প্রথম মহাকাশযান হিসেবে চাঁদের ‘অদেখা অংশে’ অবতরণ করেছে চীনের চাং’ই-৪। গতকাল বৃহস্পতিবার চীনা সময় বেলা ১০টা ২৬ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ২৬ মিনিট) মনুষ্যবিহীন রোবটটি চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে বলে দেশটি দাবি করেছে। চাং’ই-৪ চন্দ্রপৃষ্ঠের ছবি পাঠিয়েছে বলেও জানিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া। চীনা জাতীয় মহাকাশ কর্তৃপক্ষ (সিএনএসএ) জানিয়েছে, রোবটটি পূর্বনির্ধারিত চন্দ্রপৃষ্ঠের ১৭৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা ও ৪৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশ রেখার মধ্যে অবতরণ করেছে। রোবটটিতে ছবি তোলার সরঞ্জাম ছাড়াও চাঁদের ভূতত্ত্ব ও জীববিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে সক্ষম এমন যন্ত্র রয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে যানটির পাঠানো চন্দ্রপৃষ্ঠের একাধিক ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। ছবিগুলো অবশ্য সরাসরি গবেষণা কেন্দ্রে আসছে না। মহাকাশে পাঠানো আরেকটি স্যাটেলাইট হয়ে এটি পৃথিবীতে আসছে। বিবিসি বলছে, চীনা রোবটটির চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণকে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের মাইলফলক হিসেবে বিবেচেনা করা হচ্ছে। সর্বশেষ ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষাণা কেন্দ্র নাসার পাঠানো অ্যাপোলো যানে চড়ে মানুষ চাঁদে অবতরণ করে। এবারের যানটিতে মানুষ না থাকলেও পৃথিবীর উল্টোমুখী চাঁদের ‘অদেখা অংশে’ এই প্রথম অবতরণ করায় এর গুরুত্ব অনেক বেশি। চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনায় চীনের এটা প্রথম বড় ধরনের অগ্রগতি। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মহাকাশচারী ই কুয়েনঝি বলেন, ‘এই প্রথম চীন এমন একটি কাজ করে দেখাল, যা এর আগে কেউ পারেনি।’ গত ৭ ডিসেম্বর চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সিচ্যাং ভূ-উপগ্রহ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে রোবটটি উৎক্ষেপ করা হয়। ১২ ডিসেম্বর এটি তার কক্ষপথে পৌঁছায়। দেশটি এর আগেও একটি মহাকাশযান সফলভাবে চাঁদে পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদের দক্ষিণাংশের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ হিসেবে পরিচিত অঞ্চলের রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হবে রোবটটি। যুক্তরাজ্যের মুলার্ড স্পেস সায়েন্স ল্যাবরেটরির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু কোটাস বলেন, ‘চাঁদের সোলার সিস্টেমে আড়াই হাজার কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ও ১৩ কিলোমিটার গভীর ওই অঞ্চলটির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।’ এটি চাঁদের সবচেয়ে বড়, গভীর ও পুরাতন জ্বালামুখ বলেও জানান তিনি।
এটি চাঁদের অনাবিষ্কৃত অংশের মাটি ও পানির তথ্য সংগ্রহে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে সেখানে চাষাবাদ করা যাবে কি না এ সংক্রান্ত নানা পরীক্ষা চালানো ও তথ্য সংগ্রহও করবে। এ জন্য আলু ও ফুলের চারা পাঠানো হয়েছে।
‘অদেখা অংশ’ কী?
পৃথিবী থেকে চাঁদের এক পাশ সব সময় দেখা যায়। একই সময়ে চাঁদ নিজ কক্ষপথ ও পৃথিবীর চারপাশে ঘোরায় অপর অংশটি দেখা যায় না। এই অংশে সূর্যের আলো পড়লেও পৃথিবী থেকে দেখা না যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা এটিকে ‘অন্ধকার অংশ’ বলে অভিহিত করে থাকেন। মূলত, এটিকে পৃথিবীবাসীর ‘অদেখা অংশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পৃথিবী থেকে চাঁদের এই অংশটির অবস্থান অপেক্ষাকৃত দূরে। পৃথিবীর কাছাকাছি অংশের তুলনায় এ অংশটির গঠন বেশ আলাদা। এখানে জমাট পুরোনো ভূত্বক রয়েছে, যার চারদিকে রয়েছে অসংখ্য গর্ত। সেখানে বেশ কিছু অশ্বখুর আকৃতির আগ্নেয়গিরি জাত শিলা রয়েছে।
যে শক্তির কারণে দক্ষিণ মেরুর আইকন বেসিনের তৈরি হয়েছে, সেটি হয়তো চাঁদের ওপরের আবরণ ভেঙে অনেক গভীরে চলে গেছে। সে ক্ষেত্রে চাং’ই-৪ এর কাজ হবে, এসব উপাদান পরীক্ষা করে পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহের ইতিহাস আবিষ্কার করা।