মেহেরপুর সদর উপজেলার দীঘিরপাড়া এলাকায় মারিয়া খাতুন (৩৫) নামের এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নির্যাতন, তার বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর, টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মোটরসাইকেল লুটের অভিযোগে এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গতকাল বুধবার ওই নারী বাদী হয়ে মেহেরপুরের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হাদিউজ্জামানের আদালতে সদর থানার এসআই লস্কর লাজুল ইসলাম ওরফে জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) শেখ জাহিদুল ইসলামকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে নির্যাতনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন পুলিশ সুপার (এসপি) মোস্তাফিজুর রহমান। তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি ওবাইদুর রহমান ও ডিআইও ওয়ান ফারুক হোসেন। মামলায় অন্তঃসত্ত্বা মারিয়া খাতুন অভিযোগ করে জানান, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি বাড়িতে একা রান্না করছিলেন। এমন সময় এসআই জিয়া ও দুজন পুলিশ কনস্টেবল বাড়ির দরজায় ডাকাডাকি শুরু করেন। ‘বাড়িতে কেউ নেই’ বলাতে জিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে টিনের দরজায় লাথি মারলে দরজা খুলে যায়। পরে গালিগালাজ করতে করতে ঘরের মধ্যে ঢুকে আসবাবপত্র তছনছ শুরু করেন জিয়া। চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন জিনিস ভাঙচুর শেষে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে থাকা ৮৫ হাজার টাকা ও ৯১ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার লুট করেন।
ওই নারী আরও জানান, স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা লুটের পর এসআই জিয়া রান্নাঘরে মোটরসাইকেল দেখে চাবি চান। চাবি দিতে না চাইলে তাকে (মারিয়া) ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন ও বিভিন্ন হুমকি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে চাবি দিলে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের অ্যাপাচি আরটিআর ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলটি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সে সময় এসআই তাকে বলে যান, টাকা নিয়ে গিয়ে যেন মোটরসাইকেল ফেরত নিয়ে আসা হয়।
অন্তঃসত্ত্বার স্বামী মেহেদী হাসান বাকের জানান, সোহেল নামে এক অটোরিকশাচালকের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। এই নিয়ে সোহেল তার নামে থানায় মামলা করে। সে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এসআই জিয়া তাকে আটক করতে যান। কিন্তু তাকে না পেয়ে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে মারধর ও বাড়িতে ভাঙচুর চালান। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘অপরাধ করলে আমি করেছি। আমার স্ত্রী কোনো অপরাধ করেনি; আমার বাড়িঘর কোনো অপরাধ করেনি। আমার বাবাও একজন পুলিশ কর্মচারী। পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে এ ধরনের ব্যবহার তিনি করতে পারেন না। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।’
মারিয়াদের প্রতিবেশী আনজিরা খাতুন বলেন, ‘তিনটি পুলিশ এসে বাড়ির ভেতরে সবকিছু ভেঙেচুরে মোটরসাইকেলটি নিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় আজেবাজে গালিগালাজ করেছে। বাকেরের পোয়াতি (অন্তঃসত্ত্বা) বউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।’
বাকেরের নানি সফুরা খাতুন বলেন, ‘বারবার করে মোটরসাইকেলটি না নিয়ে যাওয়ার জন্য হাতজোড় করলাম। তবুও শুনল না ওই পুলিশটা। মোটরসাইকেল নিয়ে গেল, আবার টাকা নিয়ে গিয়ে ছাড়িয়ে আনতেও বলল।’
এসআই জিয়া বলেন, তার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তবে মোটরসাইকেল নিয়ে আসার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাড়িতে একটি অন টেস্ট (লাইসেন্সবিহীন) মোটরসাইকেল ছিল। সেটি নিয়ে এসেছি।’ মোটরসাইকেল কোন কারণে নিয়ে এলেন জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি।
মেহেরপুরের পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এসআই জিয়ার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুনে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে তদন্ত দল গঠন করেছেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, তদন্ত এরমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ১৪ জানুয়ারি মেহেরপুর সদর হাসপাতাল এলাকায় একটি অটোরিকশা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ অভিযোগে ১৬ জানুয়ারি বাকেরসহ পাঁচজনকে আসামি করে সদর থানায় মামলা হয়। গত মঙ্গলবার আসামি বাকেরকে ধরতে যান এসআই জিয়া। এই নিয়ে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে এসআই জিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।