সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

হজের পরিপূর্ণ সওয়াব অর্জন

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪, ০১:২২ এএম

কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশে ওই গৃহের হজ করা তার ওপর অবশ্য কর্তব্য। আর যে তা অস্বীকার করবে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহতায়ালা বিশ্বজগতের প্রতি অমুখাপেক্ষী।’ (সুরা আলে ইমরান ৯৭) মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য শর্তসাপেক্ষে কাবা গৃহের হজ ফরজ করেছেন। শর্ত এই যে, সে পর্যন্ত পৌছার সামর্থ্য থাকতে হবে। সামর্থ্যরে ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, হজের সফরের পুরো খরচসহ গৃহে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণেরও ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটা তো হলো হজ ফরজ হওয়ার দলিল ও শর্ত। হজ ফরজ হওয়ার পর আমরা হজ করতে যাব। হজে গিয়ে আমাদের কার্যক্রম ও আচার-আচরণ কেমন হবে? হজ কিভাবে সম্পাদন করলে আমরা এটা থেকে পাব পূর্ণাঙ্গ সওয়াব? এসব বিষয়ে আমাদের অবগত থাকতে হবে।

আমরা প্রায়শই হজে গমনকারীদের জন্য দোয়া করি, ‘‘আল্লাহ আপনার হজকে ‘হজে মাবরুর’ হিসেবে কবুল করুন।’’ এটি খুব ভালো একটি দোয়া। কিন্তু অনেকেই জানে না ‘মাবরুর’ অর্থ কী? হজের সঙ্গে কেন এ শব্দটিকে জুড়ে দেওয়া হলো? ইসলামের অন্যান্য স্তম্ভ তথা নামাজ, রোজা ও জাকাতের ক্ষেত্রে শব্দটি কেন ব্যবহার করা হলো না? এমনটি বললেও তো হতো, ‘আল্লাহ আপনার হজকে কবুল করুন।’ বাস্তবিকই হজের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের জন্য ‘মাবরুর’ অত্যন্ত জরুরি। মাবরুরসহ হজ কবুল হওয়া অনেক সৌভাগ্যের বিষয়। এতে হজের পরিপূর্ণ সওয়াব অর্জন হয়। চলুন, জেনে নিই ‘মাবরুর’ কাকে বলে?

মাবরুর আরবি শব্দ, যা ‘বিররুন’ শব্দমূল থেকে এসেছে। এর অর্থ সদাচার, মানুষের প্রতি ভালো আচরণ, অন্যের প্রতি কর্তব্য পালন এবং অন্যের অধিকার পূরণ করা। ‘বিররুন’-এর বিপরীতধর্মী তিনটি কাজ না করা। এক. কারও সঙ্গে ঝগড়া না করা। দুই. অশালীন কাজ না করা। তিন. গুনাহ না করা। এখন বলুন, হজের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? হাজি সাহেবরা ভালো বলতে পারবেন, পুরো হজের সফরের জন্য ‘বিররুন’ কতটুকু প্রয়োজন। হজের পদে পদে অর্থাৎ বাড়ি থেকে মক্কায় পৌঁছা, হজের কার্যাদি সম্পাদন করে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ‘বিররুন’-এর প্রয়োজনীয়তা অতীব জরুরি। প্রায় ২০-২২ লাখ মানুষের বিশাল জমায়েত ‘বিররুন’ ছাড়া এর শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন কোনোটিই সম্ভব নয়। একটু বিস্তারিত বর্ণনা দিলেই বুঝতে পারবেন হজের মতো একটি বিশাল আয়োজনের জন্য ‘মাবরুর’ কতটা প্রয়োজন। দেশ-বিদেশের ২০-২২ লাখ আল্লাহর মেহমান ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত বিভিন্ন স্তরের লোকজন মিলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে আপনি স্বতন্ত্রভাবে আল্লাহর একজন সম্মানিত মেহমান। আপনি ইহরামের কাপড় পরে মৃত ব্যক্তি সেজেছেন। মৃত ব্যক্তি তো কোনো কথা বলতে পারে না, নড়াচড়া করতে পারে না। আপনি নিজেকে আল্লাহর অনন্ত পথের যাত্রী ভাবুন এবং আপনি সেভাবে নিজের মুখটি শুধুমাত্র আল্লাহর জিকিরে রত রেখে পুরো হজ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করুন। নিজের আভিজাত্য, সম্মানিত পদবি, আকাশচুম্বী সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান এই কয়দিনের জন্য ভুলে যান।

মনে করুন, আমি আল্লাহর একজন নগণ্য বান্দা। এই কয়দিন আমি কারও কাছ থেকে সম্মান, মর্যাদা বা অন্যান্য সামাজিক কোনো কিছুই পেতে চাই না বরং আমি আমার সঙ্গী আল্লাহর অন্যান্য সম্মানিত মেহমানদের সব ধরনের চাহিদা ও প্রয়োজন নিজের সাধ্যমতো পূরণ করব। নিজেকে তাদের জন্য বিলিয়ে দেব। তাদের প্রতি ভালো আচরণ করব। প্রতিটি কাজে তাদের অগ্রাধিকার দেব তবেই আপনার হজটি হবে ‘হজে মাবরুর।’ এভাবে প্রত্যেক আল্লাহর মেহমান যদি আপনার মতো নিজেদের বানাতে পারেন তবে বিশাল এ হজ অনুষ্ঠানটি বেহেশতি অনুষ্ঠানে পরিণত হবে এবং প্রত্যেকের হজ হবে ‘হজে মাবরুর।’ এটিই হলো হজে মাবরুরের মূল হাকিকত।

সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে তা হলো, বিরাট এই সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ৪০/৪৫ দিনের ক্রমাগত ‘বিররুন’-এর অনুশীলনের কারণে আপনার চরিত্রে ‘বিররুন’ স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধবে। আপনি যখন দেশে আসবেন তখন আপনার প্রতিবেশী আপনার সমাজ আপনার চরিত্রে ‘বিররুর’-এর প্রতিফলন দেখতে পাবেন। আপনি হজে যাওয়ার আগের মানুষের সঙ্গে বর্তমান মানুষটির ভিন্নতা খুঁজে পাবেন। আপনি আগে খারাপ আচরণ করতেন, গালিগালাজ করতেন, নিজের স্বার্থরক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠতেন, মানুষের অধিকারের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন কিন্তু এখন তার একটিও নেই। এখন আপনি পুরোদস্তুর একজন ভালো মানুষ। মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন, আগে মানুষের দুঃখ-কষ্টে আপনার মন কাঁদত না কিন্তু এখন আপনার অন্তরাত্মা কেঁদে ওঠে, আগে ঝগড়াটে ছিলেন কিন্তু এখন ঝগড়া এড়িয়ে যান, আগে কথায় কথায় মুখ থেকে অশ্লীল-অশালীন কথা বেরিয়ে আসত এখন ভালো শব্দ দ্বারা জবাব দেন। এগুলো হলো আপনার হজে মাবরুর কবুল হওয়ার লক্ষণ। আপনার সমাজ এক বাক্যে বলে উঠবে এগুলো হজের সুফল।

মনে রাখবেন, ইহরাম বেঁধে যখন আপনি আল্লাহর মেহমান হওয়ার নিয়ত করেন, তখন শয়তান খুবই নাখোশ হয়। আর আপনি যদি হজ মাবরুরের আশা নিয়ে সেই ধরনের আচরণের ওপর অটল থাকতে পারেন, তখন শয়তান হতাশ হয়। এজন্য ইহরাম বাঁধার পর পরই শয়তান আপনাকে হজে মাবরুর থেকে কীভাবে বিচ্যুত করা যায় তার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাবে। যেমন ধরুন, বিমান আপনাদের নিয়ে আকাশে উড়ল। বাথরুমে লাইন ধরেছেন, প্রতিযোগিতা ও বিরক্তিবোধ নিয়ে বলছেন, আরে লোকটি এতক্ষণ কী করে! অনেক কষ্টের পর বাথরুমে ঢুকে দেখলেন পুরোটাই ময়লা করে রাখা হয়েছে, গেঁয়ো, অসভ্য বা অন্যান্য ভাষায় মন্তব্য শুরু করলেন। মাবরুর হজে আঘাত হানলেন।

অথবা মক্কা-মদিনায় ছোট একটি রুম, যেখানে ২ জন একটু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে। সেখানে ৪ জনের বরাদ্দ। এজেন্সিকে গালি। হারাম এড়িয়া থেকে দূরে, এজেন্সিকে গালি। রুচিসম্মত খাদ্য পাননি এজেন্সিকে গালি। বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন বা মক্কা থেকে মদিনা, মদিনা থেকে মক্কায় ভালো যানবাহনের ব্যবস্থা করতে পারেনি, এজেন্সিকে গালি। মাবরুর হজে আঘাত হানলেন। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রত্যেকের হজ হজে মাবরুর হিসেবে কবুল হওয়ার জন্য নিজে নিজে চেষ্টা করতে হবে। কেউ আপনার পায়ে ব্যথা দেবে, কেউ আপনার হাতে ব্যথা দেবে, কেউ আপনার জায়গায় বসে পড়বে, কেউ আপনার মালপত্র নিয়ে যাবে অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে কেউ না কেউ আপনাকে কষ্ট দেবে। আপনি সবকিছু এই কয়দিনের জন্য ভুলে যান। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন, রাগ দমন করুন। তবেই আপনার হজ হবে হজে মাবরুর। এভাবে ৪০/৪৫ দিন যদি ‘বিররুন’-এর চর্চা করেন, আশা করা যায় আপনার এই চরিত্রের ধারাবাহিকতা আপনার পরবর্তী জীবনে বলবৎ থাকবে। এই চরিত্র আপনার পরিবার ও সমাজকে অবশ্যই প্রভাবিত করবে।

আর এভাবে হজ আদায় করতে পারলে হজের পরিপূর্ণ ফজিলত অর্জন করা যাবে। হাদিসে হজের অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এ ঘরের (বাইতুল্লাহর) হজ আদায় করল, অশ্লীলতায় জড়িত হলো না এবং আল্লাহর অবাধ্যতা করল না, সে মায়ের পেট থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো প্রত্যাবর্তন করল।’ (সহিহ বুখারি)

আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করে আর তাতে কোনোরূপ অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করে না, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’(তিরমিজি)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘এক ওমরাহ আরেক ওমরাহ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহের ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। আর মাবরুর (কবুল) হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সহিহ বুখারি)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ পরপর একত্রে পালন করো। কেননা এ দুটি (হজ ও ওমরাহ) দারিদ্র্য ও গুনাহসমূহ এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন কামারের হাপর লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা দূর করে দেয়। আর মাবরুর হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (তিরমিজি)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ইমান আনা। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মাবরুর হজ (কবুল হজ)।’ (সহিহ বুখারি)

লেখক : প্রিন্সিপাল, পদুয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, ফেনী

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত