দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) বিভিন্ন দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ নানান কর্মসূচি পালন করছে প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম ও ৫৭ জন সহকারী অধ্যাপক।
গত বছরের ৫ নভেম্বর ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন, বিভিন্ন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রতিনিয়ত হয়রানির প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর ৬ দফা দাবি বাস্তবায়নের একটি স্মারকলিপি দেয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, যৌন নির্যাতনকারী ড. মো. রমজান আলীকে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী স্থায়ী বহিষ্কারসহ আরেক শিক্ষক দীপক কুমারের স্থায়ী শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে কলঙ্কমুক্ত করার দাবি জানায় শিক্ষক ফোরাম।
উল্লেখ্য, এই দুজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এর আগে ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। এছাড়াও সিলেকশন কমিটির সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ড. ফেরদৌস মেহবুবের রহিতকৃত প্রমোশন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য বলা হয়। এর বাইরেও আরও ৪টি শর্ত যুক্ত করে মোট ৬টি দাবিতে স্মারকলিপি দেয় হাবিপ্রবি’র প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম।
শিক্ষক ফোরামের দাবিসমূহের স্মারকলিপির সমাধান হতে না হতেই শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন আরেকটি ঘটনার।
গত ১৪ নভেম্বর পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৫৭ জন শিক্ষক (প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক) বেতন বৈষম্যের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ৫৭ জন শিক্ষকের কয়েকজনকে লাঞ্ছিত করে বলে ওই শিক্ষকরা অভিযোগ করেন। এই ঘটনায় ১৫ নভেম্বর থেকে ৫৭ জন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সিঁড়িতে প্রতীকী অনশন পালন করে আসছেন। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় ৫৭জন শিক্ষক সদর থানায় প্রক্টর এবং ছাত্র পরামর্শকসহ আরও কয়েকজনের নামে একটি মামলা এজাহার করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৯ নভেম্বর পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সফিউল আলমের কার্যালয়ে কথা বলতে যান ওই ৫৭ জন শিক্ষক। কথা বলার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সফিউল আলম দুপুরের খাবারের জন্য চলে যেতে চাইলে তাকে টেনে-হিঁচড়ে তার কার্যালয় থেকে বের করেন শিক্ষকরা। এই ঘটনায় কয়েক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে।
রেজিস্ট্রার লাঞ্ছনার ঘটনায় ৫৭ জন শিক্ষকের মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সহকারী অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক ও মোহসীন আলীকে ২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাময়িক বহিষ্কার করে। দুইজন শিক্ষককে বহিষ্কারের প্রতিবাদে উপাচার্য আবুল কাসেমকে অবরুদ্ধ করে শাখা ছাত্রলীগের একাংশ।
অবরুদ্ধ অবস্থায় তারা দাবি জানান, তদন্ত ছাড়া ২ শিক্ষকের সাময়িক বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হোক। প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সহযোগিতায় উপাচার্য তার কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে ৩ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
ইতোমধ্যে হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় চালুর পর স্থগিতকৃত ভর্তি পরীক্ষা আগামী ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে।
দীর্ঘ এক মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার পর ৬ জানুয়ারি চালু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ার পরেই পূর্ব আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম ও ৫৭ জন শিক্ষক।
প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম ২ শিক্ষকের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, ‘২ জন সহকারী অধ্যাপকের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না করলে আমরা ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবো না।’
এরপর ৯ জানুয়ারিতে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের শিক্ষার্থীরা।
১০ জানুয়ারি সকাল ১১টায় প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের সঙ্গে আলোচনায় বসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে বিকেল ৪টায় ৫৭জন শিক্ষককে ওই আলোচনায় ডাকা হয়। এদিকে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর দাবিতে মিটিংস্থলের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা।
প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম ও ৫৭ জন শিক্ষক পূর্বের দাবির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, রেজিস্ট্রার এবং ছাত্র পরামর্শকের পদত্যাগ দাবি করেন।
এই ঘটনায় ৩ পক্ষই তাদের (প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম, ৫৭জন সহকারী অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনপন্থী) নিজ নিজ অবস্থানের দাবিতে অটল থাকে।
১০ জানুয়ারি রাত ৯টায় আলোচনা শেষ হলেও কোনো সমাধান করতে পারেনি কোনো পক্ষই।
বর্তমানেও এই ঘটনার জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাতার কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. মো. সফিউল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজকে (রোববার) আমরা আলোচনায় বসবো এবং সেখানে কী সিদ্ধান্ত হবে সেটা আলোচনা শেষে জানা যাবে।
তিনি আরও বলেন, ১৪ ও ২৯ তারিখের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য তদন্ত কমিটি খুব শিগগির তাদের প্রতিবেদন দাখিল করবে এবং আমরা সেটা রিজেন্ট বোর্ডে নেবো এবং সমাধানের জন্য রিজেন্ট বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
দানেশ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র পরামর্শক বিষয়ক বিভাগের পরিচালক প্রফেসর ড. মো. তারিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার ব্যক্তিগতভাবে দাবি এই বিষয়ে সরকার একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে পুরো বিষয় নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে বিষয়টি সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।