কয়জন ধর্ষিতাকে জমি দেব আমরা

এই নির্বাচন নিয়ে অনেক বিষয় মানুষ আলাপ করেছে তা নয়। বহু লোক এই বিজয়ের বিশালতায় কিছুটা হলেও থমকে গেছে যেন। সাধারণত নির্বাচনে মানুষ একটু প্রতিযোগিতা দেখে। হয়তো আশাও করে। কিন্তু এবারের নির্বাচন এত একপেশে হয়েছে যে, মানুষ অন্যান্য বিষয়ে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সেইসব বিষয়ের মধ্যে একটি হচ্ছে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। এই নির্বাচনের মধ্যে এরকম একটি ভয়াবহ কান্ডের জন্য মানুষ প্রস্তুত ছিল না। যার জন্য ঝাঁকিটা লেগেছে অনেক বেশি। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মানুষ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে বা নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলেই আমরা এত কিছু শুনলাম বা জানলাম। প্রতিদিন কোনো না কোনো স্থানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আমরা খুব একটা ঘুরে তাকাই না। প্রতি পাঁচ বছরে একবার নির্বাচন হয় এবং সেটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের রাজনীতি চালু থাকে। যেমনটি এবারও ছিল। তার মানে কি এই যে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর আমরা কোনো ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে চিন্তিত হব, শঙ্কিত হব?

দুই.

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে কারণগুলো রয়েছে সেগুলো আমাদের সবার জানা। অতএব এটি আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বন্দ্ব বলে গণমাধ্যমে যেসব তথ্য, প্রচার ও প্রতিবাদ এসেছে সে সবে যাব না। তবে, কোনো দুর্বল নাজুক মানুষকে শাস্তি দেওয়ার কৌশল হিসেবে ধর্ষণের মতো মোক্ষম অস্ত্র কম আছে। সেটি সবাই জানে এবং প্রয়োজনে ক্ষমতা থাকলে তা প্রয়োগ করেও থাকে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মি এটা করেছিল আর ২০১৮ সালে এসে আমরা বাংলাদেশিরা সেটা চালু রেখেছি। বিষয়টা হলো যে এত বড় একটি ঐতিহ্যকে আমরা যে সামাজিকভাবে লালন-পালন করি সেটি আমরা স্বীকার করতে রাজি নই। কিন্তু  প্রয়োগ করতে আমরা সবাই রাজি আছি! এই পাকিস্তানিদের এবং বাংলাদেশিদের মধ্যকার মিলটা সবারই একটু বোঝা উচিত। ধর্ষকের কোনো জাতীয় পরিচয় হয় না। যে যে কারণে এবং যে পরিস্থিতিতে এটা ঘটে, সেটা যখন থাকে, তখন ধর্ষণ অবধারিত।

তিন.

২০০০ সালে আমি একটি প্রামাণ্যচিত্র করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধকালে নারীদের অবস্থা নিয়ে। ওই কাজটি করার সময় আমরা এক ধর্ষিত নারীর সাক্ষাৎকার নিই। তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন যে, পাকিস্তান আর্মিরা কারও কাছ থেকে খবর পেয়ে তার বাড়িতে অভিযান চালায়। খবরটা ছিল যে, তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাওয়ান। যারা গ্রামবাংলার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত, তারা জানেন যে গ্রামের সাধারণ মানুষ সকল বিপদ মাথায় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়, যার ফলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চালানো সম্ভব হয়েছিল এবং বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে হত্যা না করে ধর্ষণ করে। এটি ছিল তার শাস্তির প্রক্রিয়া। ঠিক একইভাবে সুবর্ণচরের এই শেষ ঘটনাটিও ঘটেছে। অতএব দুর্বলকে সবচেয়ে নাজুক জায়গায় আঘাত করাটাই হচ্ছে শাস্তিদানের উদ্দেশ্য। আমরা কী করে বলি আমরা পাকিস্তানিদের চেয়ে উন্নত কিসিমের মানুষ।

চার.

১৯৯০ সাল থেকে আমি শিশুদের যৌন নির্যাতনের ওপর কাজ করছি। আমাদের অনুসন্ধান মতে এমন কোনো জনপদ পাওয়া যাবে না যেখানে শিশুদের ওপর এই নির্যাতন করা হয় না। বাংলাদেশের কত পরিবারের ওপরে এই নির্যাতন হয়েছে তার হিসাব নেই। তবে, কয়েকটি স্থানে গোপনীয়তা রক্ষা করে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, দশটির মধ্যে অন্তত সাতটি পরিবারে এই ঘটনা ঘটে। আমি নিজে যৌন নির্যাতনের শিকার হই তিন চার বছর বয়সে। অতএব, সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা ও শ্রেণি কোনো ব্যাপার নয়, এই বিপদ সব শিশুর ওপর হয়। কিন্তু শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন হলে তার কোনো প্রতিকারের চেষ্টা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মায়েরা সেটা গোপন করে। শহরে বা গ্রামে কোনো মেয়ে শিশু যদি নির্যাতিত হয় তাহলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাবা-মা ঘটনাটি লুকিয়ে রাখে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মেয়ের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে অটুট রাখা। কারণ যে মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে সেই মেয়ে ‘অপরাধী’ তা সে যে বয়সীই হোক না কেন।

শিশু যৌন নির্যাতন সম্পর্কে কয়েকটি ভুল ধারণা রয়েছে। সব নির্যাতনকারী এক ধরনের নয়। সাধারণত দশ বছরের নিচের বয়সী শিশুদের প্রতি যারা যৌন আকৃষ্ট হয়, তাদের মধ্যে একধরনের মানসিক বিকৃতি রয়েছে বলে বলা হয়, যার নাম পিডোফিলিয়া। এরা শিশুদের সঙ্গে যৌনকর্ম করতে অধিক আগ্রহী। কিন্তু এদের বাদ দিয়ে ধর্ষকদের বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষরা আমার আপনার মতো ‘স্বাভাবিক মানুষ’। অর্থাৎ যারা চলেফিরে খায় দায় এবং সুযোগ পেলে ধর্ষণ করে, সেটা যত ভদ্র ভাষাতেই আমরা বলি না কেন। এদের সংখ্যা দশজনে নয়জন। অন্য যে ভুল ধারণা রয়েছে সেটি হলো, যে ধর্ষিত হয় সে কেবলই নারী বা  মেয়েশিশু। কিন্তু আমাদের গবেষণা এবং পৃথিবীর অন্যান্য সকল স্থানের গবেষণায় দেখা গেছে যে, মেয়ে ও ছেলেশিশু উভয়ই যৌন নির্যাতিত হয়।

কিন্তু, আমরা ছেলেশিশুর যৌন নির্যাতন নিয়ে প্রায় কিছুই শুনি না, জানি না, বলি না। জরিপের ভিত্তিতে আমাদের একটি ধারণা হয়েছে যে, দশটি যৌন নির্যাতনের তিনটিরই শিকার ছেলেশিশু। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ধর্ষকরা পুরুষ। কিন্তু আমরা ওই জরিপের মধ্যেও পেয়েছিলাম, বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারীরাও যৌন নির্যাতন করে। এই নারী যৌন নিপীড়নকারীর সংখ্যা গত দুই দশকে এত বেড়েছে যে, পশ্চিমা দেশের স্কুলগুলোতে এ জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিক্ষিকার বিচার হয়ে জেল হচ্ছে। অবশ্যই পুরুষ শিক্ষকরা অনেক বেশি হারে যৌন নির্যাতনকারী। কিন্তু আগে যেখানে নারী শিক্ষিকাকে যৌন নিপীড়নকারী হিসেবে ভাবা হতো না এখন সবাই সেটা মানতে বাধ্য হচ্ছে। এই তো গেল স্কুলের মতো নিয়ন্ত্রিত নিরাপদ স্থানের কথা। একবার ভাবা যাক, গোটা সমাজে তাহলে কী অবস্থা।

পাঁচ.

আমাদের কাছে কোনো হিসাব নেই কত ধর্ষণের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে। তাও যেগুলোর কথা আমরা জানতে পারি সেগুলো হচ্ছে গণমাধ্যমে যার কথা আসে সেই সবের। এই সংবাদগুলো ভয়াবহ বলপূর্বক শারীরিক নির্যাতন করে ধর্ষণের ঘটনা, যার সঙ্গে পুলিশ জড়িত হয়ে পড়ে মামলার মাধ্যমে। অর্থাৎ সেই ঘটনাটি এতই ভয়াবহ যে, সবাই তা জেনে যায় এবং পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য হয়। একটু বিচার বিবেচনা প্রয়োগ করলেই বোঝা যাবে, দশটির মধ্যে একটিতেও এ রকম ঘটনা ঘটে না। অথচ জানামতে, প্রতি বছর হাজারের অধিক তো বটেই, তারও অনেক বেশি মামলা হয় ধর্ষণকে কেন্দ্র করে। তাহলে প্রকৃত ধর্ষণের ঘটনা কতগুলো? আমরা জানি তো না-ই, জানতেও চেষ্টা করি না। এবং এইখানে ধর্ষণ বলতে আমি এর ভয়াবহ শারীরিক বলপ্রয়োগের দিকটার কথাই ইঙ্গিত করছি, যৌন নিপীড়ন নয়, যদিও আইনের ক্ষেত্রে সেটিও অবশ্যই ধর্ষণ। অতএব, আমরা দশভাগের একভাগ ভুক্তভোগীর কথাই বলতে পারি। এবারে একটু হিসাব করে দেখুন, কোন ধরনের সমাজে আমরা বসবাস করছি।

ছয়.

নোয়াখালীর ঘটনায় যে মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন তিনি সবার নজরে এসেছেন কারণ এটিতে রাজনীতি জড়িয়ে আছে। এই নারী রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলের সমর্থক এবং তার ওপরে প্রতিশোধটা নিয়েছে সরকারি দলের সমর্থক। অবশ্য তাকে আওয়ামী লীগ বহিষ্কার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্ষণের রাজনীতি কতটা ব্যাপক ও গভীর সেটা বোঝা যায় যখন শুনি, সরকারি দলের সমর্থক বলছেন, এই ধর্ষক আওয়ামী লীগের নয় বিএনপির সমর্থক। এই খবর পত্রিকাতেও এসেছে। অর্থাৎ বিষয়টা ওই নারীর আহত হওয়া বা আঘাত পাওয়া নয়, এটি হলো কে কোন দলের লোক, সেটাই বিষয়। বোঝাই যাচ্ছে যে ধর্ষণের রাজনীতি বলে একটা সমীকরণ রয়েছে এবং সেটির সুযোগ যে কেউ নিতে পারে। যদি ধর্ষিতই হতে হয় তাহলে দলীয় পরিচয় নিয়ে ধর্ষিত হলে ভালো। কারণ এই দেশে ধর্ষিতা বা ধর্ষকের পরিচয় বড় নয়, তার রাজনৈতিক পরিচয়ই প্রধান বিষয়। যেসব মানুষ মনে করেন আগামীতে তার ধর্ষিত হওয়ার আশঙ্কা আছে বা কারও ধর্ষণের আকাক্সক্ষা রয়েছে তারা যে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ চাইতেই পারেন।

কত জমি দেওয়া হয়েছে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ধর্ষিত এই মানুষটিকে আমরা জানি না। তবে একবার হিসাব করুন কতজন মানুষ প্রতি বছর ধর্ষণের শিকার হয়। এর সঙ্গে গুণ করুন কতটুকু জমি এই ধর্ষিত নারীকে দেওয়া হচ্ছে, এরপর সেই সংখ্যাটিকে স্বাধীনতার পর পার হওয়া সাতচল্লিশটি বছর দিয়ে গুণ করুন। তারপর যে সংখ্যাটি পাবেন সেটি হবে ধর্ষিতদের মালিকানাধীন জমির পরিমাপ। আপনার বাংলাদেশ কদিন পরে ধর্ষিতদের মালিকানায় চলে যেতে পারে।   

লেখক
সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর : অনিন্দ্য আরিফ