রিভিউ

সেভেন সামুরাই : মানুষ কেন বাঁচে

বৃষ্টি, কাদা, ঘাম ও রক্ত মিশে একাকার শেষদিনের লড়াইয়ে। একটাই অর্থ- হয় মৃত্যু নয় বিজয়। যারা অন্যায়ের বিপক্ষে যারা লড়েন তাদের কাছে ‍দুটোর অর্থই কাছাকাছি নয় কি! এমন বিস্ময় জেগে ওঠে আকিরা কুরোসাওয়ার ‘সেভেন সামুরাই’ দেখে।

সময়কাল ১৫৮৬ সাল। যখন জাপানে ইতিহাসে চলছে সেনগোকু সময়। ডাকাতদের হামলা থেকে বাঁচতে কয়েকজন সামুরাইয়ের সাহায্য চায় গ্রামবাসী। এ হলো সিনেমার গল্প।

১৯৫৬ সালে মুক্তির পর সিনেমাটি ক্রিটিকদের প্রিয় তালিকায় উঠে আসে। আজও সেই ধারা অব্যাহত আছে। এ তথ্য দেয় ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের মাসিক ম্যাগাজিন সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ও রোটেন টমেটোর জরিপ। এ ছাড়া বিবিসির আয়োজিত বিদেশি ভাষার সেরা সিনেমায় আন্তর্জাতিক ক্রিটিকদের মতে এক নম্বরে রয়েছে ‘সেভেন সামুরাই’। যদিও নিজ দেশের সমালোচকেরা ওই সিনেমাকে তালিকায় রাখেনি।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এর প্রভাব ব্যাপক। রিমেকের পাশাপাশি অনেক সিনেমার অনুপ্রেরণা ‘সেভেন সামুরাই’ অথবা গল্প বা দৃশ্যায়নে ব্যবহার করা হয়েছে এর নানান ধরনের রেফারেন্স।

‘সেভেন সামুরাই’ এমন এক সময়কে তুলে ধরে যখন পুরোনো রীতিগুলো ভেঙে পড়ছে। আবির্ভাব ঘটছে নতুন যুগের। কিন্তু সম্মান ও কর্তব্যের সনাতনী ধারণা কারও কারও কাছে তখনো অটুট। যেখানে মৃত্যু ও বিজয় কাছাকাছি বসবাস করে। কিন্তু এই প্রশ্নও জাগতে বাধ্য- সম্মান ও কর্তব্যকে আসলেই সনাতনী ধারণা? এ দুটি বিষয় ছাড়া মানব ইতিহাস বা ব্যক্তির মানুষের সঙ্গে সমগ্রের ধারণা কীভাবে একাকার হয়ে উঠবে। এই সিনেমার শক্তিশালী সাসপেন্স দৃশ্য সেই কথাই বারবার উসকে দেয়।

সিনেমাটির প্রথম অর্ধেক ছিল কীভাবে সামুরাই দলটির প্রধান তার বাহিনিকে জড়ো করে ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে। সাদাসিধে বাস্তবতার পাশাপাশি জীবনের নানা বাঁকের চিহ্ন স্পষ্ট। দ্বিতীয় ভাগে সিনেমা পায় অন্য ধরনের গতি। সেখানে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন সামুরাই। এরপর যুদ্ধ। বৃষ্টি, কাদা, ঘাম ও রক্ত একাকার।

বলা হয়ে থাকে, যোদ্ধা ও যুদ্ধ নিয়ে দুনিয়ায় যত সিনেমা তৈরি হয়েছে তার তালিকার করলে সব সময় সামনের দিকে থাকবে ‘সেভেন সামুরাই’। আর মানুষ বলে তারা অনেক এগিয়ে গেছে, কিন্তু  যুদ্ধকে এড়াতে পারেনি কখনো। প্রগতি বা দুর্গতি- যুদ্ধ তার সঙ্গী হয়েছে।

হ্যাঁ, যুদ্ধ হয়তো আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু যুদ্ধ কী মানুষকে বিকশিত করে না? সে কেন বাঁচে, কার সঙ্গে বাঁচে, কীভাবে বাঁচে সেই প্রশ্ন তোলে না? মানুষের চরিত্র হয়তো বা এমন- হয় বাঁচার মতো করে বাঁচো নয় মরো। এর বাইরে আপনি কেন লড়বেন এবং কার পক্ষে লড়বেন- এ ভেদও পরিস্কার করা দরকার। আর বাস্তবিকই সামুরাইয়ের বৃত্তি নিছক প্রদর্শকলা নয়, বরং জীবনকে অর্থবহ করারও মন্ত্র। সেটাই বলে এ সিনেমা।

এ সিনেমায় দেখা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মিশ্র। যেখানে আছে উল্লাস ও ভয়াবহতার সংমিশ্রণ। মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতিকে একই পাটাতনে হাজির করে। আছে পাগলামি, শক্তিমত্তা ও উত্তেজনার মেলবন্ধন।

ভিজ্যুয়ালের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ‘সেভেন সামুরাই’। আর্থিক ঝুঁকি সামলানোর জন্য প্রযোজনা সংস্থা স্টুডিওতে দৃশ্যায়নের পরামর্শ দেয়। কিন্তু কুরোসাওয়ার মতে, সেট কেমন হবে তা অভিনয়শিল্পীদের প্রভাবিত করে। যদিও আজকের দিনে ভিএফএক্সের কেরামতি সিনেমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, অভিনেতা স্রেফ গ্রিন স্ক্রিনকে সামনে রেখে সংলাপ দেয়। তা সত্ত্বেও কুরোসাওয়ার কথার মানে বোঝা কঠিনও নয়। আপনি কীভাবে একটি পরিবেশ বা পরিস্থিতির অংশ হয়ে দাঁড়ান, তার যন্ত্রণাগুলো নিজের ভেতর বিকশিত করেন- তা ভাবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক সেভাবে দর্শকও একটি সিনেমার অংশ হয়ে উঠে।

পুরো চিত্রায়ণে দারুণ কুশলতা দেখিয়েছেন কুরোসাওয়া। বিশেষ করে একাধিক ক্যামেরায় ভয়োলেন্সের দৃশ্যায়ন প্রতিটিকে ফ্রেমকে দিয়েছে আলাদা আলাদা অর্থ।

পরবর্তীতে অনেক সমালোচক ‘সেভেন সামুরাই’র যুদ্ধের দৃশ্যকে গোয়ার চিত্রকর্মের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বাদ যায়নি আইজেনস্টাইন ও ডভজেঙ্কোর সিনেমার সঙ্গে তুলনা। পঞ্চাশ দশকের সীমিত প্রযুক্তির মধ্যেও ‘সেভেন সামুরাই’ অনবদ্য।

কিন্তু যুদ্ধই মূল শক্তি বিষয় নয়, একটা সময়, বিশেষ বিদ্যা ও মানুষকে ধরার প্রকাশ মাত্র। সিনেমার মূল চরিত্রগুলোই এর ভিত্তি। বিশেষ করে সামুরাই চরিত্রগুলো। যারা এখনও আমাদের চোখে সত্যিকারের নায়ক। তাদের চিন্তায় রয়েছে নানান  মেজাজ। কিন্তু সাধারণভাবে আমরা দেখতে পাই তেজি, দয়ালু চরিত্রের মানুষ হিসেবে। যারা খ্যাতি বা টাকার জন্য লড়ে না। এমনকি জয়ের জন্যও না। কারণ তারা বিশ্বাস করে লড়তে হবে ন্যায়ের জন্য। আর এ বিশ্বাসটুকু আমাদের বোঝাতে সক্ষম হয় ‘সেভেন সামুরাই’। হয়তো একালেও বাঁচার অর্থ দেয় মানুষকে।

মুক্তির চার বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে সিনেমাটির হলিউড রিমেক ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ চলে আসে পর্দায়। বুনো পশ্চিমের আবহে নির্মিত সিনেমাটি কখনো মূলটির ধারে-কাছেও যেতে পারেনি। অথচ হলিউড সিনেমার বাজেট, প্রযুক্তি বা অন্যান্য আয়োজনের অভাব ছিল না। কয়েক বছর আগেও একই নামে মুক্তি পেয়েছে নতুন রিমেক। বলিউডের নামী সিনেমা ‘শোলে’র অনুপ্রেরণাও ‘সেভেন সামুরাই’। হ্যাঁ, বাকি নির্মাণগুলোই শুধু অনুপ্রেরণা, মূল তো একটাই। ‘সেভেন সামুরাই’।