সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চলে গেলেন হায়দার ব্রাদার্সের আরেকজন

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৪, ০৬:০৫ পিএম

আমরা তাদের পঞ্চপাণ্ডব বলতাম- 'হায়দার' ভ্রাতৃপঞ্চম- জিয়া হায়দার, রশীদ হায়দার, মাকিদ হায়দার, দাউদ হায়দার এবং জাহিদ হায়দার। এই পাঁচজনের মধ্যে এর আগে অন্তিম যাত্রায় চলে গিয়েছিলেন জিয়া হায়দার এবং রশীদ হায়দার। আজ চলে গেলেন পঞ্চপাণ্ডবের তৃতীয়জন- কবি মাকিদ হায়দার। সকাল বেলায় রশীদ-হায়দার তনয়া সায়ন্তী হায়দার ছোট্ট একটি বার্তার মাধ্যমে জানিয়েছে আমাকে। খবরটা শুনে বহুক্ষণ চুপ হয়ে গিয়েছিলাম।

পঞ্চপাণ্ডবের পাঁচজনের মধ্যে আমার সবচেয়ে সখ্য এবং নৈকট্য ছিল রশীদ ভাইয়ের সঙ্গে। দাউদের সঙ্গে নব্বই দশকের শেষভাগে বার্লিনের একরাত আমি ভুলবো না। জিয়া ভাই আমার কাছে ছিলেন দূরের এক নমস্য ব্যক্তি। জাহিদের নাম জানা ছিল, কিন্তু কখনো পরিচয় হয় নি। মাকিদের সঙ্গে পরিচয় গত কয়েক বছরে শামীমের মাধ্যমে। ওর অতি নিকট বন্ধু ছিল মাকিদ। কত শুনেছি ওদের সখ্যের কথা। পরিচয়ের পরে মাকিদের সঙ্গে একটি উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি হতে সময় লাগেনি।

এই পঞ্চপাণ্ডবের নানাবিধ গল্প করতেন রশীদ ভাই। বিশেষ একটা মুচকি হেসে বলতেন, 'আমার চার ভাইই কবি, আমি কিন্তু কবি নই। আমি হচ্ছি নিরেট এবং নীরস গদ্যলেখক।' রগড় করে বলতেন, 'পাবনা শহরে আমরা বিখ্যাত ছিলাম আমাদের সাহিত্যকর্মের জন্যে নয়, একটি বেগুনী জামার জন্যে'। পাবনা শহরের রাস্তাঘাটে পাঁচভাইকে দেখা যেত বেগুনী জামায়। লোকে ভাবতো, একই রঙের জামা বানিয়েছে পাঁচ ভাই। 'আসল ব্যাপার ছিল', স্মিতহাস্যে রশীদ ভাই বলতেন, 'আমাদের একটাই পছন্দের বেগুনী জামা ছিল। ওই একটা জামা পরেই আমরা নানান সময়ে শহরে বেরুতাম।'

মাকিদের সঙ্গে পরিচয়ের পরপরই মাকিদ আমাকে 'সম্রাট' বলে ডাকতে শুরু করলো- আমার 'সেলিম' নামের কারণে। ভরাট গলার সেই ডাক আমার কানে এখনও লেগে আছে। আমার লেখার ভীষণ ভক্ত ছিল মাকিদ - বিশেষত: আমার গদ্যেরশৈলীর। শামীমসহ নানানজনকে বলেছে সে কথা মাকিদ। 

২০১৮ সালে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে সতীর্থ-৬৯ আয়োজন করেছিল পুস্তক প্রকাশনা উৎসবের আমাদের চারজন সতীর্থ বন্ধুর - মহিউদ্দীন (মহিউদ্দীন আহমেদ), নরেশ (নরেশ ভূঁইয়া), শামীম (শামীম আজাদ) এবং আমার। সে অনুষ্ঠানে এসেছিল মাকিদ। শ্রোতা-দর্শকে পরিপূর্ণ মিলনায়তনের একবারে শেষ সারিতে বসেছিল মাকিদ-বন্ধুদের সঙ্গে বসে মুর্হুমূর্হু করতালি এবং উচ্চকণ্ঠে আমাদের অভিনন্দিত করছিল বন্ধুবৎসল মাকিদ। 

ভাইদের এবং ভ্রাতুস্পুত্র এবং ভ্রাতুস্পত্রীদের ভীষণ ভালোবাসতো মাকিদ। নির্বাসিত দাউদের সঙ্গে দেখা করার জন্যে ওরা কলকাতায় যেতো। অসুস্থ শরীরে সাম্প্রতিক সময়েও এটা করেছে মাকিদ। বন্ধুদের প্রতিও এমনটাই ব্যবহার ছিল মাকিদ হায়দারের।

আমার সঙ্গে মাকিদের শেষ দেখা ২০২৩ সালের 'সমকাল' পত্রিকার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপনের অনুষ্ঠানে। একই টেবিলে বসেছিলাম আমরা। তারপর হাসি-ঠাট্টা, রঙ-তামাশা আর একটানা আড্ডা। মাকিদ ভীষণভাবে চাইতো, আমরা ওর উত্তরার বাড়িতে একবেলা খাই এবং আড্ডা দেই। নানান সময়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। শামীমকে নানান সময়ে বলেছিল, 'সম্রাটকে নিয়ে উত্তরায় আসিস।' অসুস্থতার কারণে আমি যেতে পারিনি। শামীম গিয়েছিল এবং অনিন্দ্যসুন্দর একটি সময় কাটিয়েছিল ওর পরিবারের সঙ্গে। সেদিন ওর সঙ্গে না দেখা হওয়ার মনেবেদনা আমার বুকে বড়ো বাজছে আজ।

পারিবারিক নানান দুর্যোগ এবং নিজের নানান স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে ছিল মাকিদ দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু কোনো কিছুই ওর মুখের হাসি, ঠাট্টাপ্রিয়তা, বন্ধুবাৎসল্যক্ খর্ব করতে পারে নি। চোখে আর ওকে দেখবো না, কিন্তু মনে থাকবে ওর নিত্য আনাগোনা। হৃদয়ে শুনবো সে ডাক 'সম্রাট, এসো কিন্তু আমাদের বাড়িতে'।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত