সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফেনীতে বাঁধ ভাঙাগড়ার খেলা!

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৪, ০৩:৩৯ এএম

ফেনীর মুহুরী-কহুয়া নদীর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে যেন ভাঙাগড়ার খেলা চলছে। সাত বছরে ১২২ কিলোমিটার এই বাঁধের ৭০ স্থানে ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। একই স্থানে বারবার ভাঙনের ঘটনাও ঘটছে। বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে গত ১৩ বছরে ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয় হলেও দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পায়নি ফুলগাজী ও পরশুরামবাসী।

স্বাধীনতার পর থেকে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হতো এ দুই উপজেলার হাজারো মানুষ। এসব মানুষের জানমাল ও কৃষিসম্পদ বাঁচাতে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনিয়া নদীর ওপর ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ২০১১ সালে বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হলে পরের কয়েক বছর বন্যামুক্ত ছিলেন স্থানীয়রা। ২০১৩ সালে আকস্মিক বাঁধের ৩ স্থানে ভেঙে যায়। পরে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে তা মেরামত করা হয়। এরপর প্রতিবছর ভাঙে বাঁধের বিভিন্ন স্থান। ছয় বছরে মুহুরী নদীর ভাঙা বাঁধ মেরামতে পাউবোর খরচের হিসাবে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ২২টি স্থানে মেরামতে ২ কোটি ৪৪ লাখ, ২০১৯ সালে ১৫ স্থানে ১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০২০ সালে ২২ স্থানে ১ কোটি ৫০ লাখ, ২০২১ সালে ২১ স্থানে ২ কোটি ১৩ লাখ, ২০২২ সালে ৬ স্থানে ৭১ লাখ ও ২০২৩ সালে ৯ স্থানে মেরামতে ১ কোটি ৩৩ লাখ ব্যয় হয়েছে। চলতি বছরে ঘূর্ণিঝড় রেমালে ক্ষতিগ্রস্ত ৮টি স্থান মেরামতের জন্য ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৭৭ স্থানে ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বাঁধ সংস্কারে গত ৭ বছরে ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তবু ভাঙন রোধ করা যায়নি।

তবে স্থানীয়রা বলছেন, জলের টাকা জলেই গেছে। এতে বাঁধ ভাঙনরোধ হয়নি, তাদের দুর্দশাও কাটেনি। বরং বর্ষা মৌসুমে এলেই বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে বাঁধ সংস্কারের কাজ পেয়েছে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের মধ্যে রয়েছে, মেসার্স কাশেম ট্রেডার্স, মেসার্স ফেনী ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশন, মেসার্স ইমেজ এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স শাহ সুফি এন্টারপ্রাইজ। বিল পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় অন্য প্রতিষ্ঠান কাজ করতে চায় না বলে জানান পাউবো-ফেনীর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম।

স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম রাজু বলেন, বন্যা থেকে রক্ষা পেতে বাঁধ নির্মাণ করলেও তা স্থানীয়দের কোনো কাজে আসছে না। ভাঙনকবলিত স্থানসহ নতুন নতুন জায়গায় প্রতিবছরই বাঁধ ভাঙে। প্রতিবছর এসব ভাঙন মেরামতের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বছর ঘুরতেই সে টাকা পানিতে ভেসে যায়। স্থায়ী সমাধান না করায় প্রতিবছর বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয় মানুষের।

ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, ‘একই জায়গায় বারবার ভাঙে। এর জন্য বরাদ্দও দেওয়া হয়। আবার একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। বন্যা হলে কিছু অসাধু কর্মকর্তার কপাল খুলে যায়। পাউবো কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় ঠিকাদার যেনতেনভাবে মেরামত কাজ করেন। এ কারণে একই জায়গা বারবার ভাঙছে।’

বাঁধ ভাঙনের বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স কাশেম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আবুল কাশেম বলেন, ‘বাঁধের যেসব স্থানে মেরামত করা হয়, সেখানে ভাঙে না, নতুন জায়গায় ভাঙে। একই প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিল বাকি পড়ায় অন্যরা কাজ করতে চান না।’

পাউবো ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৩১ কোটি টাকার টেকসই মুহুরী বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজ শুরু হলে শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত