দক্ষিণাঞ্চলের নদীতে নাব্য সংকট কাটাতে কোটি টাকা ব্যয়ে খননকাজ করলেও সুফল মিলছে না। এতে ঢাকা-বরিশাল নৌপথসহ এ অঞ্চলে প্রায়ই চরে আটকে যাচ্ছে লঞ্চ, ঘটছে দুর্ঘটনা। লঞ্চ মালিক-চালকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গভীরতা বাড়াতে নদী খনন করে ওই মাটি আবার নদীতেই ফেলছে বিআইডব্লিউটিএ। ফলে খনন করে কোনো লাভ হচ্ছে না। এ সংকট সমাধানে ক্যাপিটাল ড্রেজিং বা গভীর খননকাজ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বরিশাল লঞ্চ মালিক সমিতি জানায়, ঢাকা-বরিশাল নৌপথে মিয়ার চর, বামনীর চর, চর জালালপুর, বড়ইচর, টেংরাখালী, কীর্তনখোলাতীরের বরিশাল নৌবন্দর, হোসনাবাদ-টরকী নৌপথ, লাহারহাট ভেদুরিয়া ফেরি ও নৌ-রুট, পটুয়াখালী বন্দর এলাকায় নাব্য সংকট বেশি। এর মধ্যে ভোলা ভেদুরিয়া ও মিয়ার চর এলাকায় কিছুদিন আগে নদী খনন করা হয়েছে। বরিশাল নদীবন্দরে এখনো খননকাজ চলছে।
বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশন বরিশালের সভাপতি আবুল হাসেম বলেন, ‘জাহাজ চালাই আমরা, কিন্তু আমাগো কথা হোনে না। নদীর মাডি নদীর পানিতে ফেললে কাইট্যা কী লাভ হবে! কয়েক দিন পর তো আবার ভইরা যাইবে।’
পারাবত-১১ লঞ্চের মাস্টার মিজানুর রহমান বলেন, ‘জোয়ার-ভাটার নদীতে মাটি কেটে পানিতে ফেললে ওই মাটি পাশেই আবার চরার সৃষ্টি করে। নদীর মাটি অন্যত্র ফেলা উচিত।’ সুরভী ৮ লঞ্চের চালক আবদুল হালিম বলেন, ‘যে পরিমাণ মাটি কাটে তাতে দুইটা জাহাজ আসা-যাওয়া করায় সমস্যা হয়। একে তো মাটি ফেলা হচ্ছে পানিতে, তার উপরে যে পরিমাণ কাটার কথা তাও হচ্ছে না।’ একই কথা বলেন সিদ্দিকুর রহমান, আবদুল জলিল, গোলাম রসুল সরদার, গোলাম মোস্তফা, আল আমিনসহ কয়েকটি লঞ্চের মাস্টার ও চালকরা।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) খনন বিভাগ জানায়, খননকৃত মাটি অপসারণের তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। উঁচু কোনো স্থানে, নদীসংলগ্ন চরে পাইলিং করে বা নদীর প্রবাহের সঙ্গে ফেলা। সংস্থার নিজস্ব জায়গা না থাকায় এবং পার্শ্ববর্তী কোনো স্থানে ফেলতে না পারায় তৃতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
লঞ্চ মালিক সমিতি ঢাকার সহসভাপতি ও বরিশাল শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে লঞ্চ দুর্ঘটনার মূল কারণ নাব্য সংকট। প্রতিবছরই নদী খননে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু যতটুকু খননের দরকার তা করা হয় না। তাই পাশের বালি এসে আবার ভরাট হয়ে যায়।’ স্থায়ীভাবে খননকাজ চালিয়ে যাওয়ার দাবি জানালেও তা হচ্ছে না বলে জানান সুন্দরবন লঞ্চের মালিক সাইদুর।
লঞ্চ মালিক সমিতির সদস্য এবং সুরভী লঞ্চের মালিক রিয়াজুল কবির অভিযোগ করে বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ নদী খননে লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে না। ড্রেজিং করে ভাটার সময় আর মাটি মাপে জোয়ারের সময়। ফলে কাগজে-কলমে হলেও বাস্তবে সঠিকভাবে কাজ হয় না।’
এ ব্যাপারে বরিশাল বন্দর কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বরিশাল অঞ্চলে বেশিরভাগ সময় জরুরি খনন (মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং) করা হয়। এ বছর ক্যাপিটাল ড্রেজিং বা স্থায়ী খননকাজ শুরু হয়েছে। বিষয়টি লঞ্চ মালিকসহ সবাইকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি জানান, বরিশাল নৌবন্দর এলাকায় এ বছর প্রায় দেড় লাখ ঘনমিটার মাটি কাটা হবে। এতে দেড় থেকে ২ কোটি টাকা ব্যয় হবার কথা। এবারও শীতের শুরু থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের নদীতে দেখা দিয়েছে নাব্য সংকট। গত ৬ জানুয়ারি মিয়ার চরে ঢাকাগামী লঞ্চ অ্যাডভেঞ্চার আটকে যায়। পেছন থেকে আরেক লঞ্চ সুন্দরবনের ধাক্কায় এক যাত্রী নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে এবং চলতি মাসে লঞ্চ চরে আটকে যাত্রী দুর্ভোগের আরও একাধিক ঘটনা ঘটে।