৮ ফেব্রুয়ারি ৪০ বছরে পা রাখবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। সেই আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এই অসাধারণ ধারণা কীভাবে ছড়িয়ে গেল সারা দেশে? মেলল অজস্র ডানা? কী করে তার শুরু? তার মধ্যেই বা এই স্বপ্নের জন্ম কেমন করে? এমন অনেক প্রশ্ন নিয়ে হাজির ওমর শাহেদ। জবাব দিলেন আলোকিত মানুষ। ছবি তুলেছেন সাহাদাত পারভেজ
বই পড়ার প্রতি এই ভালোবাসা কি বাবা আজিমুদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে পাওয়া?
হ্যাঁ, আমার বাবা বাগেরহাটের সরকারি পিসি কলেজের নামকরা অধ্যাপক ছিলেন, অধ্যক্ষ ছিলেন। আমাদের বাড়িভর্তি বই ছিল। সেই বইগুলো পড়ে আমরা আট ভাইবোন মানুষ হয়েছি। ছোটবেলায় অন্যদের মতো আমিও নীহার রঞ্জন রায়ের কিরীটি রায়সহ অন্যান্য গোয়েন্দা গল্পের বই পড়তাম। তবে পিসি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় সাহিত্য পাঠে উন্মাদ হয়ে উঠলাম। প্রথমে ইংরেজি সাহিত্য দিয়ে আরম্ভ করেছিলাম, যেহেতু আব্বা প্রধানত ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। তারপর শুরু হলো বাংলা সাহিত্য পড়া। দুই সাহিত্য পাঠই পাশাপাশি চলতে লাগল। এ সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করেছি। মনে আছে, এ সময় এই ধরনের পড়ালেখায় প্রায় চন্দ্রাহতের মতো ছিলাম। দিনরাত্রি বোধও আমার থাকত না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও সেই যে সকালে বিশ^বিদ্যালয়ে যেতাম, ক্লাস শেষে সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে পড়তে যেতাম; সেখান থেকে রাত্রিবেলা বেরুতাম। এটি না বলাই ভালো। কারণ একেবারে প্রতিদিন যে এভাবে পড়ালেখা করতে পেরেছি, তা নয়। তবে যতদূর সম্ভব পড়েছি। সেই সময় পড়ালেখার উন্মাদনা, সাহিত্যের উন্মাদনা, দর্শনের উন্মাদনার মধ্যেই আমার সময় কেটেছে। পাস করার দুই বছর পর্যন্ত এ ধারাটি আমার মধ্যে ছিল। কিন্তু তারপর আমাদের ষাটের দশকের তরুণ লেখকদের সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। আমারও কাজ শুরু হয়ে গেল। ছোটাছুটি, ব্যস্ততা শুরু হলো। বিজ্ঞাপন, লেখক, ছাপাখানা; কাগজ কেনা, প্রুফ দেখাÑএসব নিয়ে আমার সেই পড়ালেখার জীবন যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আপনি তো কণ্ঠস্বরের কথা বললেন?
হ্যাঁ।
এই আন্দোলন করতে গেলেন কেন?
আমরা দেখলাম, একটি নতুন যুগ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সামনে সাহিত্যের বড় সময়টি এসে দাঁড়িয়েছে। সেই কাজে আমরা সংঘবদ্ধভাবে একত্রিত হব, বড় কিছু করব, বড় কিছু স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাব-এটি ছিল আমার চেষ্টা।
রফিক আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, নির্মলেন্দু গুণের মতো প্রতিভাকে কীভাবে তুলে আনলেন?
ওখানে আমি শিক্ষকতা করিনি, আমি তাদের বন্ধু ছিলাম। বয়সে একটু বড় ছিলাম। কাজেই আমি বড় ভাইয়ের মতো ছিলাম। আমি বয়সের কম বেশিতে বিশ্বাস করি না। কারও চাইতে বড়; এটি আমার কৃতিত্ব নয়; কেউ আমার চাইতে ছোট এটি তার ব্যর্থতা নয় (হাসি)। এটি একটি ঐশ্বরিক চক্রান্ত (হাসি)। সুতরাং আমরা একসঙ্গে হইচই করেছি, মত্ত হয়ে থেকেছি; সাহিত্য, শিল্প নিয়ে আমাদের সেই জীবন আমরা পাগলের মতো কাটিয়েছি। সেসবের মধ্যে থেকে যা হওয়ার হয়েছে।
প্রতিভা আবিষ্কার করাও তো যোগ্যতা-
এতসব চিন্তা করিনি। কারণ একটি জায়গায় যখন আগুন লাগে, আরও ভালো করে বললে একটি মোমবাতি যখন জ¦লে, তখন বহু পোকা সেই আগুনে এসে আত্মাহুতি দেয়। সেভাবে যখন কোনো জায়গাতে যখন একটি সাহিত্যের আলো জ¦লে ওঠে বা সংগ্রামের আলো জ¦লে ওঠে, তখন দেখা যায়- বহু মানুষ সেজন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে আসে। আমাদের ষাটের দশকে সে রকম একটি কাজ হয়েছিল। সেই আলো যখন জ¦লে উঠেছিল, আলোতে অনেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমিও পড়েছি।
আপনি তো তাদের তৈরি করে দিয়েছিলেন?
ঠিক তৈরি করিনি। মাঝখানে থেকে আমি ভারসাম্য রক্ষা করেছি, সমন্বয় করেছি।
এখন যেমন পাড়ায় মহল্লায় কিশোর-তরুণরা অলস আড্ডা দেয়, আপনাদের সময়ে কী বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ছিল? তরুণদের বই পড়ার অভ্যাস ছিল?
আমাদের সময়ে লাইব্রেরির সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। সেসব লাইব্রেরিতে বহু আগ্রহী, উদ্দীপ্ত মানুষকে আমরা দেখেছি। তারা আমাদের বই পড়তে অনুপ্রাণিত করেছেন। সেসব মানুষ এখন আর লাইব্রেরিগুলোতে গেলে পাওয়া যায় না। তখন প্রায় পাড়াতেই লাইব্রেরি ছিল। সেগুলো সেই এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের প্রাণ ছিল। কাজেই সবকিছু মিলে আমাদের শৈশবে আমরা খুব সুন্দর সাংস্কৃতিক পরিবেশ পেয়েছিলাম। আমরা তখন দেদারসে বই পড়তাম।
এই বই পড়াই কি আপনাকে সেই আমলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র হয়েও শিক্ষকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে?
বই পড়ার জন্যই যে আমি বাংলা সাহিত্যে ভর্তি হয়েছি তা নয়। ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হলাম। তার কারণ, এর মাত্র পাঁচ বছর আগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়েছে। তখন একজন উদ্বুদ্ধ, আদর্শবাদী তরুণ হিসেবে আমার মনে হয়েছে, আমাদের মাতৃভাষাকে বড় করে তুলতে হবে। একে ঐশ^র্য, মর্যাদাবান করতে হবে। সেজন্য যতটুকু দিতে পারি, আমার দেওয়া উচিত। তাই বাংলায় পড়তে গিয়েছি। অধ্যাপনা যে করব, সেটি স্কুলজীবন থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম। কারণ আব্বার অধ্যাপক হিসেবে অসাধারণ খ্যাতি ছিল। সেটি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
অসংখ্য নামকরা ছাত্র এখনো শিক্ষক হিসেবে আপনার নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। শিক্ষক হিসেবে এই সাফল্যের রহস্য কী? আপনি তৃপ্ত?
তৃপ্ত-অতৃপ্ত বুঝি না। শিক্ষক বলতে আমি বুঝি এমন এক ধরনের মানুষ, যিনি কোনো স্কুল-কলেজ বা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতেও পারেন, নাও হতে পারেন; কিন্তু এ ধরনের মানুষরা চারপাশকে বড় করে তুলতে চান, চারপাশের মানুষদের সমৃদ্ধ করে তুলতে চান। সেই মানুষগুলো শিশু, তরুণ বা বয়স্ক হোক; তাদের উন্নত জীবনে নিয়ে যেতে চান। এমন এক ধরনের মানুষ আছেন। আমাদের ছেলেবেলায় এমন অনেক মানুষকে দেখেছি। আমার মনে হয়, যে কারণে শিক্ষক হিসেবে ছেলেমেয়েরা আমাকে মনে রাখে; সেটি হলো আমি ঠিক কাঠখোট্টা শিক্ষক ছিলাম না, ঠিক গতানুগতিক ধারার শিক্ষক ছিলাম না। শিক্ষা বলতে আমি জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশকে বুঝি। শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে তোলার কাজটিকে বুঝি। এই কাজ করার স্বপ্ন আমি সবসময় দেখেছি। সেজন্য শ্রেণিকক্ষে খুব বেশি পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে থাকিনি। ছাত্রদের জীবনকে, জীবনের বড় স্বপ্নকে, আনন্দকে তাদের সামনে তুলে এনেছি। তাদের বড় স্বপ্ন দেখাতে চেষ্টা করেছি। তাই আমার কথাবার্তার মধ্যে কিছু হাস্যরস আছে, জীবনবোধ আছে, কিছুটা কবিত্ব আছে, মানবিকতাও আছে। সেসব গুণ কিছুটা কাজে লেগেছে। তাই ছাত্ররা হয়তো আমাকে পছন্দ করেছে, অনেকে উপকৃতও হয়েছে। সেকথাও তারা আমাকে বলে। এসব কারণেই তারা আমাকে হয়তো পছন্দ করে।
শিক্ষকতার মাধ্যমে তাদের কি শেখাতে চেষ্টা করছেন?
