সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এক ইউজিসিতে দুই চেয়ারম্যান! 

  • অসুস্থতা নিয়েও পদ আঁকড়ে আছেন চেয়ারম্যান
  • ভারপ্রাপ্ত দিয়েই কোনোরকম চলছে
  • বিশৃঙ্খলা কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 
  • সংকট আরও বাড়ার শঙ্কা 
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪, ০৩:৫৯ পিএম

সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্তা অর্থাৎ উপাচার্য না থাকলে বিভিন্ন সময়ে কমিশন থেকে ওই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তিরস্কার করতে দেখা গেছে। কিন্তু খোদ কমিশনই দীর্ঘদিন ধরে চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে। বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহিদুল্লাহ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও পদ আঁকড়ে আছেন। প্রথম মেয়াদে ক্যান্সার ধরা পড়ার পরও তদবির করে দ্বিতীয় চেয়ারম্যান হয়েছেন তিনি। কিন্তু ঠিকমতো অফিস করতে পারছেন না। চিকিৎসার জন্য বছরের বেশিরভাগ সময় থাকছেন অস্ট্রেলিয়ায়। দেশে ফিরলেও দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছেন না তিনি। সে কারণে ইউজিসি এখন দুজন চেয়ারম্যান চালাচ্ছে কিনা তা নিয়ে কৌতূহল বিরাজ করছে সর্বত্র।

জানা গেছে, ২০১৯ সালে ইউজিসি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ। এরপর থেকে অসুস্থতাজনিত কারণে মাসের পর মাস তিনি বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরপর ২০২৩ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পাওয়ার পরও একই কারণে তিনি প্রায় ৮ মাসের বেশি ছুটি কাটিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরে অফিস করলেও ‘ভারপ্রাপ্ত’ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেননি। এমনকি অসুস্থতাজনিত কারণে ফের ছুটির আবেদন করলেও তা মঞ্জুর করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইউজিসির একজন সদস্য হওয়ায় অনেকেই তাকে ঠিকমতো মান্য করছেন না। এতে কমিশন সহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশৃঙ্খল পরিবেশ দেখা গেছে। সে কারণে সংশ্লিষ্টদের চাওয়া- ইউজিসিতে একজন দক্ষ, যোগ্য ও সুস্থ স্থায়ী চেয়ারম্যান দেওয়া হোক।

ইউজিসির আইন অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে কমিশনের যে কোনো একজন সদস্যকে রুটিন দায়িত্ব দিতে পারেন। অধ্যাপক শহিদুল্লাহ প্রথম মেয়াদে নিয়োগ পাওয়ার পর ২০২২ সালের বেশিরভাগ সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন কমিশনের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম। তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পাওয়ার পর কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনিই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

জানা গেছে, অদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়েছে কমিশনে। চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ দায়িত্ব দেওয়া নিয়েও কমিশনের সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ফলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে বৈঠক হলেও অন্য সদস্যরা বিষয়টিকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজেও সদস্য হওয়ায় তাদের অভ্যন্তরে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়ছে কমিশনে। সিদ্ধান্ত নিতে নানান জটিলতা তৈরি হয়েছে। কাজেও গতি আসছে না বলে মনে করেন অনেকে।

অন্যদিকে ইউজিসি কিছু সিদ্ধান্ত নিলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেটি মানতে গড়িমসি দেখাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে পূর্ণ চেয়ারম্যান দায়িত্বে না থাকায় বিষয়গুলো হালকাভাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনআই) মূল ক্যাম্পাসে ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষে চার বিভাগে স্নাতক (সম্মান) প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তিসহ সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার রাখতে ইউজিসি নির্দেশনা দিলেও তা মানতে দেখা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। পরবর্তীতে তাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপে করে। যদিও এখনো পুরোপুরি তা মানেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কারণে পূর্ণ কমিশনের বৈঠক হয়নি। এমনকি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকাকালে কমিশনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যা নিয়ে কমিশনের ভেতরে-বাইরে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নিয়মিত চেয়ারম্যানের অবর্তমানে নিয়োগ দেওয়া হলে এটি ভবিষ্যতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে কিনা এমন আলোচনা আছে কমিশনে। সর্বশেষ গত ১২ জুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে ১৬৭তম পূর্ণ কমিশন অনুষ্ঠিত হয় এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন করে ইউজিসি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ ইউজিসি চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথমবার নিয়োগ পান ২০১৯ সালের মে মাসে। করোনার কারণে ২০২০ সালের মার্চে লকডাউন শুরু হলে তিনি অফিস ছাড়েন। ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি অফিসে যাননি। তবে এই সময়ে কিছু অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়েছেন। এরপর পাকস্থলির ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০২২ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসার জন্য যান। ১৯ মার্চ থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত তিনি ছুটি নেন। অস্ত্রোপচারজনিত কারণে কাজী শহীদুল্লাহ অস্ট্রেলিয়া থেকেই আরও তিন মাস অর্থাৎ ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ছুটির আবেদন করেন। পরে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে সাড়ে ৮ মাসের চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে ১ ডিসেম্বর কাজে যোগ দেন।

গত বছরের ২৫ মে তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই মেয়াদে তিনি (২০ আগস্ট ২০২৩-১৪ এপ্রিল ২০২৪) প্রায় আট মাস ছুটি কাটিয়েছেন। ঈদুল ফিতর এবং নববর্ষের ছুটি শেষে অফিস খোলার পর গত ১৫ এবং ১৬ এপ্রিল অফিস করেছেন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ। তবে ‘ভারপ্রাপ্ত’ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেননি তিনি। অসুস্থতাজনিত কারণে প্রথমে আড়াই মাস ছুটি নেওয়ার পরও ফের চার মাসের ছুটির আবেদন করেছিলেন। তবে ছুটি মঞ্জুর করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ এর মধ্যেই কমিশন চেয়ারম্যানের ছুটি দেখিয়ে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’-এর দায়িত্ব দিয়ে অফিস আদেশ জারি করেছে গত ২ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে।

অভিযোগ আছে, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা সত্বেও চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে চাচ্ছেন না ড. কাজী শহীদুল্লাহ। নিষ্ক্রিয় থেকেই পদ আঁকড়ে আছেন তিনি। টানা দুই মেয়াদের পাঁচ বছরের দুই বছরও ঠিকভাবে অফিস করতে পারেননি তিনি। যার বেশিরভাগই ছিলেন অসুস্থ। সম্প্রতি তিনি কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভুড়ি ভোজ করিয়েছেন বলেও জানা যায়। তাদের সন্তুষ্ট রাখতেই এই আয়োজন বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে ইউজিসির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থায়ী চেয়ারম্যান না থাকার কারণে কমিশনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ইউজিসির অভ্যন্তরে যেমন কেউ নির্দেশনা মানতে চায় না, তেমনিভাবে নির্দেশনা মানার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়িমসি করছে। নতুন করে ইউজিসি চেয়ারম্যান নিয়োগ কিংবা বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে পূর্ণকালীন চেয়ারম্যান ঘোষণা করলেও এর সমাধান হতে পারে। ইউজিসি নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। অন্যথায় এই সংকট আরও বাড়তে পারে।

কমিশনের সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধ্যাপক শহীদুল্লাহ এর ছুটির বিষয়ে আমার জানা নেই, এটি সচিব মহোদয় ভালো বলতে পারবেন। আর কমিশনে  কাজের গতি কম, বিশৃঙ্খলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গড়িমসির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তার মতে, কমিশনে একজনে কাজ করে না, অনেকেই এর সঙ্গে জড়িত। কমিশন তার নিয়ম মেনেই চলছে। চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ অস্ট্রেলিয়া থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে সূত্র বলছে, জুনের শেষে বা জুলাইতে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে পারেন। কারণ, তার অসুস্থতা বেড়েছে। এই শরীর নিয়ে তিনি ইউজিসির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি বড় প্রতিষ্ঠান। এর মাঝে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকা উচিত না। সব ধরনের নিয়মকানুন মেনেই এই প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে এটাই প্রত্যাশিত।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত