ফুটবলারদের মানোন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। বিশ্ব ফুটবলে এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এ দেশের ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার নেই বললেই চলে। আধুনিক ফুটবলাররা দ্রুত ছুটছেন হরেকরকম প্রযুক্তির ছোঁয়ায়। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের তখন পড়ে থাকতে হচ্ছে অন্ধকারে। অথচ প্রযুক্তির সহায়তায় খুব সহজেই একজন কোচ জেনে যাচ্ছেন শিষ্যদের আদ্যোপান্ত। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) সেখানে বড় সহায়ক। আশার কথা দেরিতে হলেও জিপিএসের সঙ্গে শিগগিরই পরিচয় ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশি ফুটবলারদের। দেরিতে হলেও এই প্রযুক্তির সহায়তা নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন।
জিপিএসের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম পরিচয় ঘটে গত বছর। দেশের একমাত্র উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচ মারুফুল হক এই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় ঘটান আরামবাগ ক্লাবের কর্তাদের। কোচের কাছ থেকে এর উপযোগিতা সম্পর্কে জেনেই ক্লাবটি অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করে এই প্রযুক্তি। যার সুফল তারা পেয়েছে সে বছরই। জিপিএস প্রযুক্তির সহায়তায় দলের ফুটবলাররা নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জেনে গিয়েছিলেন। সেসব মাথায় রেখে নিজেদের উজাড় করে খেলেছে দলটি। তাদের ফিটনেস গ্রাফও উঠে গিয়েছিল হু হু করে। লিগ কিংবা ফেডারেশন কাপে বড় সাফল্য তারা পায়নি। কিন্তু গতবারের স্বাধীনতা কাপ জিতে তারা তাদের সামর্থ্যরে প্রমাণ রেখেছিল। ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি প্রতিষ্ঠার ৬০ বছরের মাথায় এসে পেয়েছে প্রথম কোনো শীর্ষ পর্যায়ের শিরোপার স্বাদ।
জিপিএসের উপযোগিতা বুঝতে পেরে এ বছর এই প্রযুক্তি আওতায় আসে আরেক তারুণ্যনির্ভর দল সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব। তবে দেশের জন্য বড় সুসংবাদ হচ্ছে, এবার একই পথে হাঁটতে যাচ্ছে ফুটবল ফেডারেশনও। এশিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফসি) আর্থিক সহায়তা এর মধ্যেই দেশে পৌঁছে গেছে ৪০টি জিপিএস। জাতীয় দলের জন্য আনা এই প্রযুক্তি এখন চট্টগ্রাম বন্দর কাস্টমস থেকে ছাড় হওয়ার অপেক্ষায়।
বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ জানালেন, দলের ইংলিশ কোচ জেমি ডের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই তারা নিয়েছে এই উদ্যোগ। ৩৮ বছরের এই কোচের জমানায় আর কিছু না হোক, জাতীয় দলের ফিটনেসে দেখা গেছে ব্যাপক উন্নতি। জিপিএসের সংযুক্তি দলটির ফিটনেসকে আরো ওপরে নিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা বাফুফে সাধারণ সম্পাদকের, ‘ঢাকার দুটি ক্লাব এটি ব্যবহারে সুফল পাচ্ছে। তাছাড়া বিদেশে এর ব্যবহার হয় যত্রতত্র। আমি মনে করি এই প্রযুক্তি জাতীয় দলের মনোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।’
যার মাধ্যমে এই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে দেশীয় ফুটবলারদের পরিচয় ঘটেছিল সেই মারুফুল হক এর উপযোগিতাটা বোঝাতে চাইলেন এভাবে, ‘আসলে এটা শুধু বলে বোঝানো যাবে না। এর ব্যবহারে একজন কোচ অথবা ট্রেনারের কাজ অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়। একজন খেলোয়াড় ট্রেনিং সেশনে কিংবা ম্যাচে কতটা দৌড়াল, কতটা দৌড়ানোর সামর্থ্য আছে তার, কতটা ক্যালরি তার ব্যয় হলো, এসব কিছুর রেকর্ড এখন আমার হাতের মুঠোয়। এতে করে একজন ফুটবলার ফিটনেসে কতটা ঘাটতি আছে জেনে সেটা কাটানোর জন্য চেষ্টা বাড়িয়ে দেবে।’
মারুফের অধীনে স্বাধীনতা কাপজয়ী গত মৌসুমের আরামবাগ দলের অন্যতম পারফরমার ছিলেন স্ট্রাইকার মাহবুবুর রহমান সুফিল। আধুনিক এই প্রযুক্তির কল্যাণে নিজের উন্নতির কথাই সামনে টেনে আনলেন, ‘এর ফলে আমাদের নিজেদের মধ্যেই একটা তাড়না কাজ করত। প্রতিযোগিতাও হয়ে যেত নিজেদের মধ্যে যে কে কত বেশি দৌড়াল। গতিময় ফুটবলের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে ফিটনেসটা সেই পর্যায়ে থাকতে হয়। আমাদের অনেকেরই পারফরম্যান্স হিসাব করলে দেখা যেত ইউরোপিয়ান ফুটবলে একজন যতটুকু দৌড়ায় তার চেয়ে বেশিই আমরা দৌড়েছি।’ এ মৌসুমের বসুন্ধরা কিংসে নাম লেখানো সুফিল জাতীয় দলে জিপিএস সংযুক্তির খবরে বেশ খুশি, ‘এটা তো বড় সুসংবাদ আমাদের জন্য। আমি তো মনে করি ক্লাবগুলোরও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত।’
আরামবাগের বর্তমান দলের অভিজ্ঞ উইঙ্গার জাহিদ হোসেনও বুঝতে শুরু করেছেন এই প্রযুক্তির উপকারিতা, ‘এটার ফলে একজন ফুটবলারের ফিটনেসের সব দিক বের হয়ে আসে। সেটা দেখে নিজেকে শোধরানো যেমন যায়, খেলায়ও আসে গতি, তীব্রতা। যেটা আধুনিক ফুটবলে খুব জরুরি।’
বড়দিনের ছুটি কাটিয়ে জাতীয় দলের কোচ জেমি ডেও ফেরার কথা আসছে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। বাফুফের আশা তার আগেই জিপিএসগুলো ছাড়িয়ে আনতে পারবে তারা।
জিপিএসে দ্রুত উন্নতির ৬ কারণ
বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স ও খেলার সাথে এখন পুরোপুরি জড়িয়ে জিপিএস। সাফল্যের জন্য উন্মুখ সবাই ব্যবহার করছেন। মেসি, নেইমার, রোনালদো থেকে নতুন উঠে আসা অ্যাথলেটও। অন্তত ৬টি কারণ দেখুন এর।
ইনজুরির ঝুঁকি কমানো : সাফল্যের সবচেয়ে বড় শত্রু ইনজুরি। জিপিএস পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম থেকে অ্যাথলেট কখন ইনজুরিতে পড়তে পারেন তার বেঞ্চমার্ক ঠিক করা যায়।
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ : নির্দিষ্ট একজনের উন্নতিতে কী কী দরকার তা ঠিক করা যায়। তাকে বছর জুড়ে সজীব ও ব্যস্ত রাখতে সঠিক রুটিন করা সম্ভব। অফ সিজনের নির্দিষ্ট রুটিন। পারফরম্যান্স ডাটা কোচকে খেলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
অ্যাথলেটকে সেরা অবস্থায় রাখা : ডাটা বিশ্লেষণ করে কোচ আগে থেকে খেলোয়াড়কে খেলার দিনের জন্য সেরা অবস্থায় রাখতে পারেন।
কোচকে খেলোয়াড়ের বোঝা সহজ হয় : মুখে বললে অনেক সময় ঝাপসা থাকে। কিন্তু ডাটা দেখিয়ে আলোচনা করলে কোচ ও খেলোয়াড়ের মধ্যে আর বোঝাবুঝির অস্পষ্টতা থাকে না।
ক্রমাগত উন্নতি : ট্র্যাকিং ডাটার কারণে প্রতি বছর অ্যাথলেটের উন্নতির জন্য পারফরম্যান্স বেঞ্চমার্ক করা সহজ। কোথায় কী করলে আরো ভালো হবে তা নির্ধারণে ঝামেলা কম।
রিক্রুটিংয়ে সহায়তা : ডাটা মিথ্যে বলে না। উন্নতির জন্য কতটা কমিটেড তার ধারাবাহিকতা দেখে দল গড়ার কাজে সহায়তা মেলে।