ফুল বৌদি

প্রচন্ড অভাবে দেশে টিকতে না পেরে চলে গিয়েছিলেন ভারতে। সেখানেই ফুলের চাষ ও ব্যবসা দেখলেন। কাজ করতেন ফুলের মাঠে। দেশে সেই ব্যবসা করতে ফিরে এলেন। যার কীটনাশক কেনার ১৩টি টাকাও ছিল না, সেই অঞ্জু রাণী সরকারের এখন ৮০ জন কর্মচারী, সাতটি দোকান ও একটি পিকআপ ভ্যান। বদলে যাওয়া নারীর গল্প বলছেন শাওন আবদুল্লাহ। ছবি তুলেছেন নূর

 

১৯৭৬ সাল। যশোরের কেশবপুর উপজেলার সন্তোষ সরকারের সঙ্গে বিয়ে হলো কিশোরী অঞ্জু রাণীর। ঘোমটা দিয়ে স্বামীর ঘর করতে গেলেন তিনি। তবে দরিদ্র সন্তোষের সংসারে অভাব খুব। দুবেলা, দুমুঠো ভালো করে খেতেও পারেন না। ফলে সংসারের হাল ধরতে বধূকেও মাঠে নামতে হলো। স্বামীর সঙ্গে মিলে মাঠে গরু দিয়ে হালচাষ করেন, ফসল রোপণ করেন, সেগুলোর যত্ন নেন। পরে ফসল কেটে বাড়িতে তোলেন। তবে ধান, আলুসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসলগুলো এত কষ্ট করে ফলানোর পরও জমির মালিককে তিনভাগের দুই ভাগ দিয়ে বাকিটা বিক্রি করে যে আয় হতো তাতে সংসার কোনোভাবে চলে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা দায় হয়ে গেল। পেটও ভালোভাবে ভরে না। বছর দুয়েকের মধ্যে অভাবের সংসার আলো করে জন্ম নিলো প্রথম ছেলেসন্তান। বাড়ির সবাই খুব খুশি হলেন। কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই মুখে আঁধার নেমে এলো সন্তোষ-অঞ্জু রাণী সরকারের। অভাব যে আরও বেড়ে গেল, ছেলের যত্ন নেওয়াই দায়। এরপর এলো দ্বিতীয় সন্তান। সেটিও পুত্র। তাদের মুখে খাবার জোগাতে মরিয়া হয়ে গেলেন মা-বাবা। দিন, রাত পরিশ্রম করেন। কিন্তু অভাব তো গোছে না। অনেক চেষ্টা করলেন, অন্য কাজ নেবেন। আরও আয় হবে। কোথাও কোনো চাকরি জোটে কি না সেদিকেও নজর রাখলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। চোখে আঁধার নেমে এলো মায়ের।

বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এলেন ছোট বোন। ভারতে থাকেন। এসেই অবাক। অভাব যে জেঁকে বসেছে। সব দেখে, অনেক ভেবে বোনকে ভারতে চলে আসতে অনুরোধ করলেন। বললেন, ‘ওদেশে কাজের সুযোগ অনেক, কোনো না কোনো কাজ ঠিকই পেয়ে যাবেন। সংসার চালাতে আর কষ্ট হবে না।’ কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন অঞ্জু। বারবার চোখ মুছলেন। হ্যাঁ, না কিছুই সেদিন মুখে জোগালো না।

বোন চলে গেলেন বাড়ি। আবার জীবনের তাগিদে মাঠে নামলেন অঞ্জু রাণী সরকার। তবে কোনোভাবেই পারছিলেন না। একদিন উপায়ান্তর না পেয়ে ছোট ছেলেটিকে কোলে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। ভোরে হাঁটতে শুরু করলেন, পথে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে, সঙ্গে আনা সামান্য কিছু মুখে দিয়ে সন্ধ্যায় চলে এলেন সীমান্তের কাছাকাছি। বোনের দেওয়া ঠিকানা মতো এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠলেন। সেখানে কোনোভাবে রাত পার করে তাদের দেখানো পথে ঘণ্টা দুয়েক হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ঠাকুরনগরে চলে এলেন। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর পরগনা জেলার বনগাঁও মহকুমায়। আরও হেঁটে বোনের বাড়িতে চলে এলেন। তিনি ক্লান্ত, দুর্বল বড় বোনকে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। তবে সেখানে মন টিকছিল না অঞ্জুর। বাড়িতে বড় ছেলেটিকে রেখে এসেছেন, বারবার সে ‘মা’ বলে ডাকছে। সেই ডাক যেন বহুদূর থেকেও তার কানে বাজছে। স্বামীই বা কীভাবে আছেন? তিনি কি ঠিক মতো সারা বেলা খাবার খেতে পেরেছেন? এসব ভেবে মন আকুল হয়ে গেল। সারা দিন কান্না করে কাটল। দুদিন পর বাড়ি ফিরবেন ঠিক করতে করতে দেখেন, ছেলেকে নিয়ে স্বামী এসে হাজির হয়েছেন। ছেলে দুটিকে পেয়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন মা। শুরু হলো নতুন জীবন। ঠাকুরনগরের অনেকে জমিতে ফুল চাষ করে সংসার চালান। ফুলের দোকানও অনেক আছে। তেমনই এক জমিতে চাকরি নিলেন অঞ্জু ও সুভাষ। তারা ফুলের বীজ থেকে উৎপন্ন চারার রক্ষণাবেক্ষণ ও যত্ন করেন। সেগুলো বিভিন্ন বাসাবাড়ি, নার্সারিতে (যেখানে গাছের চারা লালন করা হয়) বিক্রি হয়। স্বামী-স্ত্রী ফুল ব্যবসার কাজ শিখলেন। হঠাৎ এক মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো। তিনিও যশোরের মানুষ। তাই ঘনিষ্ঠতা হতে সময় লাগল না। নাম ‘কানাই’। ফুলের চারা কিনে নিয়ে দেশে বিক্রি করেন। তিনি জানালেন, ‘বৌদি, আমাদের দেশে তো ফুলের অনেক চাহিদা। হাজার হাজার মানুষ এ ব্যবসা করে ভালো আছে, লাভও বেশ।’ এই একটি কথাই ভাগ্যবিড়ম্বিত অঞ্জু রাণী সরকারকে প্রবল অনুপ্রাণিত করল। তিনি আরও বললেন, ‘চলুন আমার সঙ্গে, দেশে ফিরে যাই; আপনি চারা তৈরি করবেন। আমি সারা দেশে বিক্রি করব।’ তবে তখনো ভয় কাটেনি অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করা গ্রামের গৃহবধূটির। কথায় কথায় বলেও ফেললেন, ‘অভাবের জন্য দেশ, ভিটে ছাড়লাম। আবার ফিরে যাব? আবার যদি অভাবে পড়ি তাহলে তো আর ফিরে আসতে পারব না। এখানে যে অবস্থায় ছিলাম সেটিও নষ্ট হয়ে যাবে। পথে বসতে হবে।’ কানাই অভয় দিলেন। ফলে স্বামী-স্ত্রীর জামানো টাকা দিয়ে ফুলের বীজ কিনলেন। সেগুলো নিয়ে দেশে এলেন। জমানো সব টাকা ফুল ব্যবসায় লগ্নি করলেন। তবে নিজের কোনো জমি নেই সুভাষ-অঞ্জুর। ফলে ১৬শ টাকায় পাঁচ কাঠা জমি মাস তিনেকের জন্য বর্গা নিতে হলো। সেখানে পাঁচ হাজার টাকার গাঁদা ফুলের চাষ করতে লাগলেন। সারা দিন জমিতে কাজ করেন আর হন্যে হয়ে কানাইকে খোঁজেন। অজানা পেশায় তিনিই তো এখন তাদের একমাত্র ভরসা। হঠাৎ একদিন দুজনের দেখা হলো। তাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি ছোট ছোট ফুলের চারাগুলো দেখে খুব খুশি। পুরো জমির চারাগুলো একদিনে কিনে নিলেন। তবে শর্ত দিলেন, কাউকেই এই ফুল কেনার কথা বলা যাবে না, তাহলে অন্য ব্যবসায়ীরা ক্ষেপে উঠবে। চারা বিক্রির পুরোটাই আবার জমিতে লগ্নি হলো। এবারও গাদা ফুলের চাষ করতে লাগলেন। তবে হঠাৎ আক্রমণটি এলো। দিশেহারা হয়ে পড়লেন অঞ্জু। ফুলে পোকা ধরেছে। মাত্র ১৩ টাকার কীটনাশক কেনার পয়সাও তার কাছে নেই। অনেকের কাছে টাকা ধার চাইলেন, মুদি দোকানগুলোতে ঘুরলেন। কোথাও সামান্য সহযোগিতা পেলেন না, কেউই তাকে বিশ্বাস করলেন না। আসলে একেবারে হতদরিদ্র অঞ্জু কীভাবে সেই টাকা শোধ করবেন সেই উপায় কারও চোখে পড়ল না। নুরুল হক নামের এক মুদি দোকানদার দয়া করে বাকিতে কীটনাশক দিয়ে বললেন, ‘ফুল বিক্রি করে টাকা শোধ করবেন।’ কীটনাশক দেওয়ার পর চারা থেকে ফুল হলো। বেপরোয়া অঞ্জু ফুলের চারা নিয়ে যশোরের মূল শহরে চলে এলেন। দোকানে দোকানে ঘুরে তার ফুল দেখালেন, বিক্রেতারা পছন্দ করলেন। নমুনা কিনে নিলেন। মোটরবাইক চালিয়ে একদিন তারা বাড়িতে চলে এলেন। পুরো এক ব্যাগ ফুল পাঁচ হাজার টাকায় কিনে নিলেন। দৃশ্যটি দেখে গ্রামের অনেকেরই চোখে জল নেমে এলো। এই ফুলের জন্যই তো রাতদিন খেটেছেন, চোখের জল ফেলে ফুলের চাষ করেছেন দুজন মানুষ। এরপর ফুল নিয়ে তিনি খুলনায় গেলেন। শহরের এক বিক্রেতাকে তার ফুল দেখালেন। বাবু ভাই ফুলগুলো কিনে নিলেন। মান দেখে অনুরোধ করলেন, ‘বৌদি এখন থেকে আমাকেই শুধু ফুল দেবেন। নগদ টাকায় কিনে নেব।’ অঞ্জুর জীবনের মোড় ঘুরে গেল। যশোর ও খুলনার স্থায়ী বিক্রেতাদের কাছে ফুল বিক্রি করতে শুরু করলেন। অভাব কমতে লাগল। ছেলেরাও আস্তে আস্তে বড় হলো। দশটি শিশুর মতো স্কুলে যেতে লাগল।

১৯৮২ সালের কথা স্পষ্ট মনে পড়ে। তখন গ্রামের কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে কলাগাছের সঙ্গে চাদর, শাড়ি বা গামছা পেঁচিয়ে গেট বা বর-কনের স্টেজ বানানো হতো। এই দৈন্যদশায় উদ্যমী মানুষটি সম্ভাবনা খুঁজে পেলেন। কোনো বাড়িতে বিয়ের খবর পেলেই তিনি সে বাড়িতে গিয়ে অনুরোধ করেনÑ ‘আপনাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের পুরো স্টেজ আমার জমির ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেব। বিনিময়ে কিছুই লাগবে না, শুধু আমাদের চারজনকে খেতে দেবেন।’ কারও ভালো লাগত, প্রস্তাব মেনে নিয়ে কাজ করাতেন। নিজের হাতে তিনি স্টেজ সাজিয়ে দিতেন। অন্যেরা রাজি হতেন না। আস্তে আস্তে পুরো গ্রামেই তার হাতে, তার ফুল দিয়ে মঞ্চ সাজানো শুরু হলো। তিনিও সম্মানী পেতে লাগলেন।

প্রখর ব্যবসাবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষটি কেবল ফুল ব্যবসা করেননি, ফুলকে ছড়িয়েও দিয়েছেন। সেই আমলে কেশবপুর উপজেলার ধনী, গরিব নির্বিশেষে সব দোকান মালিকই ‘হাল খাতা’ করতেন। তিনি বাংলা নববর্ষের দিন কেশবপুরে চলে যেতেন। দোকানে দোকানে ঘুরে বলতেন, ‘অতিথিদের জন্য যে মিষ্টিগুলো রেখেছেন, সেগুলো থেকে মাত্র একটি খাওয়ালেই আমি আপনার পুরো দোকান ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেব।’ এভাবেই দোকান ফুল দিয়ে সাজিয়ে বর্ষবরণ শুরু হলো। আস্তে আস্তে পুরো কেশবপুরেই সেটি ছড়িয়ে গেল। বিয়ের মতো এই কাজেও তিনি আয় করতে শুরু করলেন।

নানা দিক থেকে আয় হলেও পুরোটাই খরচ করে ফেলতেন না। কিছু টাকা জমাতেন। সেগুলো দিয়ে জমি কিনতেন। সেই জমিতে ফসল নয়, ফুলের চাষ করতেন। সেগুলো বিক্রি করতেন যশোর ও খুলনার ফুলের দোকানে। এভাবে আয়-রোজগার বাড়তে বাড়তে কেশবপুরে ফুলের দোকান কিনলেন। এখন খুলনা শহর, যশোর ও সাতক্ষীরাতে তার মোট সাতটি ফুলের দোকান আছে। দেশের নানা স্থানে বিক্রির জন্য একটি পিকআপ ভ্যানও আছে। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ফুল কেনেন। সেগুলো নিজের দোকান ও বিভিন্ন শহরের পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। এখন তার বিশাল সাম্রাজ্যে ৮০ জন কর্মচারী আছেন, ৫০ জনই মেয়ে। মেয়েরা তার সঙ্গে চাকরি করে নিরাপদ বোধ করেন-হাসিমুখে জানালেন ফুল বৌদি। থানা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ফুলচাষি হিসেবে ২০১৩ সালে তিনি সরকারি ‘জয়িতা’ পুরস্কার পেয়েছেন। পরের বছর ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল প্যান-প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার প্রদান করেছে এবং তার হাতে ‘কৃষি উন্নয়নের মডেল’ সম্মাননা স্মারক তুলে দিয়েছে।

২০১৭ সালে ফুলের প্রসার ও ব্যবসায় অসামান্য অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পাঁচ লাখ টাকার চেক নিয়েছেন। এখন ফুল সুভাষ ও অঞ্জু রাণী সরকারের জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তাদের বড় ছেলেটি কুয়েত প্রবাসী, ছোট ছেলে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে পড়ালেখা করে।