বিনিয়োগ বোর্ডের বহুতল ভবন

তিন বছরের কাজ শেষ হতে ৮ বছর

বিনিয়োগে গতি ফেরাতে তৎপর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা)’র ভবন নির্মাণেই বাড়তি লাগছে ৫ বছর। ১৪ তলাবিশিষ্ট ‘বিনিয়োগ বোর্ড’ ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল তিন বছরের মধ্যে। নকশা পরিবর্তন করে ভবনের আকার দু’তলা ছোট করা হলেও সাত বছরে অগ্রগতি মাত্র ৬০ শতাংশ। নির্মাণকাজের মেয়াদ এরই মধ্যে বাড়ানো হয়েছে তিনবার। দুবার বাড়ানো হয়েছে ব্যয়।

সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলেছে, প্রকল্প অনুমোদনের পর নানা অজুহাতে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া বাস্তবায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অদক্ষতাই প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির জন্য দায়ী।

বিডা সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে ২০১১ সালে বিডার জন্য একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এক একর জমিতে ১৪ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণে এক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক)। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০১৪ সালের ৩০ জুন। ওই সময় ব্যয় ধরা হয় ৯৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এরপর প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করা হয়। সিভিল এভিয়েশন অথরিটির বিধিনিষেধ থাকায় দুই তলা কমিয়ে ১২তলা ভবন নির্মাণের নকশা চূড়ান্ত হয়। কিন্তু এতে ব্যয় কমেনি বরং বেড়েছে। সর্বশেষ গত নভেম্বরে প্রকল্পে দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়। প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ১৯৮ কোটি টাকা। মেয়াদ বাড়ানো হয় চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ আগে দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।

বিডার তথ্য অনুসারে, ভবনটির ১১তলা পর্যন্ত নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সার্বিক কাজে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। ২০১৮ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পে আর্থিক অগ্রগতি ৬৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৫৪ শতাংশ। আর বাস্তব অগ্রগতি ৬০ শতাংশের কিছুটা কম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট বিল্ডার্স লিমিটেড (পিবিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, নকশা সংশোধন ও নতুন সংযোজনের কারণে প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হয়নি। তবে দ্বিতীয় সংশোধনীর মেয়াদকালে কাজ পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু আইএমইডি বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাটি বলছে, অদক্ষতা ও অনিয়মের কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নে এত সময় লাগছে। প্রকল্পের প্রথম সংশোধনের সময় যেসব কারণ দেখানো হয়েছিল, দ্বিতীয় সংশোধনীর সময় একই যুক্তি তুলে ধরা হয়। 

আইএমইডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পে কিছু অংশ সংযোজন করা হলেও দুটি তলা বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে কিছু বরাদ্দ কমানো উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। উল্টো সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ব্যয় বাড়ানো হয় প্রথম সংশোধনীর তুলনায় ৭৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেশি। প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ছিল ১২৩ কোটি টাকা, দ্বিতীয় সংশোধনীতে সেটা গিয়ে ঠেকেছে ১৯৮ কোটি দুই লাখ টাকায়। নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। ভবনটির কাজ শেষ হলে নিজস্ব জায়গায় সেমিনার, সভা, সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবে বিডা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নানা সমস্যা থাকলেও অসম্পূর্ণ ভবনেই নিজেদের কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি।

এক কর্মকর্তা জানান, কাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও এখানে চলে আসতে হয়েছে। কারণ ভাড়া করা ভবনে প্রচুর অর্থ খরচ হচ্ছিল। আর চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে গিয়েছিল। এ জন্য চুক্তি নতুন করে না বাড়িয়ে এই ভবনেই কাজ শুরু হয়েছে। কিছু সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু সেটা মেনে নেওয়া হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন নকশায় প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়ন হবে। বিডা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর একটি হলেও নিজস্ব ভবন না থাকায় এর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মূলত এ জন্যই বিডার জন্য নিজস্ব ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জটিলতার কারণে সংশোধন করতে হয়েছে। এরপর আর মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।  এ বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ভবনটি আপাতত ব্যবহার করছি। আরও আগেই এর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সে অনুসারেই আমরা বাইরে ভবন ভাড়া করেছিলাম। কিন্তু কাজ শেষ না হলেও বিল্ডিংয়ের অবকাঠামো মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে। এ জন্য আর ভবন ভাড়া করা হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ পর্যন্ত তিন দফা বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে। নতুন নকশায় কাজ হলে একটি আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ভবন হবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাজকর্ম সহজ ও দ্রুত হবে। এ ছাড়া বিনিয়োগে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা যাবে। আশা করি, এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’