আমি তাদের জীবনের কথা বলেছি। আমাদের জীবন কী, জীবনের অর্থ কী, এই জীবন নিয়ে আমাদের কী করা উচিত, তা বলেছি। এই একটি জীবনই তো আমরা পেয়েছি। আর তো দ্বিতীয়বার এটি কেউ পাব না। সুতরাং এর সর্বোচ্চ ও সুন্দর ব্যবহার আমরা কী করে করতে পারিÑএসব নিয়েই প্রধানত আমি আলোচনা করেছি, সাহিত্য নিয়ে কথা বলেছি। আমি কবিতা ভালোবাসতাম। বহু কবিতা একসময় আমার মুখস্থ ছিল। সেসব কবিতা আবৃত্তি করে তাদের শুনিয়েছি। তারা অনুপ্রাণিত, উদ্দীপ্ত হয়েছে, এই বোধ ভালোবেসেছে। আমি মনে করি, ওখানেই আমার কাজ শেষ। এই পৃথিবীতে কেউ থাকে না। সবাই চলে যায়। আমরাও চলে যাব। কিন্তু যে কদিন থাকলাম, একটি প্রজাপতির মতো; প্রজাপতি কদিন বাঁচে? কিন্তু যে কদিন বাঁচে, তার সৌন্দর্যে, রূপে চারপাশকে কিছুক্ষণের জন্য ঝলসে দিয়ে যায়। আমাদের প্রত্যেকেরই তাই কাজ। যতক্ষণই আছি, আমার শ্রেষ্ঠ কর্মটি দিয়ে চারপাশকে কিছুটা আলোকিত করে যাব। এইটুকুই আমার, আপনার দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব সাধ্যমতো পালন করতে গিয়েছি।
বিটিভির আনন্দমেলার ১০ বছরের জীবনকে গর্বের জীবন মনে করেন না ব্যর্থতার জীবন মনে করেন?
এটিও আমার খুব আনন্দের জীবন। আনন্দে একেবারে ভরপুর ছিলাম, পাগলের মতো মত্ত হয়ে অনুষ্ঠান করেছি। নিজে মাতাল হয়েছি, দর্শকরাও মাতাল হয়েছেন। এবং দর্শক ও উপস্থাপকে যে প্রাণে প্রাণে কথা, জীবনে জীবনে কথা হয়, আমাদের মধ্যে সেই কথা চলেছে। তাতে সবাই আনন্দ পেয়েছে, আমি উপভোগ করেছি।
আপনার জীবনের সেরা কীর্তি কি বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র?
আমার এসব সেরাটেরা নেই। যে মানুষ মরে যায় তার আবার সেরা কী?
বই পড়ার এই সামাজিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আন্দোলনের ভাবনা আপনার চিন্তায় কেন, কীভাবে এলো?
আমার মনে হয়েছে, আমাদের ছেলেবেলায় বই পড়ার ভেতর দিয়ে আমি দেখেছি, অনেক মানুষ, যারা বই পড়তেন; রুচি, চিত্ত, দীপ্তির দিক থেকে তাদের মধ্যে এক ধরনের উচ্চতা লক্ষ করতাম। তারা সাধারণ মানুষের চাইতে এগোনো মানুষ। বই পড়ে আস্তে আস্তে তারা উচ্চতর মানুষ হয়ে উঠতেন। বইয়ের এই ক্ষমতা ছেলেবেলায় আমার শিক্ষকদের মধ্যে দেখেছি, আমার পরিবারের মধ্যে দেখেছি। বই পড়ার এই উৎকর্ষ আমার সেই ছোট্ট গ-ির মধ্যে যদি সত্য হয়, তাহলে সেটি সারা দেশের মধ্যেও সত্য হবে। সেজন্য ছোট্ট গ-ি থেকে আমি সেটিকে সারা দেশের মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছি, চেষ্টা করেছি।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শুরুর দিনটি কি মনে পড়ে?
নিশ্চয়ই। এখন যেটিকে নায়েম বলে, যেখানে কলেজের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়; সেটির নাম তখন ছিল ‘এডুকেশন এক্সটেনশন সেন্টার’। ওখানে ড. ওবায়দুল্লাহ পরিচালক ছিলেন। তাদের একটি ছোট্ট মিলনায়তন ছিল। তাকে বললাম, আপনাদের মিলনায়তনে আমরা প্রত্যেক শুক্রবার বই পড়তে চাই। আমার চারপাশে ঢাকা কলেজের অনেক মেধাবী, অনুসন্ধিৎসু ও শানিত ছেলেরা ছিল। তারা কিছু একটা করতে চাইত বলে আমার মনে হতো। তাদের এই আকাক্সক্ষা দেখে বললাম, এসো আমরা প্রত্যেক সপ্তাহে একটি করে বই পড়ি। ১০ জন একত্র হলো। ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর আমরা ওখানে একত্র হলাম। বই পড়ার জন্য আমাদের একটি করে বই কিনতে হবে। ঠিক করলাম, ‘জসীমউদদ্্ীনের নকশিকাঁথার মাঠ’ বইটি দিয়ে আমরা শুরু করব। কারণ এটি ভালো বই, দামেও সস্তা। সাড়ে তিন টাকা দাম। ১০টি বইয়ের দাম হয় ৩৫ টাকা। কে দেবে ৩৫ টাকা? আশরাফুজ্জামান খান নামে এক ভদ্রলোক তখন ঢাকায় অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। তখন তিনি রেডিওর ডিজি। তিনি বললেন, আমি টাকা দেব। পকেট থেকে ৩৫টি টাকা বের করে আনলেন, নিউমার্কেট থেকে বই কিনে আনা হলো। আমাদের বিশ^সাহিত্য কেন্দ্রের পড়ালেখা শুরু হয়ে গেল।
বই পড়ার পাঁচ বছর পর দেশভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। এই পাঁচটি বছর কী করেছেন?
প্রথম পাঁচ বছরে পাঠচক্রটি ১০ জন থেকে আস্তে আস্তে ২৫ জন হয়েছে। পাঠচক্রটি পাঁচ বছর চলেছে। পরবর্তী সময়ে যত কাজ, তার জন্য যত চেষ্টা, যত আয়োজন যেমনÑ বাড়ি জোগাড়, বই পড়া, লাইব্রেরি বানানো, আমাদের সংগীতের আর্কাইভ ও সংগীত কক্ষ, ফিল্ম বিভাগ ইত্যাদি বানানো; বিশ^সাহিত্য কেন্দ্রকে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাÑএসব কাজ তখন পাশাপাশি করতে হয়েছে।
অসাধারণ, সারা দেশে ছড়ানো আন্দোলনের বিকাশের সংগ্রাম আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কতটা কষ্টের ছিল?
এই কাজে আমার কখনো কোনো কষ্ট হয়নি। কারণ যে কাজে কষ্ট হয়েছে, সেই কাজ কখনো আমি করিনি। যেখানে আনন্দ পাই, সেখানে আমি থাকি। আমাদের এই বারান্দায় একদিন সকালে একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখলামÑ বৃষ্টি হয়েছে; বারান্দার অর্ধেক শুকিয়েছে, অর্ধেক ভেজা। দেখলাম, ভেজার একেবারে প্রান্ত দিয়ে একটি কেঁচো হাঁটছে। ভেজা আর শুকনোর একেবারে প্রান্ত দিয়ে বারান্দার ওদিকটায় যাচ্ছে। কিন্তু লক্ষ করলাম, যখনই ওর মুখটি শুকনোর দিকে চলে আসে, তখন আস্তে করে আবার ভেজার দিকে চলে যায়। কারণ ভেজা সেই জলের মধ্যে তার জীবন, স্বস্তি, বেঁচে থাকার আশ^াস। আমারও আশ^াস আনন্দে। যেখানে আনন্দ নেই, সেখান থেকে আমি সরে যাই।
এই কেন্দ্রের আনন্দটাই কি আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ?
ওটা আমি বলতে পারব না। প্রচুর আনন্দ পেয়েছি। তবে অনেককাল উপভোগ করছি বলে আনন্দটিও ছড়িয়ে গেছে। সাহিত্যের আন্দোলন করেছি ষাটের দশকে, সেটি কিন্তু খুব তীব্র ছিল। তারপর ১০ বছর টেলিভিশনে, এটি অল্পদিনের, কিন্তু প্রচ- তীব্র। তারপর শিক্ষকতা যখন করেছি, তখনো তাই। পরিবেশ আন্দোলন করেছি, তখনো তাই। কিন্তু বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র যেহেতু ৪০ বছর ধরে চলছে, সেটি তো তীব্রতা ও মাতাল অবস্থায় থাকেনি। কিন্তু এখানে বন্ধুত্বে, আড্ডায়, পড়ালেখায়, ছাত্রদের সঙ্গে ওঠাবসায়, এই প্রতিষ্ঠানের জন্য পাগলের মতো কাজ করে যাওয়ায়; সবকিছু মিলে এখান থেকে খুব সুন্দর একটি জীবন পেয়েছি।
আপনাকে কারা সহযোগিতা করে? কারা কারা পৃষ্ঠপোষকতা দেয়?
যাকে পাই, তাকে ধরি। সবসময় আমি পৃষ্ঠপোষকতা পাই। সবসময় দেখি, মানুষ যেকোনো কারণেই হোক আমাকে বিশ্বাস করে, ভালোবাসে। যে কাজই আমি করতে গেছি, দেখেছি অনেক মানুষ আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, সঙ্গে সঙ্গী হয়ে, বন্ধু হয়ে; পথ নির্দেশক হয়ে উপদেশ দেওয়ার জন্য এবং সহযোগিতা করার জন্য অনেকে এসেছে। এমারসনের একটি কথা আছে, ‘যখন কেউ কোনো কাজ করার জন্য উঠে দাঁড়ায়, তখন সারা পৃথিবী তাকে সহযোগিতা করতে থাকে।’ যখনই কোনো কাজ করতে গিয়েছি, আমার সহযোগিতার অভাব হয়নি।
বইগুলো কারা বাছাই করে?
মোটামুটি আমিই বাছাই করি।
আপনার অসুবিধাগুলো এখন কী?
একটি কাজ চলতে থাকলে তার ভালো ব্যাপারও আছে, কষ্টের দিকও আছে। হতাশাও আছে। আজকে যেটি হচ্ছে না, কাল হয়তো আরকটি জিনিস তার দ্বিগুণ ভালো হবে। আমার কোনো অসুবিধা তাই নেই।
বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
এমন কিছুই নয়। সারা দেশের সব ছেলেমেয়ের কাছে সংস্কৃতি, আলো, বই, মানব জ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়া এবং বড় জীবন তাদের সামনে উন্মোচিত করে যাওয়াÑএটিই আমার একমাত্র ইচ্ছে।
আপনার অবর্তমানে এই বিশাল প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে?
আগে আমি বিগত হই, তারপর ওটি ঠিক হবে।
সারা বিশ্বে এই পরিকল্পনা কি ছড়িয়ে দেওয়া যাবে না? কোনো প্রস্তাব এসেছে?
একবার শুনেছিলাম আমাদের মতো এই রকম দেশগুলোতে এই কর্মসূচিকে প্রসারিত করতে বিশ^ব্যাংক চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটি তারা কতদূর কী করেছে, জানি না। তবে আমি মনে করি, এই মডেলটি একটি ভালো মডেল। আমাদের মতো দরিদ্র বা স্বল্পোন্নত দেশে এই কর্মসূচি খুবই কার্যকর বলে আমার মনে হয়। বিশেষত যেখানে জনসংখ্যা বেশি, যেখানে অল্পের মধ্যে সবকিছু পাওয়া যায়।
সাহিত্যের মাধ্যমে কি মানুষকে বদলে ফেলা সম্ভব?
যেকোনো কিছুর মাধ্যমেই মানুষকে বদলে ফেলা সম্ভব। সেজন্য কিছুই লাগে না। যে চায় বদলাবে, সেটি তার ওপর এবং যিনি বদলটি হোক চানÑতার ওপর এটি নির্ভর করে। তাদের দুজনের যদি মিল হয়ে যায়, তাহলে তো আলোটি জ্বলে উঠবেই।
আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না কেন?
না থাক, দরকার নেই।
আপনার প্রিয় বই?
অজস্র প্রিয় বই আছে।
(১৮ জানুয়ারি, ২০১৯, বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা)