বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যানজট। প্রতিদিন যাত্রীরা ছাড়াও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মালামাল পরিবহনে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের মোড়ের জট নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যানজট ৭০ শতাংশ কমে আসবে। যানজটের কারণ হিসেবে পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, বাস ও ট্রাকের টার্মিনালের অপ্রতুলতার কথা। সবচেয়ে বেশি যানজট থাকে নগরীর বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে। চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জমুখী সড়ক পণ্যবাহী ট্রাকে ঠাসা থাকে দিন রাত সবসময়। একই চিত্র দেখা যায় বন্দর এলাকায়। আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, কন্টেইনার মুভারসহ ভারী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন থাকে ফ্লাইওভারেও। এছাড়া নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কারণে রাস্তা সঙ্কুচিত হওয়ায় যানজট বাড়ছে।
গত মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে ট্রাফিক অব্যবস্থাপনার দৃশ্য চোখে পড়ে। জিইসির মোড়, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, ওয়াসার মোড়, নিউমার্কেট মোড়সহ বিভিন্ন সিগন্যাল পয়েন্টে ছিল না শৃঙ্খলা। নিউমার্কেট মোড়ে রাস্তার ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে বাস ও রাইডার। ৪, ৬, ৭ ও ৮ নম্বর রুটের গাড়ি মোড়ের যাত্রীছাউনি থেকে নতুন রেলস্টেশন পর্যন্ত এলোপাতাড়িভাবে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। ১, ২ ও ৩ নম্বর রুটের গাড়ি কোতোয়ালি মোড়ে যাওয়ার আগে নিউমার্কেটের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এতে মোড়ের মধ্যে জটলার সৃষ্টি হয়। অপরদিকে চকবাজার মোড়ের জটলা বহুমুখী।
মোড়কেন্দ্রিক এই জট নিয়ন্ত্রণ করা গেলে চট্টগ্রাম শহরের ৭০ শতাংশের বেশি যানজট নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের প্রকৌশলী সুভাষ বড়–য়া বলেন, ‘প্রতিটি মোড়ের কেন্দ্র থেকে সর্বনিম্ন ২৫০ ফুটের মধ্যে কোনো গাড়ি দাঁড়াতে না দিলে নগরীর ৭০ শতাংশের বেশি যানজট কমে আসবে। এতে মোড়গুলো ফ্রি থাকবে এবং গাড়ি সহজে যাতায়াত করতে পারবে।’
নগরীর ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় দায়িত্ব পালন করে। তবে পুলিশেরও কিছু অনিয়ম যে নেই, তা বলব না। সিনিয়র অফিসাররা মনিটরিং করলে এসব অনিয়ম ঠেকানো কঠিন নয়।’
সড়কে বিশৃঙ্খলার বিষয়ে বিআরটিএর (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন) উপ-পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রায় প্রতিদিনই মামলা করছে। তবে শুধু আইন দিয়ে যানজট দূর করা যাবে না, এক্ষেত্রে যাত্রীদের সহায়তাও প্রয়োজন।’
পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, নগরীতে বাস ও ট্রাকের পর্যাপ্ত টার্মিনাল নেই। ফলে যত্রযত্র পার্কিংয়ে বাধ্য হচ্ছেন চালকরা। এতে যানজট আরও বাড়ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন পূর্বাঞ্চল কমিটির সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘নগরীতে স্থায়ী কোনো আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নেই। কদমতলীতে কিছু বাস রাখা গেলেও বেশিরভাগই অলংকার, জিইসিসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নগরীর একটি মাত্র স্থায়ী ট্রাক টার্মিনালের অবস্থান বন্দরসংলগ্ন নিমতলা এলাকায়। সেখানে একশর বেশি ট্রাক রাখা যায় না। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ১৫টির মতো অস্থায়ী টার্মিনাল। শহরে প্রবেশের পর পণ্য খালাস করে এবং তা বোঝাই করে একটি ট্রাকের শহর ছাড়তে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। টার্মিনালের অভাবে চালকরা বাধ্য হয়ে সড়কে ট্রাক রাখেন।’
যানজটের কারণ হিসেবে রয়েছে অধিক সংখ্যক ছোট গাড়িও। বিশ্বব্যাংকের এক কর্মশালায় জানানো হয়, নগরীর রাস্তায় চলাচল করা গাড়ির মধ্যে ৯২ শতাংশই ছোট আকৃতির (রিকশা, অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি)। এসব গাড়ি যাত্রী পরিবহন করে মাত্র ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ যাত্রীর যাতায়াত মাধ্যম গণপরিবহন মোট গাড়ির মাত্র ৮ শতাংশ! এছাড়া একটি আধুনিক নগর রাষ্ট্রে মূল ভূমির কমপক্ষে ২৫ শতাংশ রাস্তা দরকার। সেখানে চট্টগ্রামে ৫ শতাংশও নেই।