গাছ কমে যাওয়ায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে গ্রামবাংলার চিরচেনা তালের শাঁস

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম

একসময় গ্রামের বাড়ির আঙিনা, খালের পাড়, মাঠের ধারে কিংবা পথের পাশের তালগাছগুলো ছিল গ্রামবাংলার পরিচিত দৃশ্য। বর্ষায় গাছের নিচে পড়ে থাকত পাকা তাল আর গ্রীষ্মের মৌসুমে গাছে ঝুলত থোকায় থোকায় পানি তাল। গ্রামের মানুষ দল বেঁধে সেই গাছের পানি তাল পেড়ে খেত। তাল কেটে বের করা হতো স্বচ্ছ, নরম ও সুমিষ্ট তালের শাঁস। গরমের দিনে শিশু থেকে বৃদ্ধ-সবার কাছেই এটি ছিল প্রিয় ও প্রশান্তিদায়ক এক মৌসুমি খাবার। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই পরিচিত দৃশ্য এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে তালগাছ কমে যাওয়ায় একসময়কার সহজলভ্য পানি তাল এখন বাজারে ৩০ টাকা দিয়েও কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেককে। সহজলভ্য এই ফল ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে দুষ্প্রাপ্য পণ্যে।

ভোলা শহরের কালিবাড়ি রোডের মাথায়, ভোলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে পানি তাল বিক্রি করছেন বাহার মিয়া। তার দোকানে ভিড় করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষ। 

তাল কিনতে আসা শিক্ষার্থী ইসরাফিল বলেন, গ্রামাঞ্চলে এখন আর আগের মতো পানি তাল পাওয়া যায় না। তাই এখানে এসে কিনে খেতে হচ্ছে। কিন্তু দাম অনেক বেশি। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পানি তাল খাওয়াও এখন অনেকটা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এক প্রবীণ ডাব ব্যবসায়ী পানি তাল কিনতে এসে বলেন, আমার স্ত্রী তালের শাঁস খেতে চেয়েছে। তাই তার জন্য পানি তাল কিনে নিয়ে যাচ্ছি। আগে এসব ফল কিনে খেতে হতো না, এখন কিনতে হচ্ছে।

ভোলা জেলা আদালতে কাজে আসা চরফ্যাশনের এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শহরে একটি পানি তাল ৩০ টাকা। অথচ আমাদের চরফ্যাশনে ১০ থেকে ১৫ টাকায় পাওয়া যায়। শহরে এসে দাম অনেক বেড়ে গেছে।

পানি তাল বিক্রেতা বাহার মিয়া বলেন, প্রতি তাল ৩০ টাকায় বিক্রি করি। আমার কিনতেই লাগে ১৭ থেকে ১৮ টাকা। এরপর পরিবহন, বাছাই ও অন্যান্য খরচ আছে। সব মিলিয়ে তেমন বেশি লাভ থাকে না।

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০টি পানি তাল বিক্রি করেন। সে হিসেবে দৈনিক বিক্রি হয় প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার।

তাল কিনতে আসা ব্যবসায়ী হাবিবুল্লাহ মোল্লা বলেন, এই পানি তাল একসময় আমাদের গাছের নিচে কত পড়ে থাকত। কেউ গুরুত্ব দিত না। এখন একটি তাল ৩০ টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে একসময় পরের প্রজন্ম হয়তো পানি তাল চিনবেই না, তালের শাঁস কী জিনিস সেটাও জানবে না।

অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, গরমে পানি তাল খেতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের দেশে তাল বিক্রির পদ্ধতি এখনও আধুনিক হয়নি। কেরালা কিংবা থাইল্যান্ডে তাল এমনভাবে প্রসেস করে দেওয়া হয়, যাতে মানুষ সহজে খেতে পারে। আমাদের এখানেও সেই ব্যবস্থা হওয়া প্রয়োজন।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা কখনো ভাবিনি পানি তাল কিনে খেতে হবে। ছোটবেলায় দল বেঁধে তালগাছে উঠতাম, সবাই মিলে আনন্দ করে তালের শাঁস খেতাম। এখন গ্রামাঞ্চলে তালগাছ কমে গেছে, চাষ হয় না, পানি তালও পাওয়া যায় না। বর্তমানে একটি তাল ৩০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তারপরও পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না। এটা এখন প্রায় দুর্লভ একটি ফলে পরিণত হয়েছে।

এদিকে তালগাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ভোলা সদর উপজেলা কৃষি অফিস। প্রতিবছর উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রাস্তার পাশে তালসহ বিভিন্ন গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরেও কয়েকশ তালগাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. কামরুল হাসান।

তিনি বলেন, একটা সময় আমাদের বসতবাড়ির আশেপাশে এবং রাস্তার দুপাশে প্রচুর তালগাছ ছিল। এখন অবকাঠামোগত ও কৃষি উন্নয়নের কারণে দিনে দিনে তালের গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এই কারণে তালের কাঁচা অংশ বা পানি তালের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কৃষি পূনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় প্রতি অর্থবছরই দুই থেকে তিনশ তালগাছের চারা রোপণ করি, যাতে তালের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং মানুষও নিজ থেকে উৎসাহিত হয়।

তিনি আরও বলেন, তালগাছ শুধু ফলের উৎস নয়, এটি বজ্রপাত প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সবাইকে রাস্তার আশেপাশে ও খালি জায়গায় বেশি বেশি তালগাছ রোপণের আহ্বান জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত