মিরপুর ক্রিকেট একাডেমির ব্যস্ত সকাল। ডেভিড ওয়ার্নার পা রাখেন মাঠে। তাকে দেখেই চলে আসেন ‘ফিজ’। মোস্তাফিজুর রহমান। কাটার মাস্টার। ক্যাপ্টেনকে পেয়ে গেছেন। দারুণ আন্তরিক সময় কাটে। খুনসুটিতে ভরা। সিরিয়াস ভঙ্গিতে কী যেন বলেন ফিজ। হেসেই লুটোপুটি ওয়ার্নার। কে বলবে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক সহঅধিনায়কের জীবন এলোমেলো করে দেওয়া ঝড় বয়ে গেছে!
মোস্তাফিজ রাজশাহী কিংসের। ২০১৬ আইপিএলে তাকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের অধিনায়ক ওয়ার্নার তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজিকে তুলে দিয়েছিলেন প্রথম শিরোপা। তখন ফিজ-ওয়ার্নার রসায়ন নিয়ে কত কথা। এমনকি ফিজের জন্য বেশ বাংলাও শিখে নিয়েছিলেন ওয়ার্নার।
সেই বাংলার প্রয়োগ গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় একটি পাঁচতারা হোটেলে বেশ করলেন। আগের রাতে ঢাকায় পা রেখেছেন। ২০১৮ মার্চের বল ট্যাম্পারিং কেলেঙ্কারির পর অনেক কিছুই হারিয়েছেন। দেশের মাটিতে চলমান বিগ ব্যাশ লিগেও খেলা হচ্ছে না। দেশেও এমন আসরে নিষিদ্ধ। প্রথমবারের মতো এসেছেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল)। সিলেট সিক্সার্সের জন্য। ওয়ার্নারের জন্যই সংবাদ সম্মেলন সন্ধ্যায়। ঢাকার ট্রাফিক নিয়ে এটা-ওটা কথা। ‘সিডনিতেও এমন ট্রাফিক।’ জানান। পেছনে সিলেট সিক্সার্সের ব্যানারে পড়েন, ‘লাগলে বাড়ি।’ তারপর কী? সামনে বসা সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান। ‘বাউন্ডারি।’ হাসেন। স্বল্প সময়ের প্রেস কনফারেন্সে প্রাণখোলা হাসিও হাসেন। অথচ কী কঠিন সময়টাই না পার করছেন!
আর এই সময়টায় তার কণ্ঠে ঘুরেফিরে আসে ‘সম্ভাব্য সেরা মানুষ’ হওয়ার চেষ্টার কথা। সেই চেষ্টাই চলছে। গত মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকায় বল ট্যাম্পারিং কেলেঙ্কারিতে এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ। দুঃসহ সময় কেটেছে। এখনো তো মুক্তি মেলেনি। কিন্তু খারাপের মধ্য থেকে ভালোটাই বের করে আনেন ওয়ার্নার। এই সময় কতটা কঠিন প্রশ্নে স্মিত হেসেই বলতে থাকেন, ‘আমার জন্য তো সব ভালোই যাচ্ছে। বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারছিলাম। সাইডলাইনে বসে না থাকলে এটা তো করতে পারতাম না।’
সহঅধিনায়কত্ব হারিয়েছেন। তাকে আর কখনো অস্ট্রেলিয়া দলের নেতৃস্থানীয় কাজে বিবেচনা না করার সুপারিশ আছে। বিশ্ব জানে, তার পরামর্শেই ক্যামেরন ব্যানক্রফট টেস্টে বল বিকৃত করায় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট আজ কলঙ্কিত। একসময় আন্তর্জাতিক সফরে মারামারি করেছেন। অ্যালকোহলে ডুবে থেকেছেন। সব ছেড়ে ফিরেছিলেন ভালোতে। আলোতে। দারুণ পারফরমার ও নির্ভরযোগ্য মানুষও হয়েছিলেন। কিন্তু আবার অকস্মাৎ পতন। সেখান থেকে উঠে আসার পথে এই সময়ে ওয়ার্নার নিজেকে শুধরাচ্ছেন আরও, ‘আমার জন্য এটা নিজের সেরাটা বের করে আনার, মানুষ হিসেবে পরিণত হয়ে ওঠার। আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাড়িতে বাবা ও স্বামীর ভূমিকা পালন করা।’ আর এখন? ‘এখন খেলার মাঠে ফিরে এসেছি। এখন আমার কাজ সিলেট সিক্সার্সকে টেবিলের শীর্ষে রাখা।’
গেল বছরের শেষে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলেছিলেন। এসেছেন অস্ট্রেলিয়ার নিচু সারির ক্লাব ক্রিকেটে খেলে। ‘অস্ট্রেলিয়ার ক্লাব ক্রিকেটে উইকেট এই মুহূর্তে কিছুটা নিচু ও ধীর। ওটার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন। কিন্তু দেশে আমি বেশ ভালো ফর্মে ছিলাম।’ জানিয়ে নিজের প্রথম বিপিএলে ভালো কিছুর পণ, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রামে যেহেতু আগে খেলার অভিজ্ঞতা আছে আমি জানি উইকেট তেমনই হবে। আমার কাজ হলো রুটিন আর ছন্দে ঢুকে পড়া। এর সঙ্গে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া। খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনা।’
কেলেঙ্কারির পার্টনার স্টিভেন স্মিথের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে খেলবেন স্মিথ। তিনিও এক বছর নিষিদ্ধ। তার বিপক্ষে ‘আরেকটা ম্যাচ হিসেবেই চাইছি।’ ‘চাই আমাদের বোলাররা দ্রুত তাকে আউট করে দিক’ আবার হাসেন ওয়ার্নার।
২৯ মার্চ নিষেধাজ্ঞা কাটার পর মে-জুলাইয়ের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাওয়া কঠিন। তারপরও আশাবাদী নিশ্চয়ই? ‘আমাকে নেবে কী নেবে না তা নির্বাচকদের ব্যাপার। আমি শুধু এই টুর্নামেন্টে, আইপিএলে রান করে যেতে পারি। আর নিজেকে যতটা সম্ভব ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারি।’
ঘুরেফিরে আসে ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার প্রসঙ্গ। যা হওয়া মানুষের জন্যই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন কাজ।