নজিরবিহীন দায়িত্বহীনতার সুরাহা হোক

পরপর সাতজন ওপেন হার্ট সার্জারির রোগীর মৃত্যুর পর বন্ধ করে দেওয়া হয় অপারেশন থিয়েটার (ওটি) বা অস্ত্রোপচার কক্ষগুলো। সেই থেকে পাঁচ মাস ধরে টানা বন্ধ আছে পাঁচটি ওটির চারটিই। ফলে ওপেন হার্ট সার্জারিসহ প্রায় সব ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে হাসপাতালটিতে। এ কারণে মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সারা দেশ থেকে আসা মুমূর্ষু রোগীরা। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি হৃদরোগের জন্য দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ‘জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে’র। এই পরিস্থিতির নেপথ্য কারণ হাসপাতালটিতে মারাত্মক দুর্নীতি ও দায়িত্বশীলদের কর্তব্যে ব্যাপক অবহেলা।

গতকাল দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে দেশের কোনো শীর্ষ হাসপাতালে পাঁচ মাস ধরে বেশির ভাগ অস্ত্রোপচার কক্ষ বন্ধ থাকার এই নজিরবিহীন ঘটনা প্রকাশিত হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছরের ২ আগস্ট থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে হাসপাতালটিতে ওপেন হার্ট সার্জারি করা সাতজন রোগী অস্ত্রোপচার কক্ষেই মারা যায়। এ নিয়ে হইচইয়ের পর তদন্তে দেখা যায়, অস্ত্রোপচার কক্ষে সংক্রমণের শিকার হয়েই মারা গেছে ওই রোগীরা। অস্ত্রোপচার কক্ষগুলোতে মারাত্মক সংক্রমণের বিষয়টি ধরা পড়ে চিকিৎসকদের কাছে। একটি আধুনিক গবেষণাগারে নমুনা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অস্ত্রোপচারের সরঞ্জামসহ সংক্রমণের মোট ৪২টি উৎস চিহ্নিত হয়। এরপর সংক্রমণ ধরা পড়া চারটি অস্ত্রোপচার কক্ষ বন্ধ করে দিয়ে সংস্কারকাজ শুরু করা হয়। কিন্তু পাঁচ মাসেও তা শেষ হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার সহায়তায় পাওয়া একটি ‘অটোক্লেভ মেশিন’ দিয়েই তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছিল অস্ত্রোপচার কক্ষের জীবাণুমুক্তকরণ ও সংক্রমণ নিরোধ করার কাজ। গত বছরের আগস্টে যন্ত্রটি বিকল হয়ে পড়ায় এই বিপদ নেমে আসে। কিন্তু এর আগেই অস্ত্রোপচার কক্ষের আধুনিকায়নে ১১ কোটি টাকায় চারটি অটোক্লেভ মেশিন কেনা হলেও তার তিনটি শুরু থেকেই বিকল ছিল, আরেকটি কখনোই হাসপাতালে দেখা যায়নি! জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এমন দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত হলেও তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

বিপুল চিকিৎসা ব্যয়ের এই সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা সরকারি হাসপাতালগুলো। হৃদরোগে অস্ত্রোপচারের মতো জটিল চিকিৎসায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ঢাকায় ছুটে আসেন সুলভে উন্নত চিকিৎসা পেতে। হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে যেখানে অস্ত্রোপাচারের ব্যয় এক লাখ টাকা, সেখানে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই ব্যয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। এই হাসপাতালে বিনা নোটিসে পাঁচ মাস ধরে অস্ত্রোপাচার বন্ধ থাকায় মুমূর্মু রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং অন্যত্র চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের কথা কারও অজানা নয়। এখন অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকও দালালচক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছেন।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মারাত্মক দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার ভয়াবহ এই চিত্রটি হয়তো একটি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত, কিন্তু কোনোভাবেই তা দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাসেবার চিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এই দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় যে, কেন প্রায়ই আমরা দেশের শীর্ষ রাজনীতিক-ব্যবসায়ী-আমলাদের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার খবর সংবাদ শিরোনাম হতে দেখি। কিন্তু সাধারণের চিকিৎসার দায়ভার তো রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। নতুন সরকারের স্বাস্থমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক স্বপন নিজ দপ্তরের প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেছেন, ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান’ চালাবেন তিনি। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এই মারাত্মক দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার স্বাস্থ্যসেবা খাতকে দুর্নীতিমুক্ত ও সত্যিকার অর্থেই সেবা খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হবে জনগণ সেটাই দেখতে চায়।