ভর্তি ও ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত কয়েক দিন দেশের স্কুলগুলোতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সে অভিযানে দুর্নীতির কিছু প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে কমিশন। এমন বাস্তবতায় বাড়তি ফি নেওয়া কিছু প্রতিষ্ঠান টাকা ফেরতের বিষয়ে ভাবছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জেনেছে দেশ রূপান্তর।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ভর্তি ফি নেওয়া হচ্ছে বলে গত ৭ জানুয়ারি দেশ রূপান্তরে অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের পরের দিন দুদক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযানে নামে। সর্বশেষ গতকাল বুধবার দেশের ৪ জেলার ১৪ স্কুলে অভিযান চালানো হয়।
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিযোগ কেন্দ্রে (হটলাইন-১০৬) জানানো হয়, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে যথাসময়ে উপস্থিত হন না। এ ছাড়া বিভিন্ন খাত দেখিয়ে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বেআইনিভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। এমন প্রেক্ষাপটে রাঙ্গামাটি, দিনাজপুর, ফরিদপুর ও ঢাকার ১৪ স্কুলে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের বেশ কিছু প্রমাণ পেয়েছে দুদক। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অভিযানে যায় দুদক। অভিযান শেষে অভিযোগটি সত্য নয় বলে জানান দুদক কর্মকর্তারা। এর পরের দিন রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজে ভর্তি-বাণিজ্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অভিযান চালায় দুদক। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় কমিশন। এ বিষয়ে অধিকতর যাচাই চলমান রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগে গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে অভিযান চালায় দুদক। ওই সময় প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃপক্ষ ৩০ শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়।
গত রোববার চট্টগ্রামের বেশ কিছু স্কুলে গোপনে অভিযানে যান দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। সেখানে গিয়ে বেশির ভাগ শিক্ষকের অনুপস্থিত দেখতে পাওয়ার কথা জানান তিনি। এরপর চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের জানান, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনে দুদক দণ্ডবিধির ১৬৬ ধারা প্রয়োগ করবে।
গত সোমবার মতিঝিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুদক অভিযান চালায়। ভর্তিতে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগের ‘প্রমাণ পাওয়ায়’ প্রধান শিক্ষক নূরজাহান হামিদাকে সাময়িক বরখাস্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুদক থেকে বলা হয়, এ বছর ভর্তি বাবদ তিনি অবৈধভাবে পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আয় করেছেন।
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায়, অবৈধ ভর্তি, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতসহ নানা অনিয়ম খুঁজতে অভিযান চলবে।
ওই ঘোষণার পর সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা ফেরতের ভাবনার কথা জানিয়েছে দেশ রূপান্তরকে। এমন একটি রাজধানীর এমপিওভুক্ত স্কুল কাকলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ দীন মো. খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত ফি নিয়েছি, কারণ আমাদের নতুন ভবন নির্মাণ করতে হচ্ছে। আর ভবন নির্মাণ বাবদসহ অন্যান্য ফি নেওয়ার বিষয়টি অভিভাবকদের জানানো হয়েছে। তারা দিতে রাজিও হয়েছেন। তার সকল ডকুমেন্টও আছে আমাদের কাছে। তারপরও যদি দুদক অভিযানে আসে, তাহলে আমরা সেসব তথ্য-প্রমাণ হাজির করব। এ ছাড়া আমরা বাড়তি অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।’
ধানম-ির স্ট্যামফোর্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের নেওয়া অতিরিক্ত ফি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক।
সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে ভর্তিতে বেশি টাকা নেওয়া হলেও জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাই স্কুল কর্র্তৃপক্ষ সেটা মনে করছে না। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক হাবিবুল্লাহ খান বলেন, ‘আমরা এই নিয়মেই ২০১২ সাল থেকে ফি নিয়ে আসছি, অভিভাবকরাও দিচ্ছেন। কোনো সমস্যা তো হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুদক যদি অভিযানে আসে তাহলে আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করব। আমরা নিজ খরচেই চলি, সরকার আমাদের কোনো টাকাই দেয় না। তারপরও দুদক যদি টাকা ফেরত দিতে বলে, তাহলে দেব।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক সরকার আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুদকসহ মাঠে মাউশির ১১টি টিম ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। বাড়তি ফি নিয়ে কেউ পার পাবে না। সবাইকেই বাড়তি ফি ফেরত দিতে হবে।’