সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সুপার হাসপাতালে সুপার অনিয়ম

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৪, ০৮:০৬ এএম

বিস্ময়কর অনিয়ম ঘটেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে। এখানে যোগ দেওয়ার শর্তে বিএসএমএমইউর ১৫৭ চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ২ থেকে ৪ মাসের প্রশিক্ষণে দক্ষিণ কোরিয়ায় যান। দেশে ফিরে তাদের ৭২ জন সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে যোগ দিয়েছেন, ৮৫ জন যোগ দেননি।

যারা যোগ দেননি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ জনবলের অভাবে, বিশাল ভবন ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকার পরও, হাসপাতালটি চালু করতে পারছে না বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। বিএসএমএমইউর তথ্যমতে, ২০২১-২২ সালে পাঁচটি গ্রুপে বিএসএমএমইউর বিভিন্ন বিভাগের ৫২ জন চিকিৎসক দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিতে যান। তারা ২ থেকে ৪ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে দৈনিক ৭৫ ডলার প্রশিক্ষণ ভাতা দেওয়া হয়। এ হিসাবে যারা ২ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তারা একেকজন সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আর যারা ৪ মাস ছিলেন তারা ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা পেয়েছেন। তাদের যাতায়াত, হোটেল ভাড়া, খাওয়া

প্রভৃতি খরচ মিলিয়ে আরও কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে মাত্র ৬ জন চিকিৎসক সুপার স্পেশালাইজড যোগ দিয়েছেন, অবশিষ্ট ৪৬ জন চিকিৎসক যোগ দেননি।

শুধু যে চিকিৎসকরাই সুপার হাসপাতালে যোগদান করেননি, তা-ই নয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীও সুপার হাসপাতালে যোগ দেননি। তাদের যারা ২ মাসের প্রশিক্ষণ নেন, তারা প্রতিদিন ৬০ ডলার ভাতা পেয়েছেন। এ হিসাবে প্রতিজন ২ মাসে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ভাতা পেয়েছেন। তাদেরও আসা-যাওয়া, হোটেল ভাড়া, খাওয়া খরচ প্রভৃতি মিলিয়ে আরও কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

বিএসএমএমইউর তথ্য অনুযায়ী, কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন ১৫৭ জন। ৫২ চিকিৎসক, ২৯ কর্মকর্তা, ৫৩ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ২৩ জন টেকনিশিয়ান। প্রশিক্ষণ শেষে ৬ চিকিৎসক, ৫ কর্মকর্তা, ৫০ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ১১ জন টেকনিশিয়ানসহ ৭২ জন যোগ দিয়েছেন। ৮৫ জন যোগ দেননি। তাদের কেউ বিদেশ ভ্রমণ হিসেবে, কেউ মোটা টাকা ভাতা পাওয়ার আশায় তদবির করে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘প্রয়োজন ছাড়াই অনেকে প্রশিক্ষণ নিতে কোরিয়ায় যান। একজন সহকারী কন্ট্রোলার তো হোটেলের বাইরে গিয়ে নারী সহকর্মীর সঙ্গে ফুর্তি করার সময় ধরা পড়েন। বিষয়টি ই-মেইলে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এজন্য তদন্ত কমিটিও হয়। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের আরেকজন সহকারী পরিচালক কসমেটিকসের দোকানে চুরি করে ধরা পড়েন। তিনি দুবার চুরি করে পার পেলেও তৃতীয়বার ধরা পড়েন। তাকে কোরিয়ান পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বিষয়টি ই-মেইলে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষকে জানালে তাকে সাসপেন্ড করা হয়। পরে সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ তার চাকরি ফিরিয়ে দেন।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম হান্নান বলেন, ‘সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল এখনো পুরোপুরি চালু করা যায়নি। দ্রুত চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। যারা কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন, তারা এখানে অবশ্যই যোগ দেবেন। এখন জনবলের অর্গানোগ্রাম প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। জনবল নিয়োগ হলেই হাসপাতাল চালু করা যাবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুপার স্পেশালাইজড প্রকল্পের শর্তের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণের বিষয়টি ছিল। প্রকল্পের টাকায় তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে প্রশিক্ষণে কিছু অপ্রয়োজনীয় লোকও অংশ নিয়েছে। যাদের প্রশিক্ষণ কোনো কাজে আসছে না।’

২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। এর ২ মাস পর ২৭ ডিসেম্বর দেশের প্রথম সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের আউটডোরে রোগীদের সেবা দেওয়া শুরু হয়। প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী হাসপাতালের আউটডোরে সেবা নিয়ে থাকে। এই বছরের জানুয়ারি মাস থেকে হাসপাতালের ইনডোর চিকিৎসাসেবা চালু করার কথা থাকলেও তা করা সম্ভব হয়নি। দক্ষ জনবল নিয়োগ না দেওয়া, অর্গানোগ্রাম না হওয়া, মেডিকেল অফিসার নিয়োগে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হয়নি।

বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষে ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. জুলফিকার রহমান খান বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদের কাছে তা বুঝিয়ে দেন। এর সপ্তাহখানেক আগে ১৬ নভেম্বর ঠিকাদারি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচডিসি-সানজিন হাসপাতাল ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা প্রকল্প পরিচালকের কাছে বুঝিয়ে দেন।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একনেকে বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া হয়। ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার হাসপাতালটি বাংলাদেশ সরকার, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার ও বিএসএমএমইউর অর্থে নির্মিত। হাসপাতালটির ৯টি ফ্লোর ও ৩টি বেজমেন্ট রয়েছে। ৭৫০ শয্যার এ হাসপাতালে ১০০টি আইসিইউ বেড, ১০০টি ইমার্জেন্সি বেড, ভিভিআইপি, ভিআইপি কেবিন, আইসোলেটেড কেবিন, ওয়ার্ড, এসআইসিইউ, এনআইসিইউ, পিআইসিইউ, সিসিইউ ও এমআইসিইউর ব্যবস্থা রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত