সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঈদযাত্রায় যত বেশি গতি তত বেশি ক্ষতি

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৪, ১১:৫৮ পিএম

দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সড়ক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা, বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। এসব দুর্ঘটনার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ঘটে দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। অন্যদিকে মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত গতি প্রতিনিয়তই দেশের কর্মক্ষম তরুণসহ অনেকের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কেউ। দুয়ারে কড়া নাড়ছে ঈদ। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সড়ক-মহাসড়কে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যাবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোবাইল ফোন অপারেটরদের দেওয়া তথ্যমতে গত ঈদুল ফিতরে ঢাকা ছাড়েন ৫৭ লাখেরও বেশি সিমধারী। গত বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কোটির কাছাকাছি মানুষ ঢাকা ছেড়েছিলেন।

এদিকে দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের তথ্য থেকে পরিসংখ্যান তুলে ধরে গত ঈদুল ফিতরের পর যাত্রী কল্যাণ সমিতি ঈদের আগে-পরে মিলিয়ে ১৫ দিনে সড়ক দুর্ঘটনার একটি চিত্র উপস্থাপন করে। তারা জানায়, এই সময়ে সড়কে ৩৯৯টি দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন প্রাণ হারিয়েছিল, আহত হন ১ হাজার ৩৯৮ জন। এর মধ্যে ১৯৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬৫ জন নিহত ও ২৪০ জন আহত হন। এই বাস্তবতায় সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে বাড়িমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ রাখতে গত ৫ মে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের জারি করা মোটরযানের ‘গতিসীমা নির্দেশিকা’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি। উল্লেখ্য, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২-এ গতিসীমা মেনে গাড়ি চালানোর কথা বলা হলেও সাম্প্রতিক এই নির্দেশিকার মাধ্যমে দেশের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিটি সড়কে মোটরযানভিত্তিক সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের দুর্ঘটনা-পরবর্তী মৃত্যুঝুঁকি কমাতে ‘নো হেলমেট নো ফুয়েল’ আদেশ জারি করা হয়েছে।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, গ্রামাঞ্চল ও শহরের জন ঘনত্বের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ‘গতিসীমা নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হয়েছে। রাস্তার ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন মোটরযানের গতি নির্ধারণ করা হয়েছে যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য বৈশ্বিক মান অনুসরণ করেছে। তবে এক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের মতো এ দেশের সড়কে পর্যাপ্ত লেন থাকলে গতিসীমা নির্দেশিকাটি বাস্তবায়ন করা সহজতর হতো। আশার কথা এই যে, সরকার ধীরে ধীরে সব মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তখন এ গতিসীমা নির্দেশিকাটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে সড়কে কাক্সিক্ষত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্ঘটনা ও সড়কে অকাল মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে সড়কে নারী, শিশু, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও বৃদ্ধসহ ঝুঁকিপূর্ণ পথচারীদের নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত হবে। সাম্প্রতিককালে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সড়কে ব্যাপক হারে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, সেই সঙ্গে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালনা, যার কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ উদ্বেগের মাত্রাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে অধিকাংশ মোটরসাইকেল আরোহীর মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করায়। বিশেষত ঢাকার বাইরে মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট না পরার সংখ্যা আশঙ্কাজনক। আশার কথা এই যে, গতিসীমা নির্দেশিকার পাশাপাশি সরকার ‘নো হেলমেট নো ফুয়েল’ নির্দেশিকাও জারি করেছে। এর ফলে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীরা মানসম্মত হেলমেট পরার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত গতিতে মোটরসাইকেল চালাবেন বলে আমরা আশা করছি।

ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনতে বিআরটিএ ও পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান কঠোরভাবে ‘গতিসীমা নির্দেশিকা’ ও ‘নো হেলমেট নো ফুয়েল’ আদেশ দুটি বাস্তবায়ন করবে বলে আমরা আশা করছি। এই নির্দেশিকা দুটির যথাযথ বাস্তবায়ন হলে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি : ৩.৬) অর্জন করে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা, যা জিডিপির প্রায় ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ, সেটি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। সরকারি নিয়মনীতির পাশাপাশি মহাসড়কে যাত্রাকালে চালক ও সহযাত্রীদের একটু বাড়তি সাবধানতা, সতর্কতা, নিয়মকানুন মেনে চলা এবং দায়িত্ববোধ আমাদের বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, মোটরসাইকেল চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা। মোটরসাইকেল চালানোর সময় অবশ্যই নিজে এবং সহযাত্রীকে মানসস্মত হেলমেট পরতে হবে এবং হেলমেটের ফিতা ভালো করে লাগাতে হবে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুর ঝুঁকি কমে। মোটরসাইকেল চালানোর সময় আরও কিছু নিয়ম মেনে চললে আমরা রক্ষা পেতে পারি মারাত্মক দুর্ঘটনার হাত থেকে। যেমন: সর্বোচ্চ একজন সহযাত্রী নিয়ে মোটরসাইকেল চালানো এবং ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক না করা। কেবল নিরাপদ মনে হলে, দ্রুত ওভারটেক করা যেতে পারে। লেন পরিবর্তন করার সময় বারবার লুকিং মিরর দেখতে হবে এবং ইন্ডিকেটর ব্যবহার করা জরুরি। দীর্ঘযাত্রায় একটানা ২ ঘণ্টার বেশি মোটরসাইকেল চালানো ঠিক নয়। প্রতি ২ ঘণ্টা পরপর নিরাপদ কোনো জায়গায় থামতে হবে, কমপক্ষে ১৫ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে এবং বিশুদ্ধ পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আবার চলাচল শুরু করতে হবে।

বৃষ্টির সময় মোটরসাইকেলের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং সামনের গাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। মোটরসাইকেলের গতি সীমিত রাখতে হবে, মনে রাখবেন যত বেশি গতি তত বেশি ক্ষতি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা এবং যেখানে অযান্ত্রিক ও যান্ত্রিক উভয় ধরনের যানবাহন চলাচল করে, সেখানে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতিতে চলাটা নিরাপদ। অনির্ধারিত জায়গায় বিশেষ করে মহাসড়কে মোটরসাইকেল পার্ক করে বা থামিয়ে অপেক্ষা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পথচারীসহ ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী অন্যদের যেমন : নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকে আগে যেতে দিন। মোটরসাইকেল চালিয়ে ছোট রাস্তা বা গলি থেকে প্রধান সড়কে ওঠার সময় গতি কমান, প্রয়োজনে থামুন ও ডানে-বামে ভালোভাবে দেখে নিন। আপনি যদি মোটরসাইকেলের সহযাত্রী হন, তাহলে শক্ত করে ধরে বসুন এবং সতর্ক থাকুন। কোনো অবস্থাতেই ঘুমাবেন না। মোটরসাইকেলে সহযাত্রীদের চালনা বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। মোটরসাইকেল চালানোর সময় নারীদের শাড়ি-ওড়না সাবধানে গুছিয়ে রাখতে হবে, নারী সহযাত্রীদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। চালক ও আরোহী উভয়েই এই বিষয়গুলো মেনে চললে বাড়ি ফেরাটা হবে নিরাপদ।

ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে চালক ও সহযাত্রীদের উল্লিখিত বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলা জরুরি। পাশাপাশি সড়কে পূর্ণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সরকার অবিলম্বে বৈশ্বিক মান অনুযায়ী একটি ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করবে বলেও আমরা আশাবাদী।

লেখক: ম্যানেজার, রোড সেফটি প্রোগ্রাম, ব্র্যাক

khalid. mahmood@brac. net

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত