সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রশ্ন ফাঁসের উৎসব

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৪, ১২:০৫ এএম

দেশের বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের, পরীক্ষার আগে স্মার্টফোন উপহার দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠান থেকে। ফোনগুলো সচল রাখতে বলা হয়, পরীক্ষার আগের রাত থেকে সকাল অবধি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে আসলে কারা জড়িত? গত বছর প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সিন্ডিকেটে ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৪টি কোচিং সেন্টার ও ৫০ জন শিক্ষকের জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য পেয়েছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে বিজি প্রেসের কর্মচারী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতারও তথ্য পেয়েছিলেন তারা। এর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল? শুধু ঢাকা না, দেশের অধিকাংশ জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন এবং গ্রামাঞ্চলের স্কুল এবং উপজেলার কলেজগুলোতে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। সেখানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে লোকদেখানো অভিযান চলে। অপরাধী চিহ্নিত হয়। কিন্তু প্রমাণিত হয়ে শাস্তি পেয়েছে, এমন ঘটনা জানা নেই। যে কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠছে কোচিং সেন্টারগুলো। একইসঙ্গে প্রজন্মকে বোধহীন হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে সোমবার প্রকাশিত হয়েছে ‘৫ হাজার টাকায় মেলে প্রশ্ন সঙ্গে জিপিএ ৫!’ প্রতিবেদন। জানা যাচ্ছে, প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চলে আসে ছবি, পর্যায়ক্রমে সমাধান। পরীক্ষাকেন্দ্রের কক্ষে বসেই স্মার্টফোনে পাওয়া সেই সমাধান দেখে উত্তরপত্রে লেখেন পরীক্ষার্থীরা। প্রশ্ন, উত্তরপত্র ও কলমের সঙ্গে স্মার্টফোনও এসব পরীক্ষার্থীর কাছে অপরিহার্য সরঞ্জাম। মাত্র দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে এভাবেই উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষা দিচ্ছে একটি কেন্দ্রের প্রায় ১০০০ পরীক্ষার্থী! বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে চলছে এমন কার্যক্রম। কেন্দ্র কমিটিকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কবজায় নিয়ে পরীক্ষার্থীদের জন্য এমন বন্দোবস্ত করেছে একটি চক্র।

সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার দুর্গম এক জনপদ মনসুরনগর ইউনিয়নে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতকের জন্য একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলহাজ ফরহাদ আলী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজ। পাশেই এম মনসুর আলী জাতীয় উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়টিই অঞ্চলের এইচএসসি পরীক্ষার একমাত্র কেন্দ্র। যা শুধুমাত্র করা হয়েছে ফরহাদ আলী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের জন্য। দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় উপজেলা সদর থেকে এই কেন্দ্রে সড়ক ও নৌপথে পৌঁছাতে সময় লাগে চার থেকে ছয় ঘণ্টা। ফলে উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিস থেকে কেউ কেন্দ্র পরিদর্শনে তেমন যান না। এই সুযোগে পরীক্ষাকেন্দ্র ঘিরে গত ৬ বছর ধরে যেন চলছে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে নকল বাণিজ্যের উৎসব। বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখা মিলিয়ে অন্তত ৯টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে এই কারবার চালাচ্ছে চক্রটি। এভাবে অবাধে প্রশ্ন ফাঁস ও নকল করে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকায় প্রতি বছরই ভালো ফল করে আলহাজ ফরহাদ আলী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীরা। প্রশ্ন ফাঁস ও নকল বাণিজ্যে মদদের অভিযোগ আছে কেন্দ্র সচিবের বিরুদ্ধে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি না জানলেও কেন্দ্রে যে মোবাইল ফোন দেখে পরীক্ষা দেওয়া যায়, তা এলাকার সবাই জানেন। কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সোহরাব হোসেন বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষীদের আইনানুগ শাস্তি দেওয়া হবে।’

দেশ জুড়ে চলছে এই অপরাধ। গত বছরের একটি ঘটনা। কোচিং ব্যবসা জমিয়ে তুলতেই প্রশ্ন ফাঁসে জড়িয়েছিলেন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান। বিদ্যালয়েই তিনি কোচিং সেন্টার খোলেন। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে নামহীন ওই কোচিং সেন্টারে ক্লাস শুরু হতো। পরীক্ষায় ভালো ফল পাইয়ে দিতে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হতো নিশ্চয়তা। কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থী টানার জন্য লুৎফর রহমান ও তার সহযোগীরা এর আগেও প্রশ্ন ফাঁসের কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। ফাঁস করা প্রশ্ন আশপাশের কয়েকটি কোচিং সেন্টারেও সরবরাহ করতেন তারা।  পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্র সচিবসহ অসংখ্য শিক্ষকের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু শাস্তি কী? সময়ে সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যায়। ফলে সমস্যার সমাধান নেই। আদৌ কি হবে, কেউ বলতে পারে না। মেধাহীন প্রজন্ম, নৈতিক অবক্ষয় এবং শিক্ষার ধস নিয়ে কে কী ভাবছেন, কে জানে!

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত