মেট্রোরেলের কাজ এগোচ্ছে

ছোট হয়ে আসছে সড়ক, ভোগান্তি কমছে না

রাজধানীতে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকে ভোগান্তি কমছে না মিরপুরে। নির্মাণের অংশ হিসেবে পিলার বসাতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে দেওয়া হয়েছে ব্যারিকেড। এতে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে যানজট স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধুলা আর খানাখন্দ। এমন বাস্তবতা মাথায় নিয়েই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্থানে যেতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা।     

নির্মাণ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে দিয়াবাড়ির দিকে পিলার স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ। এখন মিরপুরের দিকে বেশ কিছু বাকি আছে। আগামী বর্ষার আগেই এসব পিলার স্থাপনের কাজ শেষ হবে। তখন নিচে কোনো কাজ থাকবে না। ফলে রাস্তা চলাচলের জন্য স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মেট্রোরেল এলাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি মিরপুর ১০ নম্বর এলাকা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। এর মাঝামাঝি সড়কের বেশির ভাগ এলাকা টিনের বেড়া দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়ার ফলে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। মানুষের চলাচলের জন্য উপযুক্ত ফুটপাতও নেই। এ ছাড়া খানাখন্দ ভরা রাস্তার কারণে যানবাহন চলাচলে ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে।

লম্বা সময় ধরে এই অবস্থা চলতে থাকায় অনেকে হাঁপিয়ে উঠেছেন। কিন্তু বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে যেতে পারছেন না। তাদের একজন মিরপুর ১১ নম্বরের বাসিন্দা, চাকরিজীবী আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জনবহুল এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সমস্যা কিছুটা হয়। উন্নয়নের স্বার্থে সেটা মেনে নিতে হয়। কিন্তু সবকিছুর একটা লিমিট আছে। সরকারের উচিত অফিস টাইমে কাজ বন্ধ রেখে রাতে কাজ করা। এতে জনসাধারণের জন্য একটু সুবিধা হবে।’

রাজধানীর ধানমন্ডির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিকিতা দাস বলেন, ‘মিরপুর ১২ থেকে আমি বাধ্য হয়ে এখন ক্যান্টনমেন্ট এলাকা দিয়ে যাতায়াত করছি। এতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে অনেক সমস্যা হয়। মাঝে মাঝে ১০ হয়ে যাই, এতে যে কষ্ট হয়, সেটা বলে বোঝাতে পারব না। মনে হয়, আমরা এ দেশের নাগরিক না। দুঃখ-কষ্ট দেখার কেউ নেই।’ 

বেসরকারি চাকরিজীবী সৈয়দ রনি আহাম্মেদ। মিরপুরের কালশী এলাকা থেকে বাংলামোটর অফিসে যান মোটরসাইকেলে। পূরবী ১০ নম্বর-শেওড়াপাড়া-আগারগাঁও পথটুকু পাড়ি দিতে আগে সময় লাগত আধা ঘণ্টা  থেকে পৌনে এক ঘণ্টা। এখন সময় লাগছে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। তিনি বলেন, ‘ধুলাবালি থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করি। তাতেও কাজ হয় না। সর্দি-কাশি লেগেই থাকে। প্রতিদিন মনে করি, এই এলাকায় আর আসব না। কিন্তু নিজের বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার উপায় নেই।’

একই অবস্থা মিরপুর ১২ নম্বরের বাসিন্দা আবীরের। এ সড়কের সবচেয়ে ভালো বাসটিতে যাতায়াত করেন তিনি। মতিঝিলে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশে আগে রওনা দিতেন সকাল ৮টায়। এখন এক ঘণ্টা আগে রওনা দিলেও অফিসে পৌঁছাতে আধা ঘণ্টা, কোনো কোনো দিন এক ঘণ্টাও দেরি হয়। এটা এখন নিত্যদিনের চিত্র। কারণ একটাইÑ এ সড়কজুড়ে চলছে মেট্রোরেলের কাজ।

দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘বাসের জানালা বন্ধ করে দিয়েও ধুলা থেকে বাঁচা যায় না। এত লম্বা সময় পাড়ি দিয়ে কাজে গেলে আর এনার্জি থাকে না। আমার বন্ধুরা সব এলাকা থেকে শিফট করেছে। কিন্তু বাচ্চার স্কুলের কারণে আমি ছাড়তে পারছি না। বন্ধুদের বাসায় দাওয়াত দিলেও আসতে চায় না।’

বিষয়টি নিয়ে মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) আবদুল্লাহ বাকী মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর মতো একটি জনবহুল জায়গায় এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভোগান্তি কিছুটা হবেই। আমরা বিষয়টা কিছুটা বুঝি, যেখানে দৈনিক লাখ লাখ গাড়ি যাতায়াত করে। এ জন্য রাতেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়া মিরপুরজুড়ে চলাচলের গতি স্বাভাবিক রাখতে রাস্তা মেরামত করে দেওয়া হচ্ছে। ধুলাবালি কমাতে নিয়মিত পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে পানির পরিমাণ হয়তো কম, সেটা আরও বাড়ানো হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বর্ষা মৌসুম আসার আগেই পিলারগুলো স্থাপন করতে পারব। আর পিলারের কাজ শেষ হলে নিচে কোনো কাজ থাকবে না; যা হবে উপরে। ফলে নিচের রাস্তার চলাচল স্বাভাবিক করা হবে। রাস্তার ওপর যদি আমাদের কাজ না থাকে, তবে অনায়াসে ভোগান্তি কমে আসবে।’

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা। বাকি পাঁচ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার জোগান দিচ্ছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পটি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। ২০১৬ থেকে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এর বাণিজ্যিক পরিচালনা শুরুর লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। তথ্য অনুসারে নভেম্বর পর্যন্ত মোট বরাদ্দের মধ্যে পাঁচ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

ভোগান্তি নিয়ে জানতে চাইলে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘জনবহুল এলাকায় এমন দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের কেমন ম্যাথডোলজি (পদ্ধতি) অ্যাপ্লাই (প্রয়োগ) করা হয়, বুঝি না। এর আগেও মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় আমরা জনভোগান্তি দেখেছি। কিন্তু তা লাঘবে খুব বেশি কিছু করা যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে মানুষ উপকার পাবে, এটা ঠিক। কিন্তু বাস্তবায়নকালীন এই লম্বা সময় দুর্ভোগ লাঘবে কিছু করা উচিত। কেননা, সব প্রকল্পে এই সংক্রান্ত আলাদা বরাদ্দ থাকে বলে জানি।’

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নথি ঘেঁটে জানা যায়, ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে প্রকল্পটি আটটি প্যাকেজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন সিপি-১ প্রকল্প ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে গত জানুয়ারিতে শেষ হয়েছে। ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়নে সিপি-২ প্রকল্পের ১৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ভায়াডাক্ট ও স্টেশন নির্মাণে নেওয়া হয়েছে সিপি-৩ ও ৪ প্যাকেজ। এ প্যাকেজের ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ শেষ হয়েছে, আর আর্থিক ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের ২৫ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ৩ দশমিক ২০ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও তিনটি স্টেশন নির্মাণে নেওয়া হয়েছে সিপি-৫ ও ৬ প্যাকেজ। এই প্যাকেজের কাজ শুরু হয়েছে গত ১ আগস্ট। বর্তমানে এ অংশে স্টেশন এরিয়ার চেকবোরিং ও পরিষেবা (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন লাইন) স্থানান্তর শেষ হয়েছে। এই প্যাকেজের জন্য বরাদ্দের ১৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় শেষ হয়েছে।

ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম বাস্তবায়নে নেওয়া হয়েছে সিপি-৭ প্যাকেজ। গত বছরের ১১ জুলাই এ প্যাকেজের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে আন্তঃপ্যাকেজ সমন্বয়ের কাজ চলছে। বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২ শতাংশ। আর্থিক ব্যয় হয়েছে প্যাকেজের জন্য বরাদ্দের ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রকল্পটির অষ্টম প্যাকেজ হচ্ছে রেলকোচ ও ডিপো ইক্যুইপমেন্ট কেনা। এ অংশে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ ভৌত কাজ শেষ হয়েছে।