রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইয়ামালের পায়ে বাঁকানো রংধনু

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৪, ১২:২৮ এএম

বয়স মাত্র ১৬ বছর। এই বয়সে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে নামিয়ে দেওয়ায় স্প্যানিশ ম্যানেজার লুইস দে লা ফুয়েন্তের প্রতি অনেকেই বাঁকা মন্তব্য করেছিলেন। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছিল জার্মানির শিশুশ্রম আইনের ভয়। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে আদ্রিয়েন রাবিও বলে ফেললেন, এত ছোট একজন কিশোর কি এমন বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে পারবে? লামিনে ইয়ামাল সেই চাপ শুধু সামলালেনই না, ইউরোতে নিজের প্রথম গোল করার জন্য বেছে নিলেন সেমিফাইনালের কঠিন মঞ্চটাই। দলের জয়ে রাখলেন অবদান। হয়ে গেলেন ইউরোতে ১৬ বছর বয়সে গোল করা একমাত্র ফুটবলার।

মুয়ানির গোলে পিছিয়ে পড়ে ততক্ষণে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে স্পেন। দুর্দান্ত প্রেসিং আর পাসিংয়ে তারা বারবার ঢুকে পড়ছিল প্রতিপক্ষের দুর্গে। অবশেষে ২১তম মিনিটে বলের গায়ে লাগে ইয়ামালের জাদুর ছোঁয়া। স্পেনের সংঘবদ্ধ আক্রমণ থেকে বক্সের বেশ বাইরে বল পেয়ে যান ইয়ামাল। প্রতিপক্ষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রায় ২৫ মিটার দূর থেকে ধনুকের মতো অবিশ্বাস্য বাঁকানো শটে বল পাঠিয়ে দেন জালে! এ দৃশ্য দেখে ডাগ-আউটে বসা পেদ্রির চোখ গোল হয়ে যায়। কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকার স্পষ্ট করে বলে দেন, ‘নতুন মহাতারকার জন্ম হলো’। বড় ফুটবলারদের শুরুর সময়টা হয়তো এমনই হয়। ম্যাচের সাধারণ পরিস্থিতিকেও তারা গোলের সুযোগে পরিণত করেন। যেমনটা করতেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

ইয়ামালের সেই বাঁকানো শটের গোল মনে করিয়ে দেয় আর্জেন্টাইন ফুটবল মহাতারকার শুরুর সময়টাকে। বার্সেলোনায় কিশোর মেসির পায়েও এমন রংধনুর দেখা মিলত। আর্জেন্টিনার ফুটবল জাদুকরের ছোঁয়া তো সেই কবেই পেয়েছেন ইয়ামাল। মাত্র ছয় মাস বয়সে ২০ বছর বয়সী মেসির কোলে চড়ে ইয়ামালের জলে অবগাহনের ছবি এখন মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে। পৃথিবীতে আসার ছয় মাসের মধ্যে ফুটবল জাদুকরের ছোঁয়া পাওয়া ইয়ামালের দ্বিতীয় জন্ম তো হয়েছে মেসির আঁতুড়ঘর ‘লা মাসিয়া’তেই।

বার্সেলোনার ফুটবলার তৈরির কারখানা থেকে তুলে এনে গত বছর তাকে ফুটবল দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তখনকার ম্যানেজার জাভি হার্নান্দেজ। বার্সার সিনিয়র দলে আসার পর থেকেই একের পর এক ম্যাচে উপহার দিয়ে যান চোখধাঁধানো ফুটবল। দ্রুতই ইউরোপিয়ান ফুটবলে ছড়িয়ে পড়ে ইয়ামালের নাম। পিএসজির কাতারি মালিক নাসের আল খেলাইফি অঢেল অর্থ নিয়ে ছুটে আসেন বার্সা থেকে ইয়ামালকে নিয়ে যেতে। কিন্তু আর্থিক সংকট থাকলেও কাতালান ক্লাবটি তাদের এই সম্পদকে এত দ্রুত হাতছাড়া করতে রাজি হয়নি। ইয়ামাল থেকে যান বার্সাতেই। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা আর পায়ের জাদুতে দ্রুতই ডাক পান জাতীয় দলে।

স্পেনের এসপ্লুগুয়েস দে লোব্রেগাতের এক উদ্বাস্তু পরিবারে জন্ম হয়েছিল ইয়ামালের। বাবা মরোক্কান আর মা আফ্রিকার দেশ গিনির। উদ্বাস্তু পরিবারের নানা প্রতিকূলতা আর দারিদ্র্যের কশাঘাত সয়ে শৈশবেই ফুটবল পায়ে ছুটে বেড়াতেন অলিগলিতে। কিন্তু এভাবে কি আর ফুটবলার হওয়া যায়? ইয়ামালের জীবন আমূল বদলে যায় ২০১৪ সালে। ওই বছর তার পরিবার স্থায়ীভাবে পাড়ি জমায় বার্সেলোনায়। ফুটবলের প্রতি ছেলের এত আগ্রহ দেখে সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে সেরা সিদ্ধান্তটাই নেন ইয়ামালের মা-বাবা। ছোট্ট ইয়ামালকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় লা মাসিয়ায়। ফুটবল দুনিয়ার নতুন জাদুকরের হাতেখড়ি হয় এভাবেই।

অল্প সময়ের এই উত্থানপর্বে ইয়ামালকে অনেক কিছুই ছাড়তে হয়েছে। আগে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে ইচ্ছেমতো এটা-সেটা খেয়ে ফেলতেন। ফাস্ট ফুডের প্রতি অন্য রকম আগ্রহ ছিল। কিন্তু ক্লাবের নির্দেশে সেসব ছাড়তে হয়েছে। খাদ্যতালিকায় এসেছে বড় পরিবর্তন। কিশোর বয়সে বড়দের বিপক্ষে খেলার জন্য নিজেকে শারীরিকভাবেও প্রস্তুত করেছেন। চলতি বছর ওজন বাড়িয়েছেন ৪ কেজি। সেই সঙ্গে উচ্চতাটাও বেড়েছে। শরীরের সঙ্গে ক্ষুরধার মস্তিষ্কের যুগলবন্দিতে এ বয়সেই ইউরোতে প্রতিপক্ষ রক্ষণকে বারবার তিনি বোকা বানিয়েছেন। সতীর্থদের গোল বানিয়ে দিয়েছেন। অবশেষে সেমিফাইনালের মঞ্চে সব আলো টেনে নিলেন নিজের দিকে। চোখধাঁধানো গোলে জানিয়ে দিলেন, ফুটবল দুনিয়ায় রাজত্ব করতে নতুন জাদুকর আসছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত