বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মোদির আস্থা দলে শরিকদের মুখ ভার

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ০১:৫৫ এএম

অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জোটের ওপর ভর করেই চলতি মেয়াদে সরকার গঠন করতে হয়েছে বিজেপিকে। এনডিএ জোটের শরিকদের অনাপত্তি নিয়েই তৃতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তার নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ৭২ জন। কিন্তু জোটের শরিকদের মাত্র ১১টি মন্ত্রণালয় দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো বিজেপি নেতাদেরই দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের এই বণ্টন নিয়েই অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে। ক্ষমতা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছে বিজেপির দীর্ঘদিনের মিত্র শিবসেনা। মন্ত্রিসভায় কোনো পদ না পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে শিবসেনা। অজিত পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) মন্ত্রিসভার পদ চাওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিমন্ত্রীর পদ দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে সেই দলেও। অবশ্য বিজেপি বলছে, ভারসাম্য বজায় রেখে জোট সরকারের অন্তর্গত তেলেগু দেশম পার্টি, জনতা দল ইউনাইটেড, শিবসেনা (শিন্ডে), লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস), জনতা দল সেক্যুলার, রাষ্ট্রীয় লোক দল, হিন্দুস্তানি আওয়ামী মোর্চা (এইচএএম), রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়া থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে এই ১১ মন্ত্রীকে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের হাতে রেখেছেন পার্সোনেল, পেনশন, অ্যাটমিক এনার্জি, মহাকাশ, সব গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও যেসব মন্ত্রণালয় অন্য কোনো মন্ত্রীকে দেওয়া হয়নি, সেসব মন্ত্রণালয়। আবারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন অমিত শাহকে। আসলে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে কোনো ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে যাননি মোদি। ফলে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই দিয়েছেন। গতবারের মতো এবারও রাজনাথ সিং-ই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামলাবেন। রাজনাথকে এবার প্রথম থেকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন মোদি। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে রাজনাথ সিং মোদির পাশে বসেছিলেন। তিনি মোদির পরই শপথ নেন। এস জয়শঙ্করও তার পুরনো মন্ত্রণালয় পেয়েছেন এবং তিনিই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাবেন। মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে পুরো সময়টা ধরেই তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। অত্যন্ত কঠিন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে তার কাজে মোদি সন্তুষ্ট ছিলেন। এ ছাড়া নির্মলা সীতারামন আগের মতো অর্থমন্ত্রী থাকছেন। এবার পর্যাপ্ত অর্থ নেই বলে নির্মলা লোকসভা ভোটেই দাঁড়াননি। কিন্তু এখানেও ধারাবাহিকতা ভাঙতে চাননি মোদি। তার এবারের মন্ত্রিসভায় ধারাবাহিকতার ওপরেই জোর দেওয়া হয়েছে। নিতিন গড়কড়ী তার পুরনো মন্ত্রণালয় সড়ক পরিবহন পেয়েছেন। দুই প্রতিমন্ত্রী অজয় টামটা ও হর্ষ মালহোত্রা ওই মন্ত্রণালয়ের কাজে নিতিনকে সাহায্য করবেন।

এবার শরিক দলগুলো, বিশেষ করে জেডি ইউ কৃষি মন্ত্রণালয় চেয়েছিল। কিন্তু শিবরাজ সিং চৌহানকে আবারও এই দায়িত্ব দিয়েছেন মোদি। মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কৃষির বিষয়ে অভিজ্ঞ। বিজেপি সভাপতি হওয়ার আগে জেপি নাড্ডা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সামলাতেন। তাকে সেই মন্ত্রণালয়ই দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তার হাতে থাকছে সার ও রসায়ন মন্ত্রণালয়। ধর্মেন্দ্র প্রধান আগের মতোই মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয় সামলাবেন। এবার তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হয়েছে অশ্বিনী বৈষ্ণব। তার হাতে রেল মন্ত্রণালয়ও আগের মতো থাকছে। জেডি ইউ রেল মন্ত্রণালয়ও চেয়েছিল। কিন্তু এই মন্ত্রণালয় বিজেপি নিজের হাতেই রাখছে। এ ছাড়া তার হাতে আইটি ও ইলেকট্রনিকস মন্ত্রণালয়ও দেওয়া হয়েছে।

শরিকদের মধ্যে চিরাগ পাসোয়ানকে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রণালয়ের ভার দেওয়া হয়েছে। রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে চিরাগের দল এবার পাঁচটি আসনে জিতে এসেছে। অরুণাচলের নেতা কিরণ রিজিজুকে দেওয়া হয়েছে, সংসদীয় ও সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এ ছাড়া কিরণ রিজিজুর হাতে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

জোটের অন্যতম সদস্য শিবসেনা (একনাথ শিন্ডে) কেন্দ্রে একজন পূর্ণমন্ত্রী ও দুজন রাষ্ট্রমন্ত্রী চেয়েছিল। কিন্তু তারা তা পাননি। তাদের একজন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী পেয়েছে। তারা তা নিয়ে খুশি নয়। দলের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, তারা তাদের দাবি বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।

দলটির শীর্ষ নেতা শ্রীরঙ্গ বার্নে বলেন, ‘নতুন মন্ত্রিপরিষদে অন্য এনডিএ মিত্রদের শতাংশের ভিত্তিতে আমরা একটি পূর্ণমন্ত্রী পদ আশা করেছিলাম। আমরা বিজেপির তৃতীয় বৃহত্তম মিত্র। অনেক কম আসন পাওয়া অন্য মিত্ররাও মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আমাদের প্রতি বৈষম্য হয়েছে।’

যদিও দলটির আরেক নেতা শ্রীকান্ত শিন্ডে স্পষ্ট করেছেন, তারা নিঃশর্তভাবেই মোদি সরকারকে সমর্থন করছেন এবং এর সঙ্গে ক্ষমতার জন্য দর-কষাকষি বা আলোচনা জড়িত নয়।

প্রতিমন্ত্রীর পদ প্রত্যাখ্যান করেছেন এনসিপি অজিত পাওয়ারও। তার দল এবার মাত্র একটি লোকসভা আসনে জিতেছে। তাকেই প্রতিমন্ত্রীর পদ দিতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু অজিত পাওয়ার জানিয়ে দেন, তাদের পক্ষ থেকে মন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল প্রফুল্ল প্যাটেলের। তিনি আগে পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন। এখন তিনি কী করে প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন? তারা বরং অপেক্ষা করবেন, কিন্তু এই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন না।

এ বিষয়ে প্রফুল্ল প্যাটেল বলেন, ‘আমরা প্রতিমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করা উপযুক্ত বলে মনে করছি না। তাই আমরা তাদের (বিজেপি) বলেছি, আমরা অপেক্ষা করতে প্রস্তুত কয়েক দিনের জন্য। কিন্তু আমরা একটি পূর্ণমন্ত্রীর পদ চাই। তারা আমাদের বলেছে, কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। এরপর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপি সরকার গঠন করেই জোটের শরিকদের অসন্তোষের মুখে পড়ল। এখন দেখার বিষয়, এসব ভাগাভাগির রাজনীতি ও অসন্তোষ পাশ কাটিয়ে বা সঙ্গী করে তৃতীয় মেয়াদে মোদি কতটা এগিয়ে যেতে পারেন, তার কথিত লক্ষ্য অর্জনের পথে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত