বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪, ২ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এখনো উপনিবেশের ছায়া আইন-আদালতে

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪, ০৩:০২ এএম

২০২৩ সালের ২৫ জুলাই সকালে বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চে একটি ঘটনা ঘটেছিল। মামলার মোশনের (শুনানি উপস্থাপন-সংক্রান্ত) জন্য ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে আইনজীবীরা বরাবরের মতো বিচারকদের ‘মাই লর্ড’ সম্বোধন করেন।

ওই বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন এ শব্দচয়নে ঘোর আপত্তি জানিয়ে বলেন, “প্রভুরা চলে গেছে। দাসত্বের সময় এখন নেই। তাই ‘মাই লর্ড’, ‘ইয়োর লর্ডশিপ’ আর ব্যবহার করবেন না। ‘ইয়োর অনার’ বলবেন।” চার দশকের বেশি আগে প্রধান বিচারপতির এ বিষয়ক একটি নির্দেশনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। ওইদিনই দুপুর ৩টার দিকে এ বিষয়ে রীতিমতো বিজ্ঞপ্তি (বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশনামূলক) দেয় ওই বেঞ্চ।

প্রসঙ্গত, উচ্চ আদালতে শুনানির সময় ‘মাই লর্ড’ ‘ইয়োর লর্ডশিপ’ ‘মাচ অবলাইজড’-এর মতো শব্দচয়ন; সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে মাথা নোয়ানো (‘বো’ করা) বহু পুরনো রীতি। এ রীতির কথা বিবেচনায় রাখলে ওইদিনের ঘটনা বিচারাঙ্গনে কৌতূহলোদ্রেককারী বটে, যা ঔপনিবেশিক রীতি-নীতির অন্ধ অনুবর্তনকে নিরুৎসাহিত করে। আইন-আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকে এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক মনে করেন। উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্ট রুলসে ‘মাই লর্ড’, ‘ইয়োর লর্ডশিপ’ বলে কিছু নেই।

বাংলাদেশের চতুর্থ প্রধান বিচারপতি ফজলে কাদেরী মোহাম্মদ আবদুল মুনিম ১৯৮২ সালের ৪ অক্টোবর তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের (এখন রেজিস্ট্রার জেনারেল) মাধ্যমে একটি নির্দেশনামূলক গেজেট জারি করে বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকরা যেন ‘মাই লর্ড’ ‘ইয়োর লর্ডশিপ’-এর বদলে ‘ইয়োর অনার’ সম্বোধন করে। উল্লেখ্য, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি চার বছর আগে এক নির্দেশনায় বিচারকদের ‘মাই লর্ড’-এর পরিবর্তে ‘স্যার’ সম্বোধন করতে বলেছিলেন।

৭৭ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশের অবসান ঘটে। ভারত ও পাকিস্তানের উৎপত্তি হয়; পরে পাকিস্তান থেকে হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৩ বছর আগে। ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর অনেক কিছুই বদলেছে। কিন্তু বিচারাঙ্গনে তাদের রীতি-প্রথা-পোশাক-বাকভঙ্গি এখনো রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আলোচনাও আছে বিস্তর।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ব্রিটিশ ধারণার প্রাধান্য ও প্রভাব নিয়ে উচ্চ আদালতের বিচারপতি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, অধস্তন আদালতের বিচারকসহ অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে দেশ রূপান্তরের। তাদের বক্তব্যের সারার্থ হলো, এ উপমহাদেশসহ পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের বিচারব্যবস্থায় ব্রিটিশ ধ্যান-ধারণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। অনেক দেশ অনেক কিছুর সংস্কার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। পুরনো আইনের সংস্কার না হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রত্যাশীদের মধ্যে। ব্রিটিশদের তৈরি আইন, ভাষা, কালো পোশাক এখনো রয়ে গেছে।

আইনে এখনো ‘ব্রিটিশ’

দেশের পেনাল কোড বা দ-বিধির বয়স ১৬৪ বছর। ফৌজদারি আইনের (সিআরপিসি) বয়স ১২৬ বছর। অপরাধ প্রমাণে ১৮৭২ সাল থেকে প্রচলিত সাক্ষ্য আইনটিও ১৫০ বছরের বেশি পুরনো। আইনগুলোর লক্ষ্য শুধুই শাস্তি। ভূমির মামলা-সংক্রান্ত দেওয়ানি কার্যবিধিটি (সিপিসি) ১১৬ বছর আগের। শতবছরের বেশি আগে তখনকার প্রেক্ষাপটে তৈরি এসব আইনের কাঠামো বা কার্যপ্রণালি (প্রসিডিউর) নিয়ে প্রশ্ন নেই বিচারাঙ্গনে। কিন্তু সংস্কার করে সমসাময়িক করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মনে প্রশ্ন রয়েছে। ভিত্তি বিষয়ে দ্বিমত না থাকলেও ভারতে ইতিমধ্যে ফৌজদারি আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্রিটিশদের আচরণ ছিল প্রভুর মতো। তাদের কর্মকর্তাদের লর্ড বলা হতো। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাউকে ‘প্রভু’ সম্বোধন বাস্তবসম্মত নয়। এটা সত্যি, ব্রিটিশরা আইন-আদালতের জন্য অনেক কিছু করেছে। বিপরীতে শোষণ, শাসন আর লুণ্ঠনের নেতিবাচক মানসিকতাও দেখিয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনেকে অনেক কিছুর সংস্কার করেছে। আমরা এখনো পিছিয়ে আছি।’

রীতিদাসত্বের কালো পোশাক

শুনানিকালে বিচারক-আইনজীবীদের সাদা পোশাকের সঙ্গে কালো কোট, কলার ব্যান্ড (গলাবন্ধনী), টাই, গাউন পরা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে জনমনে। কালো পোশাকের উৎপত্তি হয়েছে ১৭ শতকে, ইংল্যান্ডে। ১৬৮৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের মৃত্যুর পর তার শোকানুষ্ঠান উপলক্ষে পরিহিত কালো পোশাক থেকে। পরে এ পোশাক ব্রিটিশ অধিকৃত দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থায়ী রূপ পায়। বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট রুলস, সিভিল রুলস অ্যান্ড অর্ডার, ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারেও বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে প্রচলিত এ পোশাক নিয়ে বলা আছে। করোনার সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এ পোশাকের বিষয়টি শিথিল হয়েছিল। পরে আবারও বহাল হয়। একাধিক আইনজীবী বলেন, খোদ ব্রিটেনের অধস্তন আদালতেও আইনজীবীদের কালো পোশাক নেই বলা যায়।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংস্কার নিয়ে যে জায়গা থেকে সবচেয়ে বেশি আওয়াজ তোলার কথা সেই আইনসভায় এখন ব্যবসায়ীদের দাপট। তারা ব্যস্ত নির্বাচন, টেন্ডার ও ব্যবসা নিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘কালো পোশাক আইনজীবীদের পরিচয় হয়ে গেছে। গরমে যদিও তাদের কিছু অস্বস্তি হয়। সরকার এজলাসগুলোতে কিছু এসি দিলে অন্তত কিছুটা সমাধান হয়।’

অবকাশের ধারণাও ব্রিটিশ ধারণা

বিচারক ও আইনজীবীরা বলেন, বিচারকাজ স্পর্শকাতর ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বিষয়। বিচক্ষণও হতে হয়। বিচারকদের মানসিক প্রশান্তি গুরুত্বপূর্ণ। এ ধারণা থেকেই বিচারকাজে অবকাশের রেওয়াজ তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশদের তৈরি অবকাশ ঋতু অনুযায়ী প্রথাসম। অবকাশের সময়ে নিয়মিত বিচারকাজ (রায়, সাক্ষ্যগ্রহণ, প্রচলিত অর্থে শুনানি) বন্ধ থাকে। তবে জরুরি বিষয়ে বিচারকাজ চলে স্বল্পসংখ্যক বেঞ্চে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এ বছর শুধু সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকার ঘোষিত ছুটি ছাড়া ৬৩ কর্মদিবস সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকাজ বন্ধ থাকবে। সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে অবকাশ থাকবে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত (সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটিসহ)। অধস্তন আদালতে পুরো ডিসেম্বর মাস অবকাশজনিত ছুটি।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের ভাষ্য, বাংলাদেশে ৪৩ লাখ অনিষ্পন্ন মামলার জট এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। এ নিয়ে হাইকোর্টের একজন বিচারপতির সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

সংগত কারণেই তার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারকদের প্রশান্তির জন্য অবকাশকালীন ছুটির প্রয়োজন আছে। এ ধারণাও এসেছে ব্রিটিশদের কাছ থেকে। ব্রিটিশ বিচারক-আইনজীবীরা ছুটিতে জাহাজে করে যাতায়াত করতেন। তাদের জন্য এটা জরুরি ছিল। আমাদের কোথাও যেতে জাহাজের প্রয়োজন হয় না। এত অবকাশ এখন ইংল্যান্ডেও দেখা যায় না।’

ব্রিটিশদের তৈরি প্রথা, রীতি ও আইন মেনে চলতে কোনো সমস্যা দেখেন না জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুসলিম পারিবারিক আইনের উৎপত্তি তো বহু বছর আগে। আমরা তা মেনে চলছি। আড়াই হাজার বছর আগের হিন্দু আইন এখনো চলছে। আর ফৌজদারি আইনের পরিবর্তন করতে গেলে তো পুলিশ বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন করে আইনের পাঠ শেখাতে হবে।’

আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টসের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘যেহেতু ব্রিটিশদের বাইরে আর কেউ তেমনভাবে আইন-আদালতের ধারণা দিতে পারেনি তাই তাদের তৈরি পদ্ধতিগুলোই সঠিক এবং এগুলো এখন ঐতিহ্য।’ তিনি বলেন, ‘বিচারসংশ্লিষ্টরা আরও আন্তরিক হলে বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত