শ্রমিকদের সাতদিনের টানা আন্দোলন ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ২০১৮ সালের কাঠামো সংশোধন করে মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে সরকার। পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কাঠামোর সাতটি গ্রেডের মধ্যে সপ্তম গ্রেড বাদে বাকি ছয়টি গ্রেডেই মূল বেতনসহ মোট মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মূল বেতনের সঙ্গে প্রতি বছর ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট থাকবে আগের মতোই।
খুব শিগগিরই সংশোধিত মজুরি কাঠামোর গেজেট জারি করা হবে জানিয়ে শ্রম মন্ত্রণালয় গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, মূল বেতন বাড়িয়ে মজুরি বাড়ানোর কারণে এসব গ্রেডের চিকিৎসা, যাতায়াত এবং বাড়িভাড়া ভাতাও বেড়েছে। ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামো গত ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। ডিসেম্বরের অতিরিক্ত মজুরি জানুয়ারির বেতনের সঙ্গে ফেব্রুয়ারি মাসে পাবেন শ্রমিকরা। গতকাল শ্রম মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ছয়টি গ্রেডের মজুরি বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তাতে মূল মজুরি কমে যাওয়া তৃতীয় গ্রেড ও মূল মজুরি কম বাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডসহ আরও তিনটি গ্রেডের মজুরি বাড়ানোর ঘোষণা দেন। সপ্তম গ্রেডের শ্রমিকদের মূল মজুরি ও মোট মজুরি ২০১৮ সালে অপেক্ষাকৃত বেশি বাড়ায় তাতে কোনো হেরফের আনা হয়নি। শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে গত সাতদিন ধরে চলা শ্রমিক আন্দোলন শেষ হবে এবং শ্রমিকরা আজ সোমবার থেকে কাজে ফিরবে বলে বলে আশা করেছেন সরকারের মন্ত্রী, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা।
২০১৮ সালের মজুরি কাঠামো সংশোধনের পর ৬ষ্ঠ গ্রেডে মোট মজুরি ১৫ টাকা, ৫ম গ্রেডে ২০ টাকা, ৪র্থ গ্রেডে ১০২ টাকা, ৩য় গ্রেডে ২৫৫ টাকা, ২য় গ্রেডে ৭৮৬ টাকা এবং ১ম গ্রেডে ৭৪৭ টাকা মজুরি বাড়ছে। ২০১৩ সালের মজুরি কাঠামোর সঙ্গে গতকাল ঘোষণা করা সংশোধিত মজুরি কাঠামো তুলনা করে দেখা যায়, ৭ম গ্রেডে মজুরি বেড়েছে প্রায় ৫১ শতাংশ, ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৫১ শতাংশ, ৫ম গ্রেডে ৪৭ শতাংশ, ৪র্থ গ্রেডে ৪৬ শতাংশ, ৩য় গ্রেডে ৪৫ শতাংশ, ২য় গ্রেডে ৪১ শতাংশ ও ১ম গ্রেডে ৪০ শতাংশ মজুরি বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন মজুরি কাঠামোতে যৌক্তিকহারে মজুরি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত আসে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর শনিবার পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় বৈঠক করে মালিকরা শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মেনে নেন। সেদিনই দেশ রূপান্তরকে তারা বলেছিলেন, রবিবার বৈঠক করে মজুরি বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
টিপু মুনশি বলেন, সপ্তম গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি গেজেট জারি হওয়া নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী আট হাজার টাকাই রাখা হয়েছে। ২০১৩ সালের কাঠামোতে সর্বনি¤œ এ স্তরের মজুরি ছিল ৫৩০০ টাকা। ২০১৮ সালে গেজেট অনুযায়ী ষষ্ঠ গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪০৫ টাকা। এখন তা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪২০ টাকা। ২০১৩ সালের এ গ্রেডের মজুরি ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬৭৮। ২০১৮ সালে ঘোষিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী পঞ্চম গ্রেডে সর্বমোট মজুরি ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৮৫৫ টাকা। এখন সেটি বাড়িয়ে ৮ হাজার ৮৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৩ সালে এ গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি ছিল ৬ হাজার ৪২ টাকা। ২০১৮ সালে ঘোষিত মজুরি কাঠামোতে চতুর্থ গ্রেডে মোট মজুরি ধরা হয় ৯ হাজার ২৪৫ টাকা। এখন তা বাড়িয়ে ৯ হাজার ৩৪৭ টাকা করা হয়েছে। ২০১৩ সালের কাঠামোতে এটি ছিল ৬ হাজার ৪২০ টাকা। টিপু মুনশি জানান, ২০১৮ সালের গেজেটে তৃতীয় গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি ধরা হয় ৯ হাজার ৫৯০ টাকা। এ গ্রেডটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে মজুরি কাঠামো। চূড়ান্ত বিচারে গতকাল এ গ্রেডের মজুরি বাড়িয়ে ৯ হাজার ৮৪৫ টাকা করা হয়েছে। ২০১৩ সালের কাঠামোতে তৃতীয় গ্রেডের শ্রমিকের মজুরি ছিল ৬ হাজার ৮০৫ টাকা। দ্বিতীয় গ্রেডের মজুরি চূড়ান্ত করা হয়েছে ১৫ হাজার ৪১৬ টাকা। ২০১৮ সালে প্রকাশিত গেজেটে তাদের মজুরি ধরা হয় ১৪ হাজার ৬৩০ টাকা। ২০১৩ সালে এ গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি ছিল ১০ হাজার ৯০০ টাকা। পোশাক শ্রমিকদের শীর্ষ গ্রেড-১ এ নতুন মজুরি ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ২৫৭ টাকা। ২০১৮ এর গেজেটে এটি ছিল ১৭ হাজার ৫১০ টাকা। ২০১৩ সালে প্রথম গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি ছিল ১৩ হাজার টাকা।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ‘সকল পক্ষের সহযোগিতায় কমিটি একটি সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। দেশ, গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে শ্রমিকরা আজই কাজে যোগ দেবেন বলে আশা করছে সরকার। উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এর সদস্য এবং বাইরের বন্ধ করে দেওয়া সকল কারখানা খুলে দেওয়া হবে বলে মালিকপক্ষ ঘোষণা দিয়েছেন।’ এতে বলা হয়, ২০১৮ সালের মজুরি কাঠামো সমন্বয় করায় ২০১৩ সালের তুলনায় এখন ১ম গ্রেডে ৫ হাজার ২৫৭ টাকা, ২য় গ্রেডে ৪ হাজার ৫১৬ টাকা, ৩য় গ্রেডে ৩ হাজার ৪০ টাকা, ৪র্থ গ্রেডে ২ হাজার ৯২৭ টাকা, ৫ম গ্রেডে ২ হাজার ৮৩৩ টাকা, ৬ষ্ঠ গ্রেডে ২ হাজার ৭৪২ টাকা এবং ৭ম গ্রেডে বেড়েছে ২ হাজার ৭০০ টাকা।
নতুন বেতন গ্রেড ঘোষণার সময় ন্যাশনাল গার্মেন্টস ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এখন সকল গার্মেন্টস শ্রমিকদের রাজপথ ছেড়ে কাজে যোগ দিতে হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এ সময় বলেন, বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কোনো কারখানা ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা যাবে না। আগামীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এই সেক্টরকে কোনো অবস্থাতেই ধ্বংস হতে দেব না। আন্দোলনে নিহত এক গার্মেন্ট শ্রমিকের পরিবারকে নিজের তহবিল থেকে এক লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ পরিহার করে শ্রমিকদের সোমবার সকালেই কাজে যোগদানের আহ্বান জানান। এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দীন বলেন, শ্রমিকরা আন্দোলন করতে পারেন, কিন্তু ধ্বংসাত্মক হওয়া উচিত নয়। এ সময় বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলাম, শ্রম সচিব আফরোজা খান, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী, বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার আগে দুপুরে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর জানান, আজ সোমবার কাজে না ফিরলে পোশাক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে। শ্রমিকরা যতদিন কাজে না ফিরবেন, ততদিনের মজুরিও পাবেন না তারা। শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা কর্মস্থলে ফিরে যান, উৎপাদন কাজে অংশগ্রহণ করুন। আর যদি আগামীকাল (সোমবার) থেকে আপনারা কারখানায় কাজ না করেন, তা হলে আপনাদের কোনো মজুরি প্রদান করা হবে না এবং ঐ কারখানা শ্রম আইনের ১৩/১ ধারা মোতাবেক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।’