মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের এইচ-১বি ভিসার ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ১ লাখ ডলারের ফি বাতিল করেছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। সোমবার (৮ জুন) বোস্টনের ইউএস ডিস্ট্রিক্ট বিচারক লিও সোরোকিন এই রায় দেন। আদালত এটিকে একটি ‘অবৈধ কর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, মার্কিন কংগ্রেস এর কোনো অনুমোদন দেয়নি।
টেক কোম্পানিগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এই ভিসার খরচ আকাশচুম্বী করে গত সেপ্টেম্বরে এই ফি ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ডেমোক্রেটিক পার্টির ২০টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার প্রেক্ষিতেই আদালত এই রায় দিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য যুক্তি দেখিয়েছিল, এই ফি একটি বৈধ আর্থিক জরিমানা। দেশটির ফেডারেল অভিবাসন আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যখন তিনি মনে করবেন কোনো বিদেশি নাগরিকের প্রবেশ ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর’, তখন তিনি তাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি আরোপ করতে পারেন।
তবে ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক সোরোকিন এই যুক্তি নাকচ করে দেন। তিনি রায়ে উল্লেখ করেন, এই ফি কোনো জরিমানা নয়, বরং এটি একটি কর (ট্যাক্স)। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই কর আরোপের কোনো আইনি কর্তৃত্ব নেই এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এটি বাস্তবায়ন করতে পারে না।
বিচারক সোরোকিন তার রায়ে লেখেন, ‘এখানে ১ লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের প্রকৃতি এবং এর প্রয়োগই বলে দেয় যে এটি একটি কর, একে যে নামেই ডাকা হোক না কেন।’
বিচারক তার রায়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের গত ফেব্রুয়ারির একটি রায়ের উদাহরণ টানেন, যেখানে জাতীয় জরুরি অবস্থার একটি আইন ব্যবহার করে ট্রাম্পের আরোপিত ব্যাপক শুল্ক (ট্যারিফ) বাতিল করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়ের যৌক্তিকতা তুলে ধরে সোরোকিন বলেন, ট্রাম্পের একইভাবে অভিবাসন আইনের অধীনে কর আদায়ের কোনো কর্তৃত্ব নেই।
এদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স এক বিবৃতিতে আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করে বলেছেন, আপিলে বিচারক সোরোকিনের এই আদেশ বাতিল হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যেকোনো শ্রেণির বিদেশি নাগরিকের প্রবেশাধিকার সীমিত করার স্পষ্ট আইনি কর্তৃত্ব রয়েছে, যা আমেরিকার সর্বোত্তম স্বার্থের অনুকূল নয় বলে তিনি মনে করেন। তিনি ঠিক সেটাই করেছেন।’
সাধারণত এইচ-১বি প্রোগ্রামের আওতায় বার্ষিক ৬৫ হাজার ভিসা দেওয়া হয়। এর বাইরে উচ্চতর ডিগ্রিধারী কর্মীদের জন্য আরও ২০ হাজার ভিসা বরাদ্দ থাকে, যা তিন থেকে ছয় বছরের জন্য অনুমোদিত হয়। ট্রাম্পের এই ঘোষণার আগে, বিদেশি কর্মীদের ভিসার জন্য নিয়োগকর্তাদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ২,০০০ থেকে ৫,০০০ ডলার ফি দিতে হতো।
এই বিশাল অংকের নতুন ফি আরোপের সপক্ষে ট্রাম্প এক ঘোষণায় দাবি করেছিলেন, এইচ-১বি প্রোগ্রামটির উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন কর্মীদের সহায়তা করা, কিন্তু এর অপব্যবহার করে কম বেতনের এবং কম দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী এনে আমেরিকানদের চাকরি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছিল।
তবে এই নতুন ফি সেইসব বিদেশি নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য ছিল না যারা ইতোমধ্যে স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং যারা সাধারণত নতুন এইচ-১বি ভিসাপ্রাপকদের একটি বড় অংশ।
এই ফি চালুর পর থেকে খুব কম নিয়োগকর্তাই তা পরিশোধ করেছেন। গত মার্চ মাসের একটি ফাইলিংয়ে ইউএসসিআইএস-এর এক কর্মকর্তা জানান, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংস্থাটি ১ লাখ ডলার ফির মাত্র ৮৫টি পেমেন্ট পেয়েছে।
ফি আরোপ ছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি আবেদনকারীদের আরও কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছে এবং একটি নতুন ভিসা নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করেছে, যা উচ্চ-দক্ষ এবং উচ্চ-বেতনভোগী কর্মীদের অগ্রাধিকার দেবে।
এই ১ লাখ ডলারের ফি বাতিলের দাবিতে অন্তত তিনটি ভিন্ন মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে ইউএস চেম্বার অব কমার্সের একটি মামলাও রয়েছে, যা গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসির একজন বিচারক খারিজ করে দিয়েছিলেন। ওই বিচারক ট্রাম্পের ফি নির্ধারণের ক্ষমতা রয়েছে বলে রায় দিলে চেম্বার অব কমার্স এর বিরুদ্ধে আপিল করে।
বোস্টনের আদালতে এই মামলার নেতৃত্ব দেওয়া ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা ট্রাম্পের এই ‘অবৈধ এবং ব্যয়বহুল ১ লাখ ডলারের কর’ বাতিল করার রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই করটি ছিল আমেরিকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার এবং কর্মক্ষেত্রের জরুরি চাহিদা পূরণের জন্য উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন প্রতিভা আকর্ষণ ও ধরে রাখার ক্ষমতার ওপর একটি আঘাত।’