আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসনে জোটগতভাবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি। দল থেকে তার এ মনোনয়ন পাওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে প্রার্থী নিয়ে দ্বিধা, অনীহা এবং সংশয় দেখা দিয়েছে বেশি।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের এ গ্রুপিং, অন্তর্কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত বিএনপি প্রার্থী। দলের কৌশলগত কারণে আগে একাধিক প্রার্থী থাকলেও অবশেষে একক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপিতে ফুরফুরে ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সম্প্রতি তারা নজিবুল বশর মাইজভান্ডারিকে অস্বীকৃতি জানিয়ে হাজার হাজার নেতা-কর্মী ফটিকছড়ি উপজেলা সদরের দলীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। দলীয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার দাবি জানিয়ে ব্যর্থ হয়ে তারা শেষমেশ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীকেই নির্বাচনে লড়তে সমর্থন জানিয়েছেন। এ আসনে দলীয় মনোনয়ন না পা্ওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন জেলা আ’লীগের সদস্য ও ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম। ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ সক্রিয়ভাবে তার নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ ব্যাপারে ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন মুহুরির বলেন, 'গত নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নজিবুল বশর মাইজভান্ডারিকে সাংসদ বানিয়ে আমরা সংসদে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন। আ'লীগের একটি অংশকে প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে দলের অভ্যন্তরে অন্তঃকোন্দল সৃষ্টি করেছেন। ওনার পুরোনো অভ্যাস মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানির পাঁয়তারা করছেন। এসবের পরেও আমরা কেনো ওনাকে সমর্থন দেবো?'
উপজেলা আওয়ামী লীগ তার হয়ে ভোটের মাঠে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত পুরো অংশটি সাথে থাকছেন কিনা তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। তবে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করে বিদ্রোহী প্রার্থী এটিএম পেয়ারুল ইসলাম বলেন, 'বিগত সময়ে নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি লুটে-পুটে খেয়েছেন। এমন কোন খাত নেই, যেখানে তিনি চাঁদাবাজি করেননি। এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তিনি প্রত্যক্ষ মদদদাতা। সাংসদ হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য কোন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেননি। উল্টো আওয়ামী লীগের মধ্যে তিনি কোন্দল সৃষ্টি করেছেন। এমন দুর্নীতিপরায়ণ জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে আপামর জনসাধারণ প্রত্যাখ্যান করবে। আপেল প্রতীকের নিরঙ্কুশ বিজয় ঘটবে।'
তার এ বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়ে মহাজোট মনোনীত নৌকার প্রার্থী তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি বলেন, 'সাংসদ নির্বাচিত হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। গত পাঁচ বছরে ফটিকছড়িতে যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। এ উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে নৌকার বিকল্প নেই।'
প্রসঙ্গত, ফটিকছড়ি আওয়ামী লীগে 'ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ' ও 'ফটিকছড়ি আওয়ামী পরিবার' নামে বিবাদমান দু'টি গ্রুপ রয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের নেতৃত্বে থাকলেও অপর একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলম বাবু, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক ফখরুল আনোয়ার ও সাবেক ছাত্রনেতা এইচ.এম আবু তৈয়ব। এ অংশটিও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছে উপজেলাজুড়ে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গসংগঠনের অসংখ্য নেতা-কর্মী রয়েছে এই গ্রুপে।
খবর নিয়ে জানা যায়, ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর থেকে মূলত ফটিকছড়ি আওয়ামী লীগ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পরে। দিন দিন এই বিভক্তি চরম আকার ধারণ করে। আলাদা আলাদাভাবে সাংগঠনিক কর্মসূচিও পালন করে আসছে এই দুই গ্রুপ। পাল্টা-পাল্টি কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলম বাবু ও জেলা আ'লীগ নেতা এইচ.এম আবু তৈয়ব বলেন, 'যারা আওয়ামী লীগ করে অথচ ক্ষমতার লোভে নৌকার বিপক্ষে যায়, তারা প্রকৃত আওয়ামীলীগার নয়। প্রকৃত আওয়ামী লীগ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। নৌকার বিজয় অবশ্যম্ভাবী।'
অপরদিকে দলের কৌশলগত কারণে একাধিক প্রার্থী থাকলেও শেষ পর্যন্ত একক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপিতে ফুরফুরে ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রার্থীকে নিয়ে দিন-রাত মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন নেতা-কর্মীরা। এ আসনে ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত বিএনপি'র ধানের শীষ
প্রতীকের প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অবঃ) আজিম উল্লাহ বাহার। বিজয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, 'এ নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের অংশ। আপামর জনসাধারণ ধানের শীষে ভোট দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের সকল অন্যায় অবিচারের জবাব দিতে মুখিয়ে আছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষ বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করবে।'
এ ছাড়া এ আসনে বাংলাদেশ ইসলামি ফ্রন্ট মনোনীত মোমবাতি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন মহাজোট মনোনীত নৌকার প্রার্থী সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারির ভাতিজা সৈয়দ সাইফুদ্দীন মাইজভান্ডারি। হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে এলাকায় তার প্রচারণা-গণসংযোগও চলছে জোরে-শোরে। সবকিছু মিলিয়ে দারুণ বিপাকে পড়েছেন মহাজোটের প্রার্থী।