পুরনো চোখে নতুন পাখি

১১ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর  বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে গেল ১৮তম পাখিমেলা। এবারের আসরে তিনজনকে নতুন ও দুর্লভ পাখি খুঁজে আনার জন্য বিগ বার্ড অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। আর পাখি নিয়ে গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ এক শিক্ষক পেয়েছেন বৈজ্ঞানিক গবেষণা পুরস্কার।  কীভাবে পাওয়া গেল দুর্লভ পাখি? কী আছে গবেষণায়? বলছেন আদীব মুমিন আরিফ

দেড় শ বছর পর দেখা দিল

‘গ্রে ফ্রানকোলিন (ধূসর তিতির)’ সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ১৮৫৮ সালে, তখনকার পূর্ব বাংলার ঢাকার এক ঘাসের বনে। সেই বন হারিয়ে গেছে, আজ থেকে চার বছর আগে আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) এই পাখিটিকে এ দেশ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে জানিয়ে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। কিন্তু আচানক সে দেখা দিলো রাজশাহীর পদ্মার চরে। দেখলেন সফিকুর রহমান শুভ্র। ২০১৮ সালের এপ্রিল-মে মাসের ঘটনা। এপ্রিলে বন্ধু ইশরাত জেবিনের পিএইচডি গবেষণার জন্য পাখি গণনা (বার্ড রিংগিং)’র কাজে গিয়েছিলেন। সফিকের মনে ছিল, ২০১৫ সালে ইনাম আল হক ও তারেক অণু এ চরে পাখি গণনার সময় গ্রে ফ্রানকোলিনের (ধূসর তিতির) ডাক শুনেছিলেন। তার মনে হলো, পাখিটি হয়তো এখনো আছে। তিনি বন্ধুকে সহযোগিতার পাশাপাশি দেশি কোয়েল ও ধূসর তিতির খুব মন দিয়ে খুঁজতে লাগলেন। কয়েকটি কোয়েল পাখির দেখা পেলেও তিতিরের কোনো চিহ্নই চোখে পড়ল না। পরের মাসেও পাখি গণনার কাজ চলেছে। সেদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা বেরিয়ে পড়লেন। শহর থেকে অটোতে পদ্মার পাড়ে। সেখান থেকে নদী পেরুনোর জন্য নৌকায়। মাঝিসহ মোট সাতজনের দল তাদের। শান্ত নদী তাদের চরে পৌঁছে দিল। কাজ করতে লাগলেন তারা। সঙ্গে পল থমসন, ফিলিপ ডি রাউন্ডের মতো বিখ্যাত পাখিবিদরাও আছেন। তাদেরই ছাত্রী ইশরাত। কাজ শুরু করলেন সবাই। ঘেসো জমিতে যাওয়ার সময় সফিক দেখলেন পল ও ফিলিপ পাখির ছবি তুলছেন। তিনি বললেন, ‘আমি কোয়েলের খোঁজে চলছি।’ নীরবে বনে হাঁটছেন, হঠাৎ দেখলেন, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একটি পাখি সামনে ও আরেকটি ৯৮ ফিট দূরে গিয়ে ডানে বসেছে। তবে কোথায় তারা? ঘাসের জন্য তো চোখে পড়ছে না। কিন্তু পাখিটি তো কোয়েলের চেয়ে বড়, উড়ছেও ভিন্নভাবে। ফলে খুব কৌতূহলী হয়ে গেলেন। সামনের ডানের পাখিটি দেখার জন্য এগোলেন। মনে আছে, সকাল তখন ১০টা ২০ মিনিট। পা টিপে হেঁটে পাখির কাছাকাছি পৌঁছালেন। তাকে দেখেই পাখিটি দৌড়ে লুকালো। কিন্তু লালচে লেজ ও পায়ের আকার দেখে সফিক তখন নিঃসন্দেহ এটি ধূসর তিতির । কিন্তু ছবি তুলতে না পারলে তো কারও কাছেই পাখিটি যে আছে সেটি প্রমাণ করা যাবে না। তারপরও তাকে বিরক্ত না করে তিনি দলে ফিরে এলেন। পল ও ফিলিপকে জানালেন। তারা সেই স্থানে যাওয়ার প্রবল বাসনা জানালেন। পাখিটি ঠিক ২০ মিনিট পর সবার সামনে দিয়ে উড়ে গেল। আরেকটি তখনো বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যরা দেখেছেন বলে এই পাখি যে বাংলাদেশে আছে সেটি বিশ্বাসযোগ্য হলো। এই পাখিটির খোঁজ দিয়ে ঢাকার ছেলে ও ব্যবসায়ী শুভ্র আগামী এক বছরের জন্য ‘বিগবার্ড অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন।

রাজশাহীতে নতুন জাতের প্যাঁচা

ঘটনাটি ঘটল হঠাৎ, রাজশাহীর রাজপাড়া থানার জেলখানার পেছনে শিমলা এলাকায়। এলাকা ঘুরে রাত ৮টা ৪০ মিনিটে একটি বটগাছের গোড়ায় গল্প করছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ কায়েস, বরেন্দ্র বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী উম্মে খাদিজা ইভা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক মাহমুদুল হক অলি। হঠাৎ কায়েসের একটি প্যাঁচার ডাক কানে এলো। পাখি নিয়ে আগ্রহী, মফস্বলের ছেলেটি ডাক শুনেই বুঝলেন, একটি খুড়–লে প্যাঁচা কাউকে বিরক্ত হয়ে তাড়া করছে। ডাকটি আরও কাছে এলো। ওপর দিকে তাকিয়ে ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় দেখলেন, মাথার ওপরের বটগাছেই পাখিটিকে তাড়া করে আনল প্যাঁচা। কী মনে করে প্যাঁচার গা বরাবর আলো ফেলেই হতবাক হয়ে গেলেন কায়েস। এটিও নিম প্যাঁচা, তবে দেখতে একেবারেই আলাদা।

সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো এটি দেশি নিম প্যাঁচা হতে পারে। নতুন পাখির কথা জানাতেই সঙ্গীরাও তার মতো পাখিটির ছবি তুলে নিলেন। ঘণ্টাখানেক ছবি তোলা শেষে কায়েসের পাখিবান্ধব মন বলল, এটি একেবারেই নতুন প্রজাতি হলেও হতে পারে। বাসায় ফিরে অরনিথলজির (পক্ষীবিজ্ঞান) মাঠ নির্দেশিকার ওয়েব সাইটগুলো ঘুরে তার পাখিটি নিয়ে বেশ জানা হলো। ভারত ও বাংলাদেশের কয়েকজন পক্ষীবিজ্ঞানীর কাছেও ছবিগুলো পাঠালেন। ভারতীয় পক্ষীবিজ্ঞানীরা একে দেশি নিম প্যাঁচা বলেই জানালেন। তবে কণ্ঠী নিম প্যাঁচা ও ছোট নিম প্যাঁচার জাতের সঙ্গে খুব মিল দেখে আমাদের বিজ্ঞানীরা নিঃসন্দেহ হতে পারলেন না। ফলে পাখি সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়ার পরের ধাপ ডাক রেকর্ড করতে নামতে হলো তাকে। তিন অক্টোবর থেকে সে কাজে নামলেন তিনি।

একে তো প্যাঁচাটি ডাকে খুব কম, তার ওপর কেবল রাতের আঁধারে শিকারে বেরুনোর সময় আর শেষ রাতে রীতি অনুযায়ী পাখিটির ডাক শোনা যায়। ডাকের মধ্যে সময়ের ব্যবধানেরও কোনো নিয়ম মানে না। এগুলো পাখিটিকে খুব পর্যবেক্ষণ করে জানলেন তিনি। শেষ রাতে বাসা থেকে বেরুতে পারেন না, সন্ধ্যার ডাকটিও জনবহুল শিমলা এলাকায় ভালোভাবে রেকর্ড করা যায় না। তারপরও লেগে থেকে পাখিটির শিকারে বেরোনোর সময়, প্রিয় গাছ ও শিকারের স্থান আঁচ করে ফেললেন তিনি। সে সব জায়গায় বসে থাকলেন রেকর্ডার নিয়ে। তবে অন্ধকারে এমন স্থানে চন্দ্রবোড়ার চলাফেরা থাকতে পারে বলে খুব ভয় পাচ্ছিলেন। একদিন তো ছয়-সাতটি শেয়ালও তাড়া করল। তাদের টর্চের আলো জ্বালিয়ে চিৎকার করে তাড়াতে হয়েছে। টানা ১৩ রাত ডাক রেকর্ড করার জন্য অপেক্ষা করতে হলো। শেষ পর্যন্ত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে শিমলায় পা দিয়েই ডাক শুনলেন। চায়ের দোকানে ক্যামেরার ব্যাগ রেখে সেই গাছের নিচে চুপিসারে দাঁড়ালেন। ততক্ষণে মোবাইলের স্ক্রিন অফ। আলো থাকলে তো আর পাখিটি ডাকবে না।

মিনিট দুয়েক পরে আপন খেয়ালে ডাকল সে। তিন মিনিটে চারটি ডাক রেকর্ড হলো। ডাকসহ পোস্ট ফেইসবুকে দেওয়ার পর সেটি নতুন প্রজাতির পাখি হিসেবে স্বীকৃতি এলো। অন্তত তিনটি দেশি নিম প্যাঁচা শিমলায় আবাস গেড়েছে। তাদের দর্শনে এ পর্যন্ত ৪০ জন পাখিপ্রেমী সেখানে পৌঁছেছেন। অন্যরাও যাবেন। ফলে রাতের মিশনে কোনো ছুটি নেই কায়েসের।  দেশি নিম পেঁচা আবিষ্কার করে তিনি পেয়েছেন এক বছরের ‘বিগবার্ড অ্যাওয়ার্ড।’

নতুন প্রজাতির পাখি

সুনামগঞ্জের বিশাল বন টাঙ্গুয়ার হাওরে পাওয়া গেল ‘স্পটেড ক্রেক (ছোট্ট দাগঅলা পাখি)’ নামের নতুন প্রজাতির পাখি। পাখিটি পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র তৌকির হাসান হৃদয়।

গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি পাখিটি আবিষ্কার করে তিনি এবার ‘বিগবার্ড অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। তার দুদিন আগে নিয়মিত মাঠ জরিপ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা গিয়েছিলেন সেখানে। তাতে দলনেতা ড. মোস্তফা ফিরোজ, বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান, ছাত্র-ছাত্রী-অনিকা সাহা, তৌহিদুর রহমান ও তিনি। পাখি পর্যবেক্ষণে গিয়ে তিনি এই পাখি দেখেন। এটি পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের গরমের দেশে বাস করে। শীতকালে জীবন বাঁচাতে চলে আসে আফ্রিকা ও পাকিস্তানে। তারা যে শীতকালেও আমাদের দেশে আসে, সেটি জানা গেল। তার শিক্ষক ড. মোস্তফা ফিরোজ বললেন, ‘এই পাখি দেখার কোনো প্রমাণ আগে পাওয়া যায়নি। ছবিও নেই আমাদের দেশে। ফলে তৌকিরই প্রথম পাখিটি দেখেছে।’