সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চিরজীবিতদের দেশে কবি মাকিদ হায়দার

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৪, ০২:৩৩ এএম

কবি মাকিদ হায়দার চলে গেলেন চিরজীবিতদের দেশে। হয়ে গেলেন ভব দুঃখ-সুখের অতীত। পশ্চাতে রেখে গেলেন অসংখ্য গুণগ্রাহী পাঠক, আত্মীয়-স্বজন ও ঈর্ষাপরায়ণ সমকাল। রোগ-শোকে কিছুদিন কাতর ছিলেন। মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে কবি জাহিদ হায়দার ভাই জানালেন, মাকিদ ভাইয়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। বললাম, একদিন আপনাকে সঙ্গে নিয়ে দেখে আসব। কবি ফরিদ আহমদ দুলাল ভাইয়ের সঙ্গেও কথা হলো। আমাদের কথা ছিল, বাংলা একাডেমিতে কবি অসীম সাহার শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে মাকিদ ভাইয়ের উত্তরার বাসায় যাব। একটু বিলম্ব হয়ে গেল, সেদিনের মতো যাওয়া হলো না। কিন্তু এ যাওয়া যে সম্পন্ন হবে না তা ভাবতে পারিনি। ভাবতে ভাবতেই তিনি চলে গেলেন। দুঃখ থেকে গেল আমাদের এই ইঁদুর দৌড়ের পৃথিবীতে প্রাণের টানে খুব বেশি কিছু হয়ে ওঠে না।

মাকিদ হায়দার দীর্ঘকাল কবিতার সঙ্গে ছিলেন, কবিদের সঙ্গে ছিলেন, কবিতাকেই করে তুলেছিলেন জীবনের ধ্রুবতারা। বিলম্বিত ষাটে তিনি কবিতার যাত্রা শুরু করেছিলেন, বিরতিহীন এ যাত্রা। কখনো কবিতার প্রতি বিমুখ ছিলেন না, ক্লান্ত ছিলেন না। যেখানেই কবিতার মানুষ, কবিতার আয়োজন সেখানেই তার সরব উপস্থিতি। তাকে ছাড়া সাহিত্যের অনেক আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার কথা আয়োজকরা ভাবতে পারতেন না। মাকিদ হায়দার নেই মানে আনন্দের ঘাটতি, অয়োজনের ঊনতা। নিরহংকার-আনন্দময় মানুষ তিনি, গণ-মানুষের সঙ্গী- তারুণ্যের সঙ্গে তার কবিতাযাপন। তার কবিতা ছিল প্রেম ও আবেগের সমাহার। যাপিত জীবনই ছিল তার কবিতার বিষয় খেটে খাওয়া মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলার ভূপ্রকৃতি ও নর-নারীর প্রেম তার কবিতাকে করেছিল বাক্সময়। কবিতায় শিল্পের আড়ালের চেয়ে তার হৃদয়ের সমাহার বেশি। হৃদয়-সংবেদি পাঠকও তার কবিতার মূল্য বুঝতেন। তিনি নিজের জীবনকে জন-মানুষের জীবনে রূপান্তর করেছিলেন। সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় তিনি পরিচয় পেয়েছিলেন ‘রোকনালী’ নামে। অবশ্য তার ডাক নামও ছিল রোকন। তার সৃষ্ট রোকনালী বাংলা কবিতায় এক অনন্য চরিত্র  সর্ব মানুষের প্রতিনিধি। তার কবিতা নিয়ে বোদ্ধাজনের অনেক কথা আছে হয়তো প্রশংসা ও নিন্দা অবিমিশ্র নয়। কবিতাকে যারা কেবল শৈল্পিক কলাকৈবল্যবাদের দোহাই দিয়ে আলোচনা করে থাকেন, আমি হয়তো তাদের দলে নই। কবিতাকে কবির নিজের জীবনের মধ্যেও সংঘটিত করে তুলতে হয়। তথাকথিত শিল্পর মাপে সব সময় কবিতা মানুষের কাছে ধরা দেয় না। তার কবিতা ছিল সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত জীবনের স্ফুরণ। যা সহজে ধারা যায়, ছোঁয়া যায়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়।   

মহাকালের ছোট আর বড়র পার্থক্য খুব বেশি কিছু নয়। সময় দূরে সরে গেলে সব কিছু ছোট হতে থাকে। যারা মাকিদ হায়দারের সঙ্গে মিশেছেন তারা তার গুরুত্ব জানেন তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ-বহুমুখী বৈচিত্র্য অভিজ্ঞতার ঝুড়ি। তার সঙ্গে একবার এক গাড়িতে দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করেছিলাম দিনাজপুর থেকে ঢাকা। একটা সাহিত্য সম্মেলন থেকে ফিরছিলাম। ভাবছিলাম, কীভাবে এতটা রাস্তা পার করব। কিন্তু প্রায় দশ ঘণ্টার যাত্রা শেষে যখন রাতে তার উত্তরার বাসা থেকে আলাদা হয়ে গেলাম, তখন সত্যিই ভাবলাম রাস্তা এত ছোট কেন! কেন দিনাজপুর থেকে ঢাকা আরও দূরে হলো না। দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেল তার সঙ্গে কথায় কথায়। সত্যিই সেদিন এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিলাম, রাস্তার কষ্ট ভুলতে মাকিদ ভাইকে নিয়ে একদিন পুরো বাংলাদেশ ঘুরে দেখব। সবখানেই তার চেনাজানা, সবখানেই তার লোক সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কীভাবে সম্পর্ক রাখা যায়, তিনি ছিলেন তার মূর্ত প্রতীক। তার গল্পের মধ্যে ছিল নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সব রসময় বর্ণনা। নিজের গল্প, পাবনা দোহারপাড়ার গল্প, কবি হওয়ার গল্প, তার দুই মায়ের গল্প। একবার পিতার সঙ্গে গিয়ে কীভাবে ড. বিধান রায়ের কাছে চিকিৎসা নিয়েছিলেন, কীভাবে ফিলিপাইনে ম্যাগসাইসাইয়ের সভাপতি আবিওয়ালার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সেদিন জেনেছিলাম, তার তো কবি হওয়ার গল্প, কীভাবে সর্ব-অগ্রজ জিয়া হায়দার ভাই তাদের এভাবে তৈরি করেছেন। চাকরি সূত্রে বহু শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় ও তাদের গল্প।

সেদিন দিনাজপুর থেকে ফিরতি পথে আমরা একটি পরিকল্পনা করে ফেললাম। যদিও আমাদের মধ্যে ছিল এক ধরনের গোপন অভিমান একই এলাকায় মানুষের মধ্যে যে ধরনের স্যাডিজম থাকে। মাকিদ ভাই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করলেন, বললেন ‘তোর ওখানে শুনি অনেকে যায়, অনেকে আমাকে বলে, তুই নাকি আমাদের ততটা গুরুত্ব দিস না, যদিও তুই আমায় অনেকবার বলেছিস, ওরা তো আর তা জানে না।’ আমি বললাম, ‘আপনাকেই দায়িত্বটা নিতে হবে, হায়দার পরিবারের সম্মানে, পাবনার সব কবি সাহিত্যিককে নিয়ে আমরা একটি ব্যতিক্রম আয়োজন করব, রাত্রিযাপন করব।’ মাকিদ ভাই বললেন, ‘রশীদ ভাইয়ের শরীরটা তত ভালো যাচ্ছে না রে।’ আমার এক গো, ‘যত খারাপই হোক, রশীদ ভাই ছাড়া এ আয়োজন সম্ভব নয়।’ শেষ পর্যন্ত রশীদ ভাই রাজি হয়ে গেলেন। সেই মহেন্দ্রক্ষণে হাজির হয়ে গেলেন পাবনার কৃতিমানেরা পাবনার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল চরনিকেতনের কুঞ্জকুটিরে। এই দিনটি কেবল চরনিকেতনের জন্য নয়, পুরো পাবনার কবি সাহিত্যিকের জন্য ছিল স্মরণীয়, এমনকি কবি পরিবারের জন্যও, তারা কেউ এর আগে একত্রে এমন একটা অনুষ্ঠানে অনেক দিন উপস্থিত হতে পারেননি নিজের জন্মভূমির বুকে। যদিও সেই আয়োজনে সঙ্গত কারণে কবি দাউদ হায়দার উপস্থিত থাকতে পারেননি, জিয়া ভাই আগেই প্রয়াত। পরে তার দলবল নিয়ে কনিষ্ঠ আরিফ হায়দার চর নিকেতনে রাত্রি ঘুরে গেছেন।

রশীদ ভাই অনুষ্ঠানে বললেন, ফিরে গিয়েও জানালেন, আমি বিশ্বের বহু দেশে গিয়েছি, কিন্তু এই আয়োজনের কোনো তুলনা নেই। আমি আমার নিজের জেলায় নিজের মানুষের কাছে এতটা সমাদৃত হলাম। বললেন, পাবনার কবি সাহিত্যিকদের জন্য যে কাজ আমাদের করার কথা ছিল সেটি তুমি করছ, আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে পাবনাবাসীর পক্ষ থেকে তোমাকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমি মনে মনে ভাবলাম, তেমন কিছু নয় ইনহাস্ত ওয়াতনম নিজের মাটির কাছে মানুষের কাছে ফিরে আসলে যা হয়। ঢাকায় ফিরে গিয়ে এই স্মৃতি নিয়ে মাকিদ ভাই একাধিক পত্রিকায় লিখলেন। কবিতা উৎসর্গ করলেন, শব্দশৈলীতে ছাপা হলো সেই কবিতা, জাহিদ ভাই লিখলেন, কবিতা উৎসর্গ করলেন, ‘প্রেমকে যখন বানিয়ে ফেলেছি খুনি’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আজও আমার সব কাজে হায়দার ভ্রাতৃগণন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। পাবনা থেকে ফেরার কিছুদিনের মধ্যে রশীদ ভাই চলে গেলেন। খুব কষ্ট পেলাম, তবে এ ভেবে সুখ পেয়েছি অন্তত তার আগমনে আমার মনোবাসনা কিঞ্চিৎ পূরণ হয়েছিল; আর মাকিদ ভাই ছিলেন তার কুশীলব। 

হায়দার পরিবার মানেই একখ- পাবনা। জেলার আঞ্চলিক ভাষা তাদের উচ্চারণে শোভা পেত, আমরা যারা প্রমিত বাংলা বলতাম, তারাও রশীদ ভাই, মাকিদ ভাইয়ের সামনে গেলে পাবনার ডাইলেক্টসে কথা বলতে বাধ্য হতাম। তাদের সান্নিধ্য ছিল যেন সন্তান ফিরে এসেছে মাতৃক্রোড়ে। কিন্তু দিনে দিনে স্বজনের তালিকা হ্রস্ব হয়ে আসছে, জিয়া ভাই নেই, রশীদ ভাই নেই, মাকিদ ভাই চলে গেলেন, দাউদ ভাই দেশান্তরী। এখনো যখন প্রাত্যহিক চাপে কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ি, তখন জাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করি। সমকালীন বাংলা কবিতা ও কবির পরিম-লে মাকিদ হায়দার এমন এক অনিবার্য চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন, অনেক দিন তার অভাব অপূরণীয় থেকে যাবে। ভালো কবি হয়তো পাওয়া সহজ, কিন্তু তার মতো সরল আন্তরিক কবি মানুষ পাওয়া ততটা সহজ নয়।  

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত