ভোটাধিকার প্রয়োগ না করলেও সব ধরনের কাজ করতে ঘরের বাইরে বের হন নারীরা। হাট-বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সব ক্ষেত্রেই নারীদের উপস্থিতি রয়েছে
বাংলাদেশ স্বাধীনের পর একে একে একাদশটি সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এর মাঝে হয়েছে স্থানীয় সরকারের বহু নির্বাচন। কিন্তু চাঁদপুরের রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা কখনোই ভোট দেননি! এক পীরের ‘আদেশকে’ সম্মান জানিয়ে নারীরা ভোটদানে বিরত রয়েছেন বলে জানা যায়। এবারও অবস্থা পাল্টানোর তেমন সম্ভাবনা নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার ওই ইউনিয়নে মোট নারী ভোটার ১২ হাজার ১১৪ জন। ৪ বর্গমাইল আয়তনের ইউনিয়নে পুরুষ ভোটার ১২ হাজার ৩৩০ জন। অর্থাৎ এবারও অর্ধেক ভোটার ভোটদান থেকে বিরত থাকছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য জানাচ্ছেন, এবার নারীদের ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করেছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর এই এলাকায় মহামারী আকারে কলেরা দেখা দেয়। এ সময় ‘জৈনপুরী’ নামে এক পীর নারীদের পর্দার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেন। তখন থেকেই পর্দানসীন রাখতে নারীদের ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়।’ ভোটাধিকার প্রয়োগ না করলেও সব ধরনের কাজ করতে ঘরের বাইরে বের হন নারীরা। হাট-বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সব ক্ষেত্রেই নারীদের উপস্থিতি রয়েছে।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে আমি জয়লাভ করলেও কোনো নারী আমাকে ভোট দেননি। আশা করি, সংসদ নির্বাচনে নারীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।’
যুগ যুগ ধরে ভোটাধিকার প্রয়োগ না করা নারীরা এবারের নির্বাচনেও ভোট দেবেন না বলে মনে করছেন রোকেয়া বেগম। তবে তিনি চান নারীরা ভোট দিক। স্থানীয় এই বাসিন্দা বলেন, ‘ভোট না দেওয়ায় জনপ্রতিনিধিদের কাছে পুরুষ ভোটারদের মূল্য থাকলেও নারীরা থাকেন অবহেলিত। নির্বাচিতরা ইউনিয়নের নারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বরাবরই থাকেন উদাসীন।’ এমিলি বেগম বলেন, ‘এই এলাকার নারীরা সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে, কিন্তু ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের মা, দাদি, নানিরা কোনো নির্বাচনেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন না। ইচ্ছা থাকার পরও আমরা ভোট দিতে পারছি না।’
এবার নারীরা ভোট দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী লোকের সংখ্যাও কম নয়। গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা হাসমত ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোহেববুল্লাহ খান বলেন, ‘একটা সময় এই ইউনিয়নের নারীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ না করলেও এখন চিত্র পাল্টাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে নারীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।’
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইসকান্দার আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পীরের নামে গুজব ছড়িয়ে নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরাও দায় এড়াতে পারবেন না। অতীতে তারাই নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং বিগত নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এরকম গুজব ছড়িয়ে পরবর্তী পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেয় এক শ্রেণির সুবিধাভোগী। তবে এবারের নির্বাচনে নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ওই ইউনিয়নের নারীদের নির্বানচমুখী করতে জনসচেতনতামূলক কাজসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী, সামাজিক সংগঠনসহ গণমাধ্যমকর্মীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মাজেদুর রহমান বলেন, ‘রূপসা ইউনিয়নের নারী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য বিভিন্নভাবে উদ্বুগ্ধ করা হয়েছে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলী আফরোজ বলেন, ‘আমরা প্রতিটি কেন্দ্র পরিদর্শনকালে নারীদেরকে ভোট দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছি। কিন্তু তারা বহুকাল পূর্ব থেকে ভোটদান থেকে বিরত রয়েছেন।’ এই নির্বাচনেও নারীদের ভোট দেওয়ার বিষয়ে নিরাশার কথাই ব্যক্ত করেন তিনি।