শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘খেলাপি’ বিজনেস মডেল

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ১২:৩৯ এএম

খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংক খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। এগোতে পারছেন না ভালো উদ্যোক্তারা। বিগত সময়ে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন ইত্যাদি কৌশলে ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত থেকেছেন। বোধগম্য কারণেই এতে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান আসেনি, বরং তা ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে আরও প্রলম্বিত করেছে। বরং পরিস্থিতি এমন যে, ‘খেলাপি ঋণ নতুন বিজনেস মডেল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সোমবার সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নোয়াব) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘খেলাপি ঋণ মডেলই এখন দেশের জন্য একটা বিজনেস মডেল হয়ে গেছে। আপনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, আর ফেরত দেবেন না। এই মডেল চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকে চুরি কমাতে হবে, খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পাবেন না, আবার নতুনরা কোনো ঋণ পাবেন না? এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও কঠোর মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই। আমাদের কিছু সংস্থার কাজ নেই, বেতন আছে। ব্যয় কমাতে এসব সংস্থা যাদের কোনো কাজ নেই, তাদের বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’ একই আয়োজনে ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির চালিকাশক্তির অন্যতম উপাদান ব্যাংক খাত হলেও সদ্য প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে ঘুরে দাঁড় করানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এখন খাতটি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে একটি অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে, যার নাম বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ব্যাংকে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হলেই দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু এত টাকা পাচার হচ্ছে এবং অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে, তাহলে কী কাজ করছে এ সংস্থাটি? আমরা আসলে এ সংস্থাকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারিনি।

তথ্যানুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে। গত মার্চের শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ফলে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে সরকারি–বেসরকারি, বিদেশি ও বিশেষায়িত সব ধরনের ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ করা ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্তের একটি হলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার কমানো। ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে বলেছে সংস্থাটি। তবে উল্টো এখন খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকের বড় গ্রাহকদের প্রায় সবাই সরকারের ঘনিষ্ঠ ও বিভিন্ন পদে রয়েছেন। তাদের ঋণগুলো তদারকির বাইরে থেকে যাচ্ছে। খেলাপি চিহ্নিত করার নতুন নিয়মের কারণে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে তারা মনে করেন। খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, ঢাকায় বিদ্যমান ৪টি অর্থঋণ আদালতের পাশাপাশি আরও ৩টি এবং চট্টগ্রামে আরও ২টি অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রয়োজনে আদালত সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। দুই দশক আগে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ শীর্ষ ঋণখেলাপিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার জন্য ঋণখেলাপি ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার কর্ণপাত করেনি। ১৯৯৯ সালে একই প্রস্তাব করেছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান, সরকার তাতেও সাড়া দেয়নি। এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এবং টেকসই অর্থনীতিতে যাত্রার পথ সুগম করতে ‘ঋণখেলাপি ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করতে পারে কিংবা ‘দেউলিয়া আদালত’ সচল করতে পারে। আর্থিক খাতের দেউলিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে অনাদায়ী ঋণ আদায় করা না গেলে অর্থনীতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও চাপে পড়তে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত