বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিমানঘাঁটি করতে চাওয়ার অভিযোগ মিথ্যা : লু

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪, ০৩:০৩ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ডোনাল্ড লু গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সফর করেন। এ সফরে তিনি দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একত্রে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন। লুর বাংলাদেশ সফরের সময় আলোচিত বিভিন্ন ঘটনা, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা ও গুরুত্ব নিয়ে ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) বাংলা গত ১০ জুন একটি লিখিত সাক্ষাৎকার নেয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৩ মে গণভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের কিছু অংশ আলাদা করে পূর্বতিমুরের মতো একটি ‘খ্রিস্টান’ জাতিরাষ্ট্র গঠনের চক্রান্ত চলছে। শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, তিনি যদি বাংলাদেশে একটি বিমানঘাঁটি স্থাপনের জন্য একটি দেশকে অনুমতি দিতেন, তবে গত জানুয়ারিতে তাকে ঝামেলামুক্ত পুনর্নির্বাচনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত করেই এ বক্তব্য দিয়েছেন।

ডোনাল্ড লুর কাছে লিখিত সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয়, যুক্তরাষ্ট্র কি কখনো বাংলাদেশে একটি বিমানঘাঁটি নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে? জবাবে লু বলেছেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করি। নির্বাচনের সময় আমাদের অগ্রাধিকার ছিল শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে সমর্থন করার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করা।’

প্রশ্ন করা হয়, সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরে আপনি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়ে পেছনের দিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যে আস্থার জায়গাটি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও কাজ করার কথা বলেছেন। এটি কি বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত, যেখানে আপনারা বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনসহ গণতন্ত্র সুরক্ষা ও প্রসারের বদলে ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং কৌশলগত দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোয় বেশি মনোযোগ দিতে চান? জবাবে লু বলেন, ‘আমার সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সময় আমি যেমনটি বলেছিলাম, আমরা সামনের দিকে তাকিয়ে আছি, পেছনে নয়। আমরা বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্বকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত এবং আগ্রহী। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর হবে। আমরা অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দুদেশের মধ্যে নিজেদের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

(সেই সঙ্গে) বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন আমাদের জন্য একটি অগ্রাধিকার। আমরা সুশীলসমাজ ও সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ কাজকে সমর্থন করে যাব এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রাখব।

নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্তকারী সহিংসতার নিন্দায় আমরা সোচ্চার ছিলাম এবং আমরা বাংলাদেশ সরকারকে সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে তদন্ত করতে এবং যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্যও অনুরোধ করেছি। এই বিষয়গুলো নিয়ে (সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে) আমাদের যোগাযোগ চালু থাকবে।’

জানতে চাওয়া হয়, বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং সুশীলসমাজের একটি অংশ ৭ জানুয়ারির নির্বাচন ইস্যুতে, যার মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিও রয়েছে, সে বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি ‘নমনীয়’ ভূমিকা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সমালোচনা করেছে। আপনি এ সমালোচনার ব্যাপারে কী বলবেন?

উত্তরে ডোনাল্ড লু বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে সমর্থন করে এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পুরো নির্বাচনকালে আমরা নিয়মিত বাংলাদেশের সরকার, বিরোধী দল, সুশীলসমাজ এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার কাজে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে তাদের একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছি। নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্তকারী সহিংসতার নিন্দায় আমরা সোচ্চার ছিলাম এবং আমরা বাংলাদেশ সরকারকে সহিংসতার ঘটনাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যভাবে তদন্ত করতে এবং যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্যও অনুরোধ করেছি। এসব বিষয় নিয়ে (সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে) আমাদের যোগাযোগ চালু থাকবে।’

আরেকটি প্রশ্ন ছিল, আপনার সাম্প্রতিক সফরে আপনি সুশীলসমাজের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করলেও নির্বাচন বয়কটকারী বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেননি। আপনার সাম্প্রতিক সফরে কেন বিরোধী দলের সদস্যদের সঙ্গে দেখা না করার সিদ্ধান্ত নিলেন?

জবাবে লু বলেন, ‘এটা প্রাক-নির্বাচনের সময় নয়, তাই এবারের সফরে আমি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দেখা করিনি। এটা সত্য যে গত বছর নির্বাচনের আগে আমি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকের সুযোগ পেয়েছিলাম। এবার ঢাকায় থাকাকালীন আমার সৌভাগ্য হয়েছে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার। এর মধ্যে ছিলেন সুশীলসমাজের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সঙ্গেও আমি দেখা করেছি, যারা আমাকে বোলিং এবং ব্যাটিং সম্পর্কে দু-একটি ব্যাপার শিখিয়েছে।’

আরেকটি প্রশ্ন ছিল, আপনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার জন্য আপনার সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ লড়াইয়েরই একটি অংশ? আপনি কি (দুর্নীতি-সংক্রান্ত) এই ইস্যুগুলো সমাধানের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা করার সদিচ্ছা নিয়ে সন্তুষ্ট?

এই প্রশ্নের উত্তরে লু বলেন, ‘সারা বিশ্বের সমাজ দুর্নীতির বিচার দেখতে আগ্রহী। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ২০ মে আমরা ৭০৩১ (সি) ধারার অধীনে সাবেক জেনারেল আজিজ আহমেদের উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে জড়িত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে “পাবলিক ডেজিগনেশন” (এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা) ঘোষণা করি। দুর্নীতির এ অভিযোগগুলোর ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে বলে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীরা বিবৃতি দিয়েছেন, আমরা এ ব্যাপারটি স্বাগত জানাই। আমি আশা করি, আমরা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে মিলে সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করে যাব।’

অদূর ভবিষ্যতে অন্যান্য হাইপ্রোফাইল বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপরও দুর্নীতি সম্পর্কিত এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি দেখতে দেখা যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে লু বলেন, ‘যখন আমাদের কাছে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে, তখন আমরা সারা বিশ্বেই নিষেধাজ্ঞা এবং ভিসা বিধিনিষেধের আকারে প্রকাশ্যে পদক্ষেপ নিই। আমাদের আইনগুলো আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বা তাদের দুর্নীতির অর্থের গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট। আমি আশা করি, আমরা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে মিলে সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করে যাব।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত