বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কোটিপতি আয়কর শ্রমজীবী মানুষ

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৪, ১০:২৭ এএম

জনগণের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জনগণের জন্য খরচ করা সরকারের কাজ। জনগণের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হয় প্রধানত কর এবং করবহির্ভূত আয়ের মাধ্যমে। এরপর ঘাটতি দেখা দিলে ঋণ করে সরকার এবং ঋণের সুদসহ আসল শোধ করে জনগণ। জনগণের কাছ থেকে আয়ের মাধ্যম হলো কর, যা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আদায় করা হয়। এ ক্ষেত্রে যাদের আয় বেশি তাদের কর দিতে হবে বেশি, তা না হলে দেশে বৈষম্য বেড়ে যাবে। তাই সব দেশেই আয় বেশি যাদের, কর তাদেরই বেশি দিতে হয়। কিন্তু পুঁজিবাদ এমন এক পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছে যে, আয়কর আদায় করেও পুঁজিপতিদের বিপুল আয় বৃদ্ধি ঠেকানো যায় না। আর যারা বিপুল আয় করে তারা আয়কর ফাঁকি দেওয়ার নানা পথও বের করে নেয়। যার ফলে কোটিপতিদের সম্পদ ও সংখ্যা যেমন বাড়ে, অন্যদিকে শোষণমূলক ব্যবস্থার কারণে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার আশপাশেই ঘুরতে থাকে। মধ্যবিত্তদের অবস্থা হয় আরও করুণ। তারা স্বপ্ন দেখতে থাকে ধনী হওয়ার আর গরিব হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে ঘুমাতে পারে না। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এ ক্ষেত্রে এক টেক্সট বুক একজাম্পল বা উদাহরণ দেওয়ার মতো দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।      

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংক হিসাব রয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৯০টি আর এসব ব্যাংক হিসাবে মোট জমা আছে ৭ লাখ ৪০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮, মোট জমা ছিল ৭ লাখ ৪১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ৪২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছর মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৭১ হাজার ২০২। এসব হিসাবের বিপরীতে আমানত জমা ছিল ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। ব্যাংকের হিসাবে কোটিপতির সংখ্যা কিছু কমেছে। এসব কোটিপতির সবার সামর্থ্য সমান নয়, ফলে সবার হিসাবে টাকার পরিমাণও কম-বেশি আছে। ব্যাংক আমানতের পরিমাণ অনুযায়ী কয়েকটি স্তরে আমানতকারীদের বিভক্ত করেছে এবং তাদের সংখ্যা ও টাকার পরিমাণও প্রকাশ করেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত ১ কোটি ১ টাকা থেকে ৫ কোটি টাকার আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১ হাজার ৬২৩। যেখানে জমা ছিল ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। ৫ কোটি ১ টাকা থেকে ১০ কোটির ১২ হাজার ৪৪৬টি হিসাবে জমার পরিমাণ ৮৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১০ কোটি থেকে ১৫ কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা রয়েছে ৪ হাজার ৩৯৬টি, ১৫ কোটি থেকে ২০ কোটির মধ্যে ১ হাজার ৯৬১টি, ২০ কোটি থেকে ২৫ কোটির মধ্যে ১ হাজার ২১১টি  ও ২৫ কোটি থেকে ৩০ কোটির মধ্যে রয়েছে ৮৭৫টি আমানত হিসাব। আর ৩০ কোটি থেকে ৩৫ কোটি টাকার ৫০১টি, ৩৫ কোটি থেকে ৪০ কোটির টাকার ৩৬৯টি ও ৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার হিসাব সংখ্যা ৬৮১টি। তা ছাড়া ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা হিসাবের সংখ্যা ১ হাজার ৮২৬। তবে এই হিসাব থেকে দেশে প্রকৃত কোটিপতির সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে না। কারণ সবাই সব টাকা ব্যাংকে রাখে না। ফলে কোটিপতিদের সংখ্যা কত এবং তাদের হাতে কত কোটি টাকা রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান মিলবে না। কিন্তু ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাব সংখ্যা থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় যে, কোটিপতিদের সংখ্যা এবং টাকার পরিমাণ বাড়ছে।   

বাংলাদেশের অর্থনীতি যেমন বড় হচ্ছে, তেমনি তার বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা কতটা প্রকট রূপ নিয়েছে, তা স্বাধীনতার পরবর্তী থেকে আজ পর্যন্ত দেশের কোটিপতিদের পরিসংখ্যান থেকে একটু ধারণা পাওয়া যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ জন। এরপর দুর্ভিক্ষ হলো, বিদেশিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হলো, কিন্তু সে সময়েও কোটিপতি সংখ্যা বৃদ্ধি থেমে থাকেনি। ৩ বছর পর ১৯৭৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ জনে। ৫ বছর পর ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে কোটিপতি ছিলেন ৯৮ জন। ১০ বছর পরের হিসাবে দেখা যায়, কোটিপতির সংখ্যা ১৯৯০ সালে ৯৪৩ জন। ২০০১ সালে বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা দাড়ায় ৫ হাজার ১৬২ জনে। ২০০৮ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১৬৩ জনে। এভাবে বাড়তে বাড়তে ২০১৫ সালে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ হাজার ৫১৬। এরপর ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের একটা উল্লম্ফন দেখা যায়। প্রতিবছর ৫ হাজারের বেশি সংখ্যায় কোটিপতি বাড়তে থাকে। যেমন ২০১৯ সালে দেশে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩ হাজার ৮৩৯ জনে। ২০২০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯৩ হাজার ৮৯০ জন।

২০২১ সালে দেশে কোটিপতি ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৯৭৬ জন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি। করোনা মহামারী যেমন কোটিপতি বৃদ্ধি থামাতে পারেনি, ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতির সংকটেও কমেনি কোটিপতি বৃদ্ধি। ফলে সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চ মাসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৯০টি। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়, শ্রমিক-কৃষকের আয় রোজগার, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পাল্লা দিতে না পারা মধ্যবিত্তের হাঁসফাঁস করা জীবন আর কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি সমাজে আয় বৈষম্যের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। ২০১৮ সালে সম্পদশালী বৃদ্ধির হার ও ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রক্ষেপণ ধরে ওয়েলথ-এক্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৩ কোটি ডলারের বেশি সম্পদের মালিকদের সংখ্যা বাংলাদেশে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ছে।

শুধু কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি এবং মানুষের মাথাপিছু আয়ের গ্রাফও ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। ১৯৭২ সালে জিডিপি ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার, বর্তমানে তা উন্নীত হয়েছে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে। মাথাপিছু আয় যা ছিল ১৯৭২ সালে ৯১ ডলার বর্তমানে তা ২৭৮৪ ডলার। কিন্তু এই জিডিপি আর মাথাপিছু আয়ের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে কতটুকু পৌঁছেছে? সরকারি হিসাবে এখন ডলারের দাম ১১৭ টাকা। তাহলে মাথাপিছু আয় হিসাবে ৪ সদস্যের একটি পরিবারে মাসিক আয় হওয়ার কথা ১ লাখ ৮ হাজার টাকা। দেশের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শ্রমশক্তির পরিমাণ ৭ কোটি ৩৪ লাখ। এরাই তো বাংলাদেশের উৎপাদনের চালিকাশক্তি। এই শ্রমজীবীরা এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর কোনো পরিবারের মাসিক আয় কি এক লাখ টাকার বেশি? শ্রমজীবীদের আয় মাথাপিছু আয়ের কম। তাহলে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের সংখ্যা কম কিন্তু আয় এত বেশি যে, তাদের আয় দিয়ে গড়ের গরমিল দূর করা যায়।   বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিতে বলা আছে, রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করবে যেখানে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করতে পারবে না। অর্থাৎ অর্থের মালিক হতে হলে তাকে সেটা কায়িক বা বুদ্ধির শ্রমে উপার্জন করে নিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে কয়েক লাখ মানুষ এমন দ্রুত কোটি টাকার হিসাব খুলে বসেছেন, তাতে তাদের অর্থের উৎস বা উপার্জনের উপায় নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন তুললেও জবাব দেবে কে আর অনুসন্ধানই বা করবে কে?

দেশের মন্ত্রীদের অনেকেই বলতে ভালোবাসেন যে, বাংলাদেশের মানুষ ইউরোপের চাইতে ভালো আছেন। তারা মিথ্যা বলেন না। কিন্তু কথাটা পুরো সত্য নয়, আংশিক সত্য। দেশের ১৭ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৯০ লাখ পরিবার আছেন যাদের অতি ধনী, ধনী, উচ্চ মধ্যবিত্তের কাতারে ফেলা যায়। এসব পরিবারে অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ আছেন যাদের আয়কর দেওয়ার কথা। কিন্তু তাদের আয়ের উৎস নিয়ে যেমন প্রশ্ন তোলা হয় না, তেমনি তারা কর দেন না কেন সেই জবাবদিহিতা নেওয়ারও কেউ নেই। দেশের বিশাল বড় বড় শিল্পপতি, অনেক সিআইপি আছেন তাদের কাউকে সেরা করদাতা হিসাবে দেখা যায় না। সেরা করদাতা হয়ে যান জর্দা ব্যবসায়ী কাউস মিয়া। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী দেশে ৯৯ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) আছে। যদিও এদের সবাই আয়কর দেওয়ার মতো আয় করেন না, তারপরও টিআইএন নম্বর না থাকলে সেবা পাওয়া যায় না বলে তারা নম্বরধারী হয়েছেন। এদের মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়েছেন ৩৫ লাখ। কর দিয়েছেন আরও কম। তাহলে ধনী, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরাও কি কর দেননি? তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের চেষ্টা না করে ভ্যাটের আওতা ও পরিমাণ বাড়িয়ে বাজেটে টাকার সংস্থান করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা। কারও ৩৮ লাখ টাকার ওপর বৈধ আয় থাকলে তাকে কর দিতে হবে ৩০ শতাংশ আর কেউ যদি অবৈধ ১ কোটি টাকায় ১৫ শতাংশ কর দেন তাহলে তার টাকা বৈধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ কর না দিয়ে পার পেয়ে যাবে ধনীরা আর অবৈধ আয় করলে ১৫ শতাংশ কর দিয়েই পাবে টাকা বৈধ করার সুবিধা আর রাজস্ব আয় বাড়াতে পরোক্ষ কর দিতে বাধ্য হবে শ্রমজীবী মানুষ। তাহলে দেশে বৈষম্য বাড়বে না তো কী কমবে?

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত