দেশে প্রতি বছর ৩ কোটি মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ার শিকার। ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে আগামী প্রজন্ম। খাদ্য ও সবজিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে প্রচলিত ল্যাবরেটরি টেস্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই সংকটের একটি দীর্ঘস্থায়ী, সহজ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান নিয়ে এসেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক। তারা এমন একটি যুগান্তকারী পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা মাত্র ১ ঘণ্টার মধ্যে এবং অত্যন্ত নামমাত্র খরচে সবজি বা পানিতে বিষাক্ত কীটনাশকের উপস্থিতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারবে।
কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রযুক্তি দেশের নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনে এক নতুন বিপ্লব আনবে।
নিরাপদ খাদ্য ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্যের জোগান দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। অধিক ফলন ও পোকা দমনের আশায় কৃষকরা শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করেন। বাজারে প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিগুলো (যেমন GC-MS বা LC-MS) অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল; প্রতিটি নমুনা পরীক্ষায় ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। ফলে সাধারণ ক্রেতা বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে পরীক্ষা করে ক্ষতিকর উপাদান জানা সম্ভব হয় না। এই সুযোগে বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে বিষযুক্ত সবজি, যা ধোয়ার পরও পুরোপুরি রাসায়নিকমুক্ত হয় না।
কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি
গবেষকেরা জানান, উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি মূলত ‘অ্যাসিটাইলকোলিনস্টেরেজ’ (AChE) নামক একটি এনজাইমের কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি একটি ‘কালোরিমেট্রিক’ বা বর্ণভিত্তিক পদ্ধতি। সবজি বা পানির নমুনা পরীক্ষার সময় কীটনাশকের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নমুনার রঙের পরিবর্তন ঘটে। এই এনজাইমের কার্যকারিতা যদি ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়, তবে সেটিকে ক্ষতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় এ পদ্ধতির নির্ভুলতার মাত্রা বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত উচ্চমানের (জ২ = ০.৯৯৭) বলে প্রমাণিত হয়েছে।
খরচ কমবে ৪০ গুণ
গবেষণা প্রকল্পের প্রধান গবেষক ও শেকৃবির কৃষি রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুল কাইউম জানান, নতুন এ প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় এবং এক ঘণ্টারও কম সময়ে (৪০ থেকে ৬০ মিনিট) নির্ণয় করা যাবে কোনো সবজি বা পানিতে ক্ষতিকর কীটনাশক রয়েছে কি না। প্রচলিত ল্যাব টেস্টের তুলনায় এতে খরচ কমবে প্রায় ৪০ গুণ। ইতিমধ্যে টমেটো, বেগুন, পালং শাক, করলা, শসা ও বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন সবজি এবং সেচ ও পুকুরের পানির নমুনায় সফলভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (সাউরেস) অর্থায়নে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
নীরবে ছড়াচ্ছে মারণব্যাধি
খাদ্যে বিষক্রিয়ার পরিসংখ্যান ও ভয়াবহ পরিণতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন সমীক্ষায় বাংলাদেশে খাদ্যে বিষক্রিয়ার চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বার্ষিক আক্রান্ত ৩ কোটি : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে খাদ্যে বিষক্রিয়া বা অনিরাপদ খাদ্যের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে এই ভয়াবহ খাদ্যদূষণের কারণে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারান এবং দুই লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতি মাসে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর প্রায় ৭.৫% বিষক্রিয়ার শিকার হয়। এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
কীটনাশকের অপব্যবহার : কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বাজারে থাকা প্রায় ৩৫% থেকে ৪০% সবজিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি রাসায়নিক ও কীটনাশক অবশিষ্টাংশ (Residues) থেকে যায়।
তীব্র বিষক্রিয়া (Acute Toxicity): বিষাক্ত উপাদানযুক্ত খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পেট ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া ও শরীর অবশ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যা শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
চূড়ান্ত পরিণতি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ : প্রতিদিন অল্প অল্প করে এই বিষাক্ত কীটনাশক শরীরে প্রবেশ করলে তা লিভার ও কিডনিতে জমা হতে থাকে (Bioaccumulation)। এর ফলে ৫ থেকে ১০ বছর পর মানবদেহে এমন কিছু রোগ বাসা বাঁধে যা নিরাময় অযোগ্য। শাকসবজিতে ব্যবহৃত অনেক কীটনাশক সরাসরি ‘কার্সিনোজেনিক’ বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী। বর্তমানে দেশে লিভার, কোলন ও পাকস্থলীর ক্যানসার এবং কিডনি বিকল (Organ Failure) হওয়ার হার বাড়ার পেছনে এই অনিরাপদ খাদ্যই অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া গর্ভবতী মায়েরা এই বিষাক্ত খাবার গ্রহণ করলে গর্ভস্থ শিশুর স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
চিকিৎসক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা প্রতিদিন খাবারের নামে যা খাচ্ছি, তা আসলে ‘স্লো পয়জন’ বা ধীরগতির বিষ। শেকৃবির উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তিটি সহজে বহনযোগ্য বা ‘পোর্টেবল’। ফলে মাঠপর্যায়ে বা কঁাঁচাবাজারে বসেই তাৎক্ষণিকভাবে সবজির বিষাক্ততা পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। এটি যদি দ্রুত সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনা যায়, তবে দেশের সাধারণ মানুষ নামমাত্র খরচে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পারবেন এবং ধেয়ে আসা ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় থেকে আগামী প্রজন্ম রক্ষা পাবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, কৃষি সম্প্রসারণ ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)