি বলেন, ‘আনারের খোঁজ চেয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারতে মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশের হেফাজতে আছেন জিহাদ হাওলাদার ও সিয়াম হোসেন। শিমুল, শিলাস্তি ও তানভীর এমপি আনারকে অপহরণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। তারা এখন কারাগারে আছে। দুটি মামলা হয়েছে। যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানে একটি। যা জানা গেছে ওই মামলার সুবাদেই জানা গেছে। আর সংসদ সদস্যের মেয়ে ঢাকায় একটি মামলা করেছেন, তার নিরুদ্দেশ হওয়ার পর। কাজেই ঘটনাগুলোতে দুই দেশই সম্পৃক্ত। তাদের মামলার আসামিকে বন্দি করার দায়িত্ব তাদের। আমাদের ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সব কাজে তারা সহযোগিতা করছে এবং ভবিষ্যতে করবে। আমাদের একটা প্রমাণ লাগবে যে, খণ্ডবিখণ্ড মাংসগুলো আনারের। তার ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার মেয়ের সঙ্গে যদি মিলে যায়, তাহলে ভারত সরকার আমাদের জানাবে, তখন আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারব।’

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত