চট্টগ্রামে ইয়াবা আসক্তি ‘বেড়েছে’ কিশোরদের

কৌতূহল, সহজলভ্যতা ও সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় চট্টগ্রাম নগরীতে ইয়াবা আসক্তি বেড়েছে কিশোর-কিশোরীদের। তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ স্কুল-কলেজ পড়–য়া। নগরীর কয়েকটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এসব তথ্য জানিয়েছে।

নগরীর মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র ‘আর্ক’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পারভেজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদকাসক্তদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইয়াবাসেবীকে আমরা রোগী হিসেবে পাই। উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে টিনএজার বেশি। ক্লাস নাইন-টেনের ছেলেমেয়ে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। কৌতূহল তো রয়েছে, পাশাপাশি ফ্রিতে মাদকসেবনের সুযোগদানের বিনিময়ে ইয়াবা বিক্রির টোপ এদের মধ্যে আসক্তিটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে মাদকবিরোধী অনুষ্ঠান করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় স্কুল-কলেজে সপ্তাহে একদিন যদি এই বিষয়ে বাধ্যতামূলক ক্লাসের ব্যবস্থা করা যায়।’

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ‘প্রয়াস’-এর পরিচালনা পরিষদের সদস্য সাজ্জাদ হায়দার বলেন, ‘২০০০ সালের দিকে ফেনসিডিল ও হেরোইনের প্রতি আসক্তি ছিল খুব বেশি। বর্তমানে ৯০ শতাংশ রোগী ইয়াবা আসক্ত হিসেবে আমরা পেয়ে থাকি। ’

কিশোর রোগী কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টিনএজারদের (কিশোর-কিশোরী) সম্পর্কে বলার কিছু নেই। ক্লাস সিক্সের ছাত্রকেও আমরা রোগী হিসেবে পেয়েছি। আবার মুন্সীগঞ্জের একটা ছেলেকে পেয়েছিলাম, যাকে এসএসসি পরীক্ষার এক মাস আগে ভর্তি করানো হয়েছিল। এখান থেকেই সে পরীক্ষা দেয়। আমরা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করাই, তার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে। এবার সে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছে।’

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ‘তরী’র পরিচালনা পরিষদের সদস্য মো. লিটন বলেন, ‘ফেনসিডিল বা হেরোইন আসক্তদের মানসিক ও শারীরিক দিক থেকে বোঝা যায়। কিন্তু ইয়াবা আসক্তদের শারীরিক দিক থেকে বোঝা যায় না। তাই অভিভাবকরা দেরিতে বুঝতে পারেন। আর ইয়াবায় আসক্তিটা এখন টিনএজারদের গ্রাস করছে বেশি। এর মূল কারণ সহজলভ্যতা। দ্বিতীয় কারণ মানসিকভাবে তাৎক্ষণিক চাঙ্গা ভাব। এ দুইয়ের কারণে এটি এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। ’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মেট্রো উপ-অঞ্চলের উপপরিচালক শামীম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় চট্টগ্রামের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে ভিজিট করতে গিয়ে আমরা দেখি, ইয়াবা আসক্তি কী পরিমাণ বেড়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০-এর কোটায়। আমাদের কড়াকড়ির কারণে অন্যান্য মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা কমেছে। তাই মাদকসেবীরা ইয়াবাকে বেছে নিচ্ছে। কারণ আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়ায় খুব সহজেই এটি বহন করা যায়। তবে ইয়াবার চালান আসছে এটা যেমন সত্য, তেমনি র‌্যাব-পুলিশ-নারকোটিকস ডিপার্টমেন্টের অভিযান চলছে, এটাও সত্য। নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও আমাদের অভিযানে সফলতা আসছে।’

সেবনের টাকা জোগাতে ব্যবসায়

নগরীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোহর (ছদ্মনাম)। বছর দুয়েক আগে এক সহপাঠীর মাধ্যমে ইয়াবা সেবনে ঝুঁকে পড়েন তিনি। দৈনিক তিনটি করে ইয়াবা ট্যাবলেট লাগত তার। কিন্তু বাসা থেকে এ টাকা দেওয়া হতো না। একপর্যায়ে যার কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন, তিনিই তাকে একটা উপায় বাতলে দেন। নিজেই দু-চারটি করে বন্ধুদের কাছে ইয়াবা বিক্রি করতে থাকেন মোহর। প্রথম দিকে নিজে খরচ করে বন্ধুদের ইয়াবা সেবন করিয়েছেন তিনি। পরে বন্ধুরাই তার কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন। সম্প্রতি পরিবার খোঁজ পেলে ভারতে নিয়ে তাকে চিকিৎসা করায়। এখন সুস্থতার পথে তিনি।

কেউ কেউ স্লিম বা চিকন থাকতে ইয়াবা সেবনের কথা জানিয়েছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া এমন দুই ছাত্রীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। মডেলিং করা এ দুজন জানান, ‘চেজিং দ্য ড্রাগন’ (অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েলে রেখে সেবন) পদ্ধতি কিংবা সিরিঞ্জের মাধ্যমে সরাসরি শরীরে প্রবেশ করানোটা ক্ষতিকর। তাই তারা কফির সঙ্গে গুলিয়ে ইয়াবা সেবন করেন। মুঠোফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে বিক্রেতাদের কাছ থেকে ইয়াবা নেন তারা।