লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডে নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসার আল ইসলামের (পুরানা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) ১২ জঙ্গি জড়িত। এদের মধ্যে ৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে চার্জশিট তৈরি করেছে তদন্তকারী কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) কর্মকর্তা। শিগগিরই এই চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে বলে জানান তারা।
বৃহস্পতিবার সিটিটিসি কর্মকতারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
সিটিটিসি’র উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেছেন, লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১০-১২ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এদের বেশ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে মোট ১২ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এরা হচ্ছেন আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান মেজর (অব.) সৈয়দ জিয়াউল হক, শরিফুল ওরফে মুকুল রানা, আরাফাত হোসেন, সেলিম ওরফে হাদী-২, শফিউল ইসলাম ফারাবী, আক্রাম হোসেন, হাসান, মান্নান রাহী, বাশার, আলি, অন্তু ও অনিক।
তারা জানান, এদের মধ্যে আলি, অন্ত ও অনিকের নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মান্নান রাহী ও বাশার আগেই কারাগারে মারা যাওয়ায় তাদেরও চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
সিটিটিসি আরো জানায়, বাকি ছয়জনকে চার্জশিটভূক্ত আসামি করা হচ্ছে। এরা হলেন- মেজর(অব.) সৈয়দ জিয়াউল হক, আরাফাত হোসেন, সেলিম ওরফে হাদী-২, সায়মন, আক্রাম হোসেন ওরফে আরিফ ও ফারাবী। এর মধ্যে মেজর জিয়া ও সেলিমকে পলাতক আসামি হিসেবে দেখানো হচ্ছে চার্জশিটে।
সিটিটিসির উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত এ মামলায় মোট ১২ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছ। তারা হলো- শফিউল ইসলাম ফারাবী,আরাফাত হোসেন, সায়মন ও আবু সিদ্দিক সোহেল। এদের মধ্যে আরাফাত হোসেনসহ তিন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। অন্য সাত আসামি র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। তারা হলো- সাদেক আলী মিঠু, তৌহিদুর রহমান গামা, আমিনুল মল্লিক, জুলহাস বিশ্বাস, জাফরান হাসান, আবুল বাশার ও ইয়াহিয়া।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডে হাসান নামে আরও একজন জঙ্গির সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। হাসান সাংগঠনিক নাম হওয়ায় তার প্রকৃত নাম-ঠিকানা খুঁজছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। প্রকৃত নাম ঠিকানা পাওয়া গেলে তাকেও এ মামলার চার্জশিটভূক্ত আসামি করা হবে, অন্যথায় বাদ দেওয়া হবে বলে জানান সিটিটিসির কর্মকর্তারা।
এ প্রসঙ্গে সিটিটিসির উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম বলেন, কিছু আসামির প্রকৃত নাম-ঠিকানা যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে। পাওয়া গেলে চার্জশিটভূক্ত করা হবে।
২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে খুন হন অভিজিৎ রায়। এ ঘটনায় অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, তদন্তে প্রথম দুই বছরে এই হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদ্ধার করতে পারেননি। এরপর ধীরে ধীরে হত্যা রহস্যের জট খুলতে থাকে। তদন্তে বেরিয়ে আসে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সম্পৃক্ততা।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান,মেজর (অব:) জিয়ার নেতৃত্বে ও উপস্থিতিতে অভিজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করে আরাফাত ও সেলিম। এই আরাফাত জুলহাস মান্নানের বাসাও রেকি করার কাজে যুক্ত ছিলেন।
যদিও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আরাফাত নিজেকে বাঁচানোর জন্য বলেছেন, অভিজিৎকে হত্যার সময় তিনি ঘটনাস্থলের পাশেই ছিলেন। এ সময় কুপিয়েছেন অন্তু ও আলী নামে দুই জঙ্গি।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, আরাফাত নিজেও কুপিয়েছেন। এখন বাঁচার জন্য এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া অন্তু ও আলি নামে যে দুজনের সাংগঠনিক নাম বলেছেন, তাদের আসল নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি।
২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে সিটিটিসি এই মামলার তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে তাদের হাতে সায়মন, আবু সিদ্দিক সোহেল ও আরাফাত গ্রেপ্তার হয়ে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।
মামলার চার্জশিট প্রদান প্রসঙ্গে সিটিটিসির উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম বলেন, তদন্তকাজ শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে।