বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

উচ্চবংশীয় ছাগল ও কেঁচো খুঁড়তে সাপ

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৪, ১২:০৮ এএম

স্বজন এবং এক সময়ের একান্ত নিবেদিতরাও এখন বেনজীর, আসাদুজ্জামান, মতিউরদের সমালোচনামুখর। কেন? গদিনসীনকালে একটু ডাকদোহাইও কি দিতে পারতেন না? এটাই বাস্তবতা। সমাজে সৎ-অসৎ মিলিয়েই মানুষের বাস। দেশভেদে এর বৈপরীত্য আছে। কোনো কোনো দেশে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু লোক অসৎ উপার্জনে বিপুল অর্থবিত্তে ধনকুবের হন। আইন আদালতও তাদের শাস্তি দিতে পারে না। এ বাস্তবতার মাছে ফোড়ন কেটেছেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক, হেভিওয়েট মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তার ভাষায়: আজ যে ঢালাওভাবে দুর্নীতিবাজ বানানোর চক্রান্ত চলছে, এটা আওয়ামী লীগকে হটানোর জন্য ষড়যন্ত্র কি না, সেটা আমাদের ভেবে দেখতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে।’ কীসের মধ্যে কী বললেন তিনি? কাকে কী বোঝালেন? কে কী বুঝল? পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতির ভাষাও খানিকটা এমনই।

গলাবাজি-দলবাজির পারদর্শিতা সব জায়গায় চালিয়ে দিতে হবে? অস্বীকারের জো নেই যে, দুর্নীতিবাজরা সমাজে স্বীকৃত। সমাদৃত-প্রণোদিতও। এরা মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, মঠে বিস্তর দান-খয়রাতে মারহাবা-মারহাবা, সাধু-সাধু ধ্বনি পান। কেবল পরিবার নয়, পাড়া-পড়শিরাও ধন্য ধন্য করেন। ভালো বাড়ি-গাড়িও সামাজিক সম্মানপ্রাপ্তির উপকরণ। এর সুবাদে তারা দলে, দপ্তরে বড় পদগুলো দখল নেন। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নমিনেশন দেয়। কথিত নির্বাচনে তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান। এমন পরিহাসের মধ্যে বংশীয় সিলসিলায় হায়াত বেশি থাকার সুবাদে বেঁচে গেছে সাদিক এগ্রোর উচ্চবংশীয় ছাগলটি। আবার বড় বাপের পোলাটিকে ‘এই ছেলে আমার না’ দাবি করে সাইডলাইনে চলে যাওয়ার চেষ্টা বাবার। ইফফাতের বাবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচ্চমর্যাদার কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমানের কুকীর্তি নিয়ে গণমাধ্যমে আগেও টুকটাক তথ্য এসেছে। এতে একটুও হেলানো যায়নি। বরং প্রমাণ করে ছাড়া হয়েছে, তিনি বড় ভালো মানুষ। ভীষণ অমায়িক! দেখতে কত সুন্দর! মুখে হাসি লেগেই থাকে। সহাস্য বদনে কী বিনম্র তার আচরণ ও ভাষা। এখন একটি ছাগল তার সারা জীবনের কান্না হবে?

বরং একাধিক বিবি-বাচ্চাসহ তার জন্য কান্নার বহুজন আছে। দোয়া-খায়ের করার লোকও আছে। নগদেই তো দোয়া করবেন সহকর্মী ওয়াহিদা। মতিউরের ছেলের কাণ্ডে ওয়াহিদা ইস্যু একটু হলেও মচকে গেছে। কিছুটা ফসকে গেছে আজিজ, বেনজীর, আসাদুজ্জামান মিয়া সাহেবদের ঘটনা। অসিলা তো ছাগল। এখন মওকা মনে করে নানান জন নানান কথা বললেও তাদের ওপর অনেক জনের হাত আছে, থাকে। সময়দৃষ্টে তা দেখা যায়। অথবা নানান ইস্যুর তোড়ে আগেরটা অনেকে ভুলেও যান। তবে, কেউ এখন এই ছেলেটার বাবার দায়িত্ব আবার শাকিব খানের ওপর না চাপায়। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ঘরে জন্মানো ছেলের দায়িত্ব পড়ে শাকিব খানের ওপর। কচলে ধরলে বেচারা শাকিবও ‘না’ করতে পারেন না। পিতৃত্বের স্বীকৃতি দিয়ে কোলে তুলে নেন।

আলোচিত রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমান তার এক বিবির সন্তানকে ‘চেনেন না’ বলার মধ্যে সমালোচনার তত উপাদান নেই। ‘দেখিলে চিনিব’ বলেও তো একটা কথা আছে। আফ্রিকার অনেক গোত্র প্রধানও নিজের সব সন্তানের চেহারা মনে রাখতে পারেন না, পত্নী-উপপত্নীদের নাম মনে রাখতেই তাদের মেমোরি ফুল লোড হয়ে যায়। মায়েরা কেবল জানেন কোন সন্তানের বাবা কে। গরু হারিয়ে যাওয়ায় গোপাল ভাঁড়ের বৌকে মা ডাকার গল্প অনেকেরই জানা। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো জায়গায়ও জমি-জিরাতসহ নানান কিছু রক্ষার স্বার্থে বিয়ের পর বিয়ে করে নিশ্চিন্ত হওয়ার একটা সমাজস্বীকৃত ব্যবস্থা ছিল। এ নিয়ে বহু হাস্যরসের কাহিনি রয়েছে।

দুনিয়ার কোনো সন্তানই বাবাহীন নয়। তা ছাগলের বাচ্চা হলেও। পাঁঠারা তা মনে রাখতে পারে না। বা স্বীকার করার সময় হয় না। মায়েদের কলিজা কাঁদে। ছাগলদেরও এখন এসব শুনে হাসি আসতে পারে। কারণ আগের দিন আর নেই। কোটিতে গরু, লাখে ছাগল, মুরগি হাজার পার। টাকা এখন পদওয়ালাদের পিছু ঘোরে। তা যে কয় পায়েরই হোক। মাঝে মধ্যে ঘটনাচক্রে দুয়েকটা ভাইরাল হয়ে গেলে আইজি আর ইন্সপেক্টর সে তুলনা করার সময়ও হয় না। পদ-পদবি মনেও থাকে না। নজিরবিহীন মিয়াদের হাতে এত এত সম্পদের বিবরণ শোনার বেশি আর কী-ই বা সাধ্য আছে আমজনতার। ওই মিয়াদের মধ্যে দেশের প্রতিচ্ছবি দেখে এই জনতারা। আর ভাবে, মিয়া ও মিয়ার বিবি-বাচ্চাদের কেন সবাই মাথায় তুলে রাখে?

এর মধ্যেই ছাগল বা যে কোনো অসিলায় দুর্নীতির বিষয়টা সামনে এসেছে। কেউ বা বেনজীর, আসাদ মিয়া, মতিউরের মতো ক্ষমতার বলয়ের পরাক্রমশালীরাও কি কখনো ভেবেছিলেন তাদের এ অবস্থা হবে? ছাগলকাণ্ডে আলোচিত এনবিআর সদস্য এবং কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান শুরু করেছে। অনুসন্ধানের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। মতিউর রহমানকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে সরিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে (আইআরপি) সংযুক্ত করা হয়েছে। মতিউরের পরিবার দেশ ছেড়ে ভেগেছে। তার দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিবলী দুই সন্তান নিয়ে চম্পট দিয়েছেন। বেনজীরও দেশান্তরী। তার হিতাকাক্সক্ষী ক্ষমতাসীন মহল থেকে বলা হচ্ছিল, বেনজীর আহমেদ দুর্নীতি দমন কমিশনে হাজির হয়ে তার বক্তব্য হয়তো পেশ করবেন। তার বক্তব্য শোনার পর, দুদক তদন্ত করে চার্জশিট দাখিল করলে এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলেই শুধু তাকে দুর্নীতিবাজ বলা যাবে। এর আগে নয়। সেই পর্ব পার হয়ে গেছে। বেনজীর নির্ধারিত শেষ সময়ের মধ্যেও দুদকে হাজির না হওয়ায় ধরে নেওয়া যায়, তার কোনো বক্তব্য নেই। এরপরও এই শ্রেণিকে রক্ষা বা পক্ষাবলম্বনের লোক দেশে আছেন।

সাবেক আইজিপি বেনজীর, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া বা ডিআইজি জামিলের বিশাল বিত্তবৈভবের কিছু কিছু প্রকাশে ক্ষুব্ধ তাদের মিত্ররা। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিটা বেশির চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। তারা চান, সাংবাদিকরা যেন তাদের দুর্নীতি এবং বিত্তবৈভব নিয়ে কোনো তথ্য না দেন। এ ব্যাপারে সরকারেরও সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের এমন বিবৃতি ও মতিগতি কষ্ট দিয়েছে সাংবাদিকদের। তাদের অ্যাসোসিয়েশন গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে- কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে দেশের কিছু ক্ষমতাধর বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তার বিপুল ও অস্বাভাবিক সম্পদের বিবরণী সংবাদ করা হয়নি। দায়িত্বশীল সাংবাদিকরা প্রাপ্ত তথ্য, দলিল যাচাই-বাছাই করে, প্রমাণযোগ্য বিষয়গুলোই প্রকাশ করছেন। এ নিয়ে কারও কারও প্রতিক্রিয়ার ভাষা স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি হুমকি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের বড় কাজই হচ্ছে, প্রভাবশালীরা যে তথ্য গোপন রাখতে চান তা অনুসন্ধান করে বের করা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে জনগণকে বিস্তারিত জানানো। এ ক্ষেত্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের দায়িত্ব প্রকাশিত তথ্য নিয়ে তদন্ত করা, দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা।

এরমধ্যে আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও একটা সাবধানতা দেওয়া হয়েছে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে। বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর মর্যাদা নষ্ট হয়, এমন সংবাদ প্রকাশে সতর্ক হতে। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, গত ক’দিন প্রকাশিত সংবাদগুলোর কোনোটিই পুলিশ বাহিনী নিয়ে নয়। এগুলোতে কেবল পুলিশ কর্মকর্তাদের কাণ্ডকীর্তি। কিন্তু, পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন ক্ষেপে গিয়ে প্রকারান্তরে দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষ নিয়েছে। পুলিশ বাহিনীও নিজেদের ‘ঠাকুর ঘরে কে? কলা খাইনার’ দশায় নিয়ে গেছে। কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতি করলে এটি তার বিষয়, কোনো বাহিনীর বিষয় নয় মোটেই। কিন্তু, দুর্নীতিবাজ ও তাদের সাঙ্গাতরা চাতুর্যপূর্ণভাবে গোটা বাহিনীকে সামনে নিয়ে আসছেন। তার ওপর সংবাদের ব্যাকরণ শেখানোর কাজে পা বাড়িয়েছেন। এভাবে এগোলে কবে-কখন কারওয়ান বাজার, ঠাঁটারী বাজারের আলু-পেঁয়াজের দাম ঠিক করা ব্যবসায়ীরাও সংবাদ ও সাংবাদিকের সীমা নির্ধারণ করে বসেন! অথবা দুর্নীতির কোনো সংবাদই দেওয়া যাবে না এমন আইন করার চিন্তা জাগিয়ে তোলেন!

সমাজের অন্যতম নিরীহ জীব সাংবাদিকদের হয়রান-হুমকি, দরকার মনে করলে গায়ে হাত তোলাও কোনো বিষয় নয়। কবি সুকুমার রায়ের ছড়ার মতো, ‘করে না কো ফোঁসফাঁস, মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ’ অবস্থা এই বেচারাদের। সাংবাদিকরা দুর্নীতিবাজ-লুটেরাদের কমন শত্রু। পুলিশ তাদের শত্রু ভাবে। যা ভাবে পুলিশ হত্যাকারী আরাভ খানও। সে দুবাইতে নাজেহাল করেছে সাংবাদিকদের। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান লড়াইটা বলতে গেলে মিডিয়ার একার। দুর্বিনীত সময়ে এ লড়াইয়ে তার সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে সশস্ত্র বা নিরস্ত্র কেউ নেই। জনগণ গ্যালারিতে। পুলিশ মানেই বেনজীর বা আসাদুজ্জামান মিয়া নন। নানান আজেবাজে কাজে তারা গোটা বাহিনীটিকে অধঃপতনের শেষ পিলারে নিয়ে গেছেন। এ কাজে বাহিনীর বাদবাকি তথা সত্যিকারের সৎ-দক্ষদের করার অনেক কিছু আছে। তারা বে-নজির বা মিয়া নন, তা প্রমাণের অনেক সুযোগ তাদের অবশ্যই আছে। পুলিশের পেশাগত স্বার্থেই তাদের ভেতর থেকে ইমেজ উদ্ধারের তাগিদ না থাকলে সেটা হবে গোটা বাহিনীর জন্যই দুর্ভাগ্যের। আর কেবল ছাগল বা পিতা-পুত্রকে না দুষে চাচা-জ্যাঠাদের দায়িত্ববোধও দরকার। কেঁচো খুঁড়তে থাকলে কেবল বাপ বা সাপ নয়, আরও অনেকের আমলনামাই বেরিয়ে আসবে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত