বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রভাবশালী কারা?

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৪, ০১:৪৪ এএম

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্ট্রিগ্রিটি (জিএফআই) কয়েক বছর আগে বিশ^ব্যাপী মুদ্রা পাচারের ওপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ পাচার হয়। একশ্রেণির রাজনীতিক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন ব্যবসায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা নানা উপায়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেন। এরা সবসময়ই সরকারি ছত্রছায়ায় থাকেন বলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না এমন অভিযোগ রয়েছে। তাহলে কি বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর পণ্য আমদানিকালে অতিমূল্যায়ন এবং রপ্তানিকালে অবমূল্যায়নের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে? প্রতিবছর আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের যে চিত্র আমরা দেখতে পাই, তা প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলক নয়। শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘এক শতাংশের হাতেই ৭৫% ঋণ’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে আমানতের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশের ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। ঋণের নামে তারা ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছেন, অনেকেই ফেরত দিচ্ছেন না। বর্তমানে ব্যাংকঋণের ৭৫ শতাংশই নিয়ে গেছেন এক শতাংশ হিসাবধারী, যারা মূলত কোটিপতি ব্যবসায়ী। চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকে ১৫ কোটিরও বেশি আমানতকারীর সঞ্চয় রয়েছে ১৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে ব্যাংক, যার বেশিরভাগই গেছে কোটিপতিদের কাছে। দেশে মোট ঋণগ্রহণকারী হিসাব রয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫৮৫টি। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৯ জন কোটিপতি ব্যাংক থেকে ১২ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। কোটিপতিদের নেওয়া ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশই ফেরত আসেনি। 

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সুফল ঘরে তোলার বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের মূল ভিত্তি হবে চারটি। এগুলো হলো স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৪১ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকবে। বড় অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশ যে ঋণ নিচ্ছে তার পরিমাণ মাত্র ৭ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন যে ঋণ করছে, তার একটি বড় অংশও যাচ্ছে সেই ঋণ পরিশোধের পেছনেই। বাংলাদেশের কার কাছে কতটা ঋণ রয়েছে সেই বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ওয়েবসাইটে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট ডেটা পাওয়া যায়। এ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের  বৈদেশিক ঋণ ছিল ৫৫.৬০ বিলিয়ন ডলার। এই ঋণের অর্ধেকের বেশি ৫৭ ভাগ হলো বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছে। আর দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে ঋণ করেছে তার মধ্যে জাপান, রাশিয়া, চীন ও ভারত এই চারটি দেশই প্রধান। 

আবার ব্যক্তি খাতে কার ঋণ কত, সেই বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। একমাত্র ব্যাংকগুলোই তা জানে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের মোট আমানতের ৪২ শতাংশ হচ্ছে কোটিপতিদের। অবশিষ্ট ৫৮ শতাংশ সাধারণ খেটেখাওয়া মজুর, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের। আমানতের বেশিরভাগ এ শ্রেণি-পেশার মানুষের হলেও প্রয়োজনের সময় তাদের অধিকাংশই ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত। ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত না দিয়ে অনেক কোটিপতি তাদের বিত্তবৈভব বাড়াচ্ছেন। ঋণের অর্থ ফেরত না দিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যাতে তাদের খেলাপি ঘোষণা না করা হয়। অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ ফেরত না দিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন। ঋণের টাকা পাচার করে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী হচ্ছেন কেউ।

একদিকে আমাদের দেশ বিদেশ থেকে ঋণ করবে, অন্যদিকে দেশের মধ্যে ঋণখেকোরা অর্থ আত্মসাৎ করবে। কর্তৃপক্ষ সব জেনেও কেন নীরব থাকছে, তা রহস্যজনক। এমন তো নয় যে, তাদের কেউ চেনে না। তবু তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। কীভাবে থাকে? প্রশ্ন আসে, তাহলে প্রভাবশালী কারা! 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত