শিকারিচক্র বেপরোয়া রাঙ্গুনিয়া-বোয়ালখালীর সংরক্ষিত বন হুমকিতে

শিকারিচক্রের বেপরোয়া আগ্রাসনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া-বোয়ালখালী সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নারিশ্চা, চিড়িংগা বন বিটে প্রায় দুই হাজার বন্য প্রাণী ও পাখির অস্তিত্ব হুমকিতে পড়েছে। রাতে তারা কেটে নিচ্ছে গাছ। নিধন করছে বন্য প্রাণী ও পাখি।  নানাভাবে এসব প্রাণী পাচার করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ার কোদালা চা-বাগানের চা-শ্রমিকরা সাপ্তাহিক বন্ধের দিন রবিবার সংঘবদ্ধ দল গঠন করে এলাকায় বনের পশুপাখি শিকারে নামে। 

কোদালা চা-বাগানে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক রয়েছে। তাদের অনেকেই শিকার করা পশুর মাংস বিক্রি করে। দীর্ঘদিন ধরে এমন তৎপরতা চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ক্রমেই কমে আসছে বন্য প্রাণী ও মূল্যবান গাছের সংখ্যা। তা ছাড়া অবৈধ দখলদারিত্বে কমেছে রাঙ্গুনিয়া বন রেঞ্জের আয়তন।  কোদালা দেশের প্রথম চা-বাগান ও আয়তনে প্রায় আড়াই হাজার একর। বন্য হাতির প্রজননক্ষেত্রও এই চা-বাগান। বাগানে শিকারিদের কবলে বন্য শূকর বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ আমলে বাগানের ব্যবস্থাপক ডাউলিং চা চাষের জন্য পশ্চিম বাংলা, আসানশোল, আসাম, বিহার, কলকাতা থেকে রাঙ্গুনিয়ায় শ্রমিক নিয়ে আসেন।  নৃতাত্ত্বিক এই জনগোষ্ঠী তাদের পূর্বপুরুষের মতোই শিকারকে প্রাধান্য দেয় আনন্দ উৎসব হিসেবে। শ্রমিক হিসেবে কর্মরত অথচ শিকারে দক্ষ এসব চা-শ্রমিকদের কারণে নারিশ্চা বনবিট এলাকা তথা বোয়ালখালী-রাঙ্গুনিয়া পটিয়া সীমান্তবর্তী ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন বিপন্ন।  বছরের পর বছর বন্য প্রাণী নিধন ও গাছ চুরির অভিযোগ থাকলেও নারিশ্চা বন বিট ও রাঙ্গুনিয়া রেঞ্জ, খুরুশিয়া রেঞ্জ- এর বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে বনটি।

কোদালা চা-বাগান এলাকার মৎস্য খামারি এনায়েতুর রহিম অভিযোগ করেন, হাতেনাতে ধরে দিলেও বন্য পশু শিকারিদের বিরুদ্ধে নারিশ্চা বন বিট ব্যবস্থা নিচ্ছে না। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর কোদালা চা-বাগানে একটি মৎস্য খামার এলাকায় দিনদুপুরে শিকারিদের দুটি সজারুসহ আটক করা হলেও বন্য প্রাণী হত্যার অভিযোগে মামলা করতে বা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। এদিকে স্থানীয় অনেকে বন বিভাগের পাহাড় দখল করে লেবু বাগানও গড়ে তুলেছে। দিনদুপুরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সেগুনগাছের চারা কেটে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বনের চাপালিশ, গর্জন, বৈলাম, তেলস্বর, ডুমুর প্রভৃতি মূল্যবান গাছ পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।  বানর, হরিণ, ভালুক, সজারু, বাঘডাসা এবং প্রায় ৫০ প্রজাতির বন্য পাখি ও প্রাণীর বসবাস এই বনাঞ্চলে। এ অবস্থায় এসব বন্য প্রাণীর বাসস্থান ও খাদ্য সংকট তীব্র হচ্ছে। বন বিভাগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগীয় কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক শাহ বলেন, প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে বিশাল বনভূমিতে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বনাঞ্চলে বন্য পশু নিধনযজ্ঞ বন্ধ করা জরুরি। কারণ বনাঞ্চল এবং বন্য পশুপাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এই পরিবেশ সংরক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্তদের এগিয়ে আসতে হবে